বেহেস্ত দোজখ এবং স্বার্থপরতা

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

 খুব ছোট্ট বেলার গল্প।এই ছোট্টবেলার গল্প থেকে বেরুতেই পারিনা এবং সত্যিকার অর্থে আমি বোধহয় তেমন বড়ও হইনি।বড়দের অনেক ব্যাপার স্যাপার আমি বুঝিনা এবং অনেক সময় তা পছন্দও করিনা।সে যাই হোক।নানাভাইয়ের স্কুল কোয়াটার ছিল গোঁসাইবাড়ি। তার আশেপাশেই কোন এক গ্রামে থাকেন গ্রাম সম্পর্কীয় মামা।মামা অনেক ধার্মিক। খুবই ভালো কথা।গান গাই বলে বেশীরভাগ মানুষই আমায় ভীষন আদর করেন। আবার দু’য়েকজন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন।আমি অনেক কিছুই বুঝি।আমার ভেতরের সত্বা অনেক কিছুই বোঝে।আমি সহজে তাদের সামনে পড়তে চাইনা।কারণ সামনে পড়লেই নানারকম কথা বার্তা! কেউ মূর্খতাজনিত কারণে আব্বাকে জিজ্ঞেস করেন “খোকা, তোমার মেয়েকে নাকি যাত্রাদলে দিয়েছো” আম্মা রেগে অগ্নিশর্মা হন।আব্বা কাচুমাচু করে সেইসব কথোপকথন শুধরাতে চেষ্টা করেন।আব্বার চেষ্টা বেশীরভাগই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।আমি নিজেকে দারুন অবাঞ্ছিত মনে করে লুকাতে চেষ্টা করি।কিন্তু ভবিতব্য আমাকে কোথাও লুকাতে দেয়না! তো সেই মামার কি মতিগতি হলো জানিনা, উনি আমার আব্বার কাছে আমার গান শুনতে চাইলেন।

আব্বা কি আর এই সুযোগ ছাড়েন? আব্বা গদগদ হয়ে রাজি হয়ে গেলেন। কোন এক অপূর্ব চাঁদনী রাতে সেই মামার বাড়ির ফুটবলের মাঠের সমান উঠানে গানের আসর বসালেন। চাঁদের আলো যেন ভেঙে পড়লো মামার বাড়ির ঝকঝকে টিনের চালে,ডালিমের লালিমায়, সজনের ঝিরঝির পাতায়,নিমের শনশন শব্দে।অপ্রাকৃত পরিবেশে গান ধরলাম খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে, খোদার প্রেমের শরাব পিয়ে, মুহাম্মাদের নাম জপেছিলি, খাঁচার ভিতর অচিন পাখী, আমি অপার হয়ে বসে আছি,এই পদ্মা এই মেঘনা, ও আমার বাংলা মা তোর, গাইছি তো গাইছিই।ভেতর বাড়িতে মুরগীর সালুন মাশকলাইয়ের ডালের সুগন্ধে বাড়ি মৌ মৌ।চাঁদ ঘুমাতে চায়,কিন্তু গানের অনুরোধ থামেনা।সমস্ত গ্রাম ভেংগে পড়েছে।ওয়ানমোরের বদলে আরেকটা আরেকটা চলছে।আব্বার গর্বিত মুখাবয়ব চাঁদের আলোর মতই প্রশান্তিময়,চকচকে।অর্ধেক রাত গান শোনার পর এক উঠান মানুষের সামনেই মামা উপসংহার টানলেন এই বলে যে “এই মেয়ে তো পুরা পরিবার নয়,পুরা বংশকেই দোজখে নিয়ে যাবে”! আব্বার গর্বিত মুখ থেকে চোয়াল ঝুলে গেলো। সে রাতে আব্বা খেয়েছিলেন কিনা জানিনা বাকী সবার কাছেই মাশকলাইয়ের ডাল মুরগী ভুনা খুবই সুস্বাদু খাদ্য বলে পরিগণিত হলো।আমি একটা শিশু,আমার মনের খবর,আমার অপমানের খবর কেই বা রাখে।এমন অপমান আমি অনেকবার হয়েছি।এই গান এই ধর্ম এই বেহেস্ত এই দোজখ এই সুর এই গান আমাকে সারাজীবন দ্বিধার দোলাচলে দুলিয়েছে নিরন্তর। এর পর অনেক বছর কেটে গেছে।আমি ওই মামার সামনে কখনওই আর পড়িনি।কৌশলে নিজেকে লুকিয়েছি। এই নিজেকে যখন তখন লুকানো একটি কিশোরীর জন্য বড়ই কষ্টকর। তখন আমি ছবির গান নিয়মিত গাচ্ছি,শ্রমিকের মত দিন রাত স্টুডিয়ো তে গান গাই, বিরামহীন। নামধাম ও হচ্ছে,যদিও তা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।বোনের বাড়ি বেড়াতে গেছি বগুড়ার ধুনট এলাকায়।সেখানে একজন সদ্য যুবক এলো, আপা আপা করে ডাকছিল।আমার চেয়ে বছর পাঁচেকের ছোট হবে হয়তো।

বড়বোন পারুল আপা বললেন সেই মামার ছোট ছেলে। আমি আগের কথা ভুলেই বসেছিলাম। স্বভাব মত হাসিমুখে মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে সহৃদয় হয়ে কথা বলছিলাম।সেও খুব শ্রদ্ধা ভক্তি দেখাচ্ছে বয়সে বড় ফুপাতো বোনকে।একসময় খুব ঘ্যানঘ্যান করছিল গান শুনবে।আব্বা আমাকে দিয়ে এজীবনে মেলা মানুষকেই গান শুনিয়েছেন, খুবই বিরল ব্যাপার যে আব্বার অনুরোধে আমি ভিক্ষুককেও গান শুনিয়েছি একাধিকার। কিন্তু বিয়ের পর আমি বাঁচা বেঁচে গেছি যে আমার স্বামী কখনওই আমাকে এই পরিস্থিততে পড়তে দেননি।তো আমি কিছুতেই ওই ভাইকে গান শুনাবো না,কিন্তু সেও ছাড়েনা, হঠাৎ সে পা চেপে ধরলো,আমি পড়লাম মুশকিলে।আপা, আম্মা বললেন এতো বলছে, গা নাহয়, বিরক্ত হতে গিয়েও থেমে গেলাম।তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটা গান শুনালাম।তখন সে আমাকে চমকে দিয়ে বলে উঠলো “আল্লাহ গো,এ না দোজখ এর খড়ি!” আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম।আমার ইচ্ছে হচ্ছিলো দোজখে যাওয়ার আগে চড় দিয়ে ওই মামাতো ভাইয়ের দাঁতগুলো ফেলে দেই! কিন্তু তা আমার পক্ষে কখনওই সম্ভব নয়।আমি শুধু ভাবলাম গান গাওয়া এতো পাপ, চেয়ে চেয়ে সেধে সেধে গান শোনায় পাপ নেই? তাতে যদি পাপ থাকে তবে সে পাপের দায় তার বাবার ও তার নিতে হবে না? নাকি সে পাপ ও আমার! সারাজীবন আমার কেটে গেলো এই সব আপেক্ষিকতা, ভয়,আশা আদর ঘৃনার দোলাচলে।অন্যেরা আমাকে নিয়ে যত সহজে উপসংহার এ চলে যায় আমি তাদের নিয়ে সহজে দূরে থাক কোনরকম উপসংহার এই যেতে পারিনা।আমার কেবলি এই দুনিয়াকে বড়ই স্বার্থপর মনে হয়।এই ভাবনা থেকে আমি বেরুতেই পারিনা।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে