শুভমিতার সঙ্গীত সন্ধ্যা এবং আমার অনুভব

সুলতানা শিরীন সাজি

একি গভীর বাণী এল ঘন মেঘের আড়াল ধ’রে.
সকল আকাশ আকুল ক’রে॥
সেই বাণীর পরশ লাগে, নবীন প্রাণের বাণী জাগে,. হঠাৎ দিকে দিগন্তরে ধরার হৃদয় ওঠে ভরে॥
ঠিক এই গানের সুর ধরে “শুভমিতা সঙ্গিত সন্ধ্যায়” গান শুরু করলেন খুব প্রিয় শিল্পী শুভমিতা, মন্ট্রিয়লের Place St Henri Auditorium এ।
অনেকদিন পর।২০১২ সালের ২১ মে তে অটোয়াতে শুভমিতাকে শুনেছিলাম। সেই মুগ্ধতা বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছি এ যাবৎকাল পর্যন্ত।এত সুন্দর গায়কী। এত সুন্দর কথাবলা। মনেহয় আমরা সবাই ভেসে যাচ্ছি। মনেহয় আমি নেই। “নয় এ মধুর খেলা–. তোমায় আমায় সারাজীবন সকাল-সন্ধ্যাবেলা নয় এ মধুর খেলা ”
শুভমিতা গাইছেন রবীন্দ্রনাথের গান। মনে হচ্ছে পুরো হলজুড়ে কখনো মেঘ,কখনো বৃষ্টি নাকি ঝড়ের আভাস? এই অনুভব লেখার শক্তি আমার নেই।কোন শিল্পী যখন মন থেকে গাইতে থাকেন,তার সুরে ভাসিয়ে নিয়ে যান সবাইকে। 
আবিষ্কার এলবামের গান দিয়ে শুরু করলেন নিজের গান গাইতে।”সারাদিন ভেবে তোমার কথা ,উড়ে গেছে সময় ঝরা পাতা ” এই ঝরা পাতা যখন বলছিলেন,মনে হচ্ছিল শব্দ শুনছিলাম।এক একটা শব্দের যে এত মায়া থাকতে পারে! আহা।
আমাদের এখানে ফাগুন চলছে তাই গাইলেন, “তোমার কাছে ফাগুন চেয়েছে কৃষ্ণচূড়া। ” গাইলেন,”মনের হদিস কেউ জানেনা”।
“বাতাস ডাকেনা আগের মতন” গাইতে গিয়ে বললেন পিছনের গল্প। শুভমিতার ও স্বপ্ন ছিলো প্রিয় শিল্পী শ্রীকান্তের সুরে গাইবেন। গেয়েছেন। এটা শুভমিতার প্রথম স্বপ্নপূরণের গান।

শুভমিতা গাইছেন আর আমি বৃষ্টির শব্দ শুনছি। এত মিষ্টি,এত মনকাড়া। মাঝে মাঝেই যেনো ভুল হয়ে যাচ্ছে ,কোথায় বসে আছি! সুর শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল আমি কোন পাহাড়ের কিনারায় বসে আছি। কিংবা কোন নদীর ধারে।কিংবা কোন সমুদ্রের তীর ঘেষে হাঁটছি। কখনোবা আকাশের নীলে ভেসে বেড়াচ্ছি পাখির মতো। কখনোবা ফুলের বনে একাকী! সংগীত,সুরের মূর্ছণা তো এমনি। কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায়!
“শুধু তোমায় ভেবে ভেবে,
কত দিন রাত গেছে চলে।
তুমি এসেই চলে গেছ,
শুধু ভোরের স্বপ্ন হয়ে।” শুভমিতা গাইছিলেন,”তুমি না লেখা কোন কবিতায়, যেন অনেক বলা কথা।” এত সুন্দর ।কি করে এই সুন্দরকে লিখি? শ্রীকান্ত,নচিকেতা,মনোজ এর সঙ্গে সঙ্গে উদয় এর কথা ও সুরে গাইলেন আরো গান।
গালিবনামা থেকে ও গান গাইলেন। আর বন্ধুর কথা মনে হলে যেই গান মনে পড়ে,সেই গান “যদি বন্ধু হও” । পুরো হল জুড়ে সুরের খেলা। “দেখেছো কি তাকে ঐ নীল নদীর ধারে” শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল ছয় বছর আগে শোনা শুভমিতা অনেক অনেক বেশি সাবলীল হয়েছেন আরো। গতবার গাইছিলেন যখন ,বাইরে বৃষ্টি নেমেছিল। আজ বৃষ্টি বাইরে না। পুরো হল জুড়ে। আমি মনেকরি সবাই সেই বৃষ্টিকে শুনেছেন।
ঠিক ২০১২ সালের মতই শেষ গানটা ছিল।”যেভাবে তুমি সকাল দেখো”
এত সুন্দর কথা…………গান শুনছি।অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর চোখ ভেসে যাচ্ছে। পাশে বসা বন্ধু মিনুকে hug দেই। সামনের সীটে বসা ইন্দ্রানী ,যার সঙ্গে কালই প্রথম দেখা,তাকেও। বলি ,খুব মনে থাকবে তাকেও।
কালকের অনুষ্ঠানের আয়োজক ,”লোকজ” কে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ প্রিয় শর্মিলা দি এবং মানুদা।সুন্দর উপস্থাপনার জন্য। আর লোকজের দলীয় নাচ এবং গান ও ছিল অনবদ্য। ধন্যবাদ মিঠুদা এবং প্রিয় রুপা।
আর শুভমিতার মিউজিশিয়ানরা ছিলেন অনবদ্য। পার্থ পাল,প্রশান্ত ঘোষ,মনোজ রথ আর মৃত্যুঞ্জয় পাঠ এর জন্য শুভবোধ।

যে সকালটা শুরু হয়েছিল অটোয়ায়,অদ্ভুত একটা রোদেলা দিন দেখে। সেই দিনটা শেষ হলো ,আমার প্রিয় শহর মন্ট্রিয়লে। যেই শহরে গেলেই মন ভালো হয়ে যায়। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মনে হয় ,বাংলাদেশের পর এই এক জায়গা যা জন্য আমার মন কেমন করে!
অটোয়া থেকে আশীক,নেসার ভাই ও গান শুনতে গিয়েছিল। মিনু আর মিঠু ভাই এর সঙ্গে এবার আমার যাওয়া। রাশীকের বাবা যেতে পারেনি। দেখা হলো বাবুভাই,তোতনভাই,মুফতী ভাই,শামীম ভাই,জিয়া ভাই সহ আর কত মানুষের সঙ্গে।
কাল শেষ রাতে ফিরে ,ঘুমাতে যাবার পর অনেকদিন আগের এক অনুভূতি হলো।এ নিয়ে লেখাও লিখেছিলাম। সেই Deja vu স্বপ্ন। খুব ভালোলাগায় ভরে থাকলে এমন হয়।
“কাল রাত ঘুমে স্বপ্নে দেখি আমি ফুলের বাগানে ঘুরছি। আর আমার হাত ভর্তি এক গোছা বেলী ফুল। এত সাদা বেলী ফুল অনেকদিন ছুঁইনি। ঘুম ভেঙে যাবার পর হাত দু’টো শুকছিলাম। মনেহচ্ছিল এইতো ছিল,হাত ভর্তি বেলী ফুলেরা। মনে হচ্ছিল গন্ধ পেলাম। আমার পুরো ঘর যেনো ভরে আছে প্রিয় সেই সৌরভে। সত্যি আমার মায়ের গায়ের গন্ধের মত প্রিয় সব সৌরভ আমি এখনো পাই। পাই বলেই আমি এখনো আমি আছি।
অনেক মন খারাপ হয় যখন। অনেক কষ্টের ছবি দেখি যখন চারপাশে,চোখ ভাসিয়ে কাঁদি। আমার এই কান্নার কাছে কেউ থাকেনা। আমি আমার চোখের জলের সঙ্গেই সব কষ্টগুলোকে দুরে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি।কিছু পারি ,কিছু পারিনা। যা পারিনা, তা নিয়ে ভাবিনা। মনেহয় কষ্টের ছবি হয়ে ওরা না হয় থাকুক আমার সাথে। সুখ ছবি যেমন ছবি যেমন করে সঙ্গে রাখি,দুঃখগুলোকেও পরম যত্নে রেখে দেই মনের মনিকোঠায়। একদিন অনেকদিন পর এই দুঃখ ছবিগুলোই হয়তো সুখ হয়ে ধরা দেবে। আমরা কি সব জানি? আমরা কি জানি কেনো মানুষ আমরা সুখ থেকে দুঃখটাকেই বয়ে নিয়ে বেড়াই অনেক বেশি?”

বড় বেশি আবেগতাড়িত হয়ে আছি।
শুভমিতা আপনিই কারন।  ব্যাকস্টেজে আপনার সঙ্গে যখন দেখা করতে গেলাম, আপনি কথা বলছিলেন। গানের কথা। সুরের কথা। অটোয়ায় এসেছিলেন সেই কবে,সেই স্মৃতির কথা। কালকের রাতটা অনেকদিনের জন্য বুকের ভিতর উষ্ণতা ছড়াবে। ভালো থাকবেন যেখানেই থাকেন।
আবার ও বলি সেই কথা ,”বেঁচে থাকা সত্যি দারুণ ব্যাপার।”

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে