আমি ভয় পাচ্ছি…

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

(কলকাতা থেকে): গত কাল সন্ধ্যেয় মনের আনন্দে যাদবপুরে চরতে গিয়েছিলাম…। কিছু কাজও ছিল, আর সঙ্গে ছিল দুই দাদা… । অতি পরিচিত, অতি ঘনিষ্ঠ দুই মানুষ…।

চরা শেষে ফেরার মুখে, যেখানটায় ক’টা মোমোর দোকান আছে, ওখানটায় ফুটপাথে ছিলাম, রাস্তায় নামছি আমরা তিন জন…। জায়গাটায় ভিড় আছে, যেমন থাকে…। লোকজন অবিরাম আসা-যাওয়া করছে…। হঠাৎ উল্টো দিক থেকে আসা কয়েক জনের ভিড়ের মধ্যে থেকে, কে এক জন ধুপ করে পড়ে গেল রাস্তায়…।

লাল কুঁচি দেওয়া টপ, গোলাপি প্রিন্টের সুতির প্যান্ট…। এক চোখ দেখে মনে হল, ছোট কোনও বাচ্চা হয়তো, হোঁচট খেয়েছে..। রাস্তার দিকে মুখ উপুড় করা…। কে এক জন তোলার চেষ্টা করতই আবার ওই একই ভাবে মুখ গুঁজে পড়ল সে…। আর তখনই দেখলাম, বাচ্চা নয়, একটা মেয়ে…। কিশোরী অথবা তরুণী…।

তত ক্ষণে আমি ছুটে গিয়েছি…। এই পুরোটা এত ক্ষণ ধরে লিখলেও, ঘটনাটা ঘটেছে কয়েক সেকেন্ডে…।

মেয়েটি অলমোস্ট সেন্সলেস…। চোখ মেলতে পারছে না..। জোর করে রাস্তায় বসাতে কোলে এলিয়ে রয়েছে…। ব্যাগ থেকে বার করে জল দিচ্ছি, আমার সঙ্গে দু”টো ব্যাগ ছিল…। একটা আমার, একটা সঙ্গের এক দাদার…। সে দু’টো সামলে জল বার করে, মেয়েটিকে ধরতে একটু চাপই হচ্ছিলো…। আর একটি মেয়েও হাওয়া করছে তখন ওকে…। জায়গাটায় বেশ ভিড়ও জমেছে, আমি অনুরোধ করছি একটু ফাঁকা করতে, খুব গরম তো…!

আমি খালি পেছনে ঘুরে আমার সঙ্গে থাকা দু’জনকে খুঁজছি…। অন্তত ব্যাগ দু’টো দেব বলে…। কেউ নেই…। অদ্ভুত…! আমি যত দূর চিনি, দু’জনের মধ্যে অন্তত এক জনের তো আমার পাশে বসেই মেয়েটিকে সুস্থ করার চেষ্টা করার কথা…! ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা আমার মতো করেই…। যাই হোক, ব্যাগ দু’টো ওই ভিড়ের মধ্য়েই কাকে যেন ধরতে দিলাম, চিনি না…।

খানিক পরে মেয়েটিকে একটি টুলে বসিয়ে, জল খাইয়ে, কোল্ডড্রিঙ্ক খাইয়ে, বরফ দিয়ে একটু সুস্থ করা হয়েছে…। অত জোরে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়ে নাকের নীচটা থেঁতলে গিয়েছে, রক্ত ফুটে উঠেছে সাদা হয়ে যাওয়া ছোট্ট মুখটায়…। কেপিসি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী…। ঢাকুরিয়ায় বাড়ি…। সারা দিন খাওয়াদাওয়া হয়নি, তার পর এই গরম… সব মিলিয়ে প্রেশার ফল করে গিয়েছিল, হঠাৎ চোখে অন্ধকার করে আসে, পড়ে যায়…। ওর আগেও হয়েছে এমনি…।

সামলানোর পরে সরে এলাম…।

ভিড়ের বাইরে, একটু সাইড করে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমার সঙ্গে থাকা এক দাদা…। আর এক দাদা গিয়েছে কোল্ডড্রিঙ্কের বোতল ফেরত দিতে…।
আমি ভিড় থেকে সরে আসতেই দাঁড়িয়ে থাকা জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে ওর, ঠিক আছে…ইত্যাদি প্রভৃতি…। প্রশ্নে স্পষ্টতই উদ্বেগের ছাপ, আর সঙ্গে খানিক অসহায়তাও…। আমি কিছুই বলিনি…।
আমার তখনও বিস্ময়, ওই দাদা মেয়েটিকে সাহায্য না করে পাশে দাঁড়িয়ে রইল কেন…!!
প্রশ্ন করার আগেই বোধ হয় সেটা বুঝেছিল দাদা…। তেমনটাই সম্পর্ক তার সঙ্গে…। তাই আমি কিছু বলার আগেই বললো, “বুঝিসই তো এখন, একটা পড়ে যাওয়া মেয়েকে তুলবো… একটা মেয়ে তো… কখন কী ভাবে… ভয় লাগে…”
হ্যাঁ, ভয় শব্দটাই উচ্চারণ করলো সে…। শব্দটা তার সঙ্গে একদম খাপ খায় না, একদম না…। তবু সে নিজেই বললো এ কথা…!
কুণ্ঠায়, কষ্টে, ক্লেশে বললো…।

সত্যিই তো…! যতই মানুষ হোক, সে তো পুরুষ আফটার অল…! লিঙ্গ আছে তো তার…! তার পরেও একটা মেয়েকে স্পর্শ করতে, সে যে কারণেই স্পর্শ করতে হোক…. ‘ভয়’ লাগবে না…!! এই সময়টা, এই ভীষণ উদ্ধত সময়টা, এই গুডটাচব্যাডটাচের দ্বন্দ্বে জর্জরিত, সময়টা এ ভাবেই তো পুরুষদের ভয় পেতে বাধ্য করছে…!!

তাই একটা মেয়ে রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ চোখে অন্ধকার দেখে পড়ে গিয়ে নাকমুখ থেঁতলে ফেলেছে দেখেও… সেই মুহূর্তে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, উঠিয়ে সামাল দেওয়াটা, তার ঘাড়ে-গলায় জল হাত বুলিয়ে দেওয়াটা, তার ঠোঁটে বরফ লাগিয়ে দেওয়াটা, তাকে ধরে ধরে আস্তে করে কিছু খাইয়ে দেওয়াটা জরুরি এটা বুঝেও…… কুণ্ঠা নিয়ে, ভয় নিয়ে, অসহায়ত্ব নিয়ে এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় কোনও কোনও মানুষকে…। শুধু বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে স্পর্শ করে ফেলার ভয়ে, সে স্পর্শে অনিচ্ছাকৃত কাম অথবা ইচ্ছাকৃত পাল্টা অপমান মিশে যাওয়ার ভয়ে খুন করে ফেলতে হয় স্বতঃস্ফূর্ততা, মানবিকতা, হৃদয়বত্তা…!

যাদবপুরে যখন এমনটা ঘটছে, তার ঠিক কিছু সময় পরেই কিন্তু দমদমে চলছে আর একটা ইভেন্ট…। মেট্রোয় পরস্পরকে জড়িয়ে ধরার ‘অপরাধে’ মার খেতে হচ্ছে দু’টি ছেলেমেয়েকে…। (যিনি আনন্দবাজার পোর্টালে খবরটি লিখেছেন তাঁকে ব্যক্তিগত ভাবে খুব ভাল চিনি বলে দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, ঘটনার বর্ণনায় এক চুলও অসত্যতা নেই…।)
ছেলেমেয়ে দু’টিকে মারছেন কাকু-জেঠুরা…। প্রকাশ্যে…। তাঁরা ভয় পাচ্ছেন না…। তাঁরা মেয়েটির গায়ে হাত তুলতেও ভয় পাচ্ছেন না…। তাঁরা পুরুষ…। তাঁদের কোনও ভয় নেই…। তাঁরা ‘সবক’ শেখানোর আনন্দে আত্মহারা হয়ে আঘাত করে চলেছেন উপর্যুপরি….। আঘাত করতে তো স্পর্শ করতে হয়…! তাঁরা স্পর্শ করতে ভয় পাচ্ছেন না…!

আমার দাদা ভয় পেয়েছিলো…। যেখানে ভয়কে জয় করে এগিয়ে যাওয়া জরুরি ছিলো…। পারেনি…। থেমে গিয়েছিলো…।

দমদমের কাকু-জেঠুরা ভয় পায়নি…। থামেনি। যেখানে দু’টি অল্পবয়সি ছেলেমেয়ের ব্যক্তিগত পরিসরটুকুতে ঢোকার আগে তাদের থেমে যাওয়া উচিত ছিল, সেখানে তাঁরা লজ্জা-দ্বিধা-ভয়…..ইত্যাদি সমস্ত অনুভূতিকে জয় করে প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়তে পেরেছিলো…।

কী অদ্ভুত এক বৈপরীত্য…! কী ভীষণ অনাকাঙ্ক্ষিত এক বৈপরীত্য…!
এমনি ব্ল্যাক-আউট হয়ে রাস্তায় পড়ে যাওয়া আমার বেশ কয়েক বার হয়েছে…। আমি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কারণে অনেককে জড়িয়েও ধরি…। বাঁদরের মতো কোলেও উঠে পড়ি…।

আমি ভয় পাচ্ছি। আমি পড়ে গেলে আমায় কেউ স্পর্শ করবে না ভেবে, অথবা…….

ছবি: গুগল