পাঁচটি কবিতা

নূপুর কান্তি দাশ

বছর কুড়ি পরে

আবার বছর কুড়ি পরে
মেঘের মতন শহরে
আমাদের দেখা হলে
মনে রেখো
কফিমগ কিংবা রক্তে
চিনির সঙ্গত পরিমাপ নিয়ে
কথা বলা যেতে পারে —
ভিজে ভিজে পথ
এবং ছাতার মিছিলে
মিছেমিছি তাকাবার নাম করে
আমাদের বুড়ো দু’চোখ
পরস্পর ফাঁকি দেবার কথা ভেবে’
‘কী লাভ!’ বলে হেসে দেবে
তারপর ক’ইঞ্চি কাছে’
এই হাত ওই আঙুল
সোনাঠোঁট রূপোলি চুল;
এখানে ওখানে
শতদল হয়ে দ্যাখো,
ফুটেছে কুঞ্চন!
স্পর্শের সারস তবু
সাহস খুঁজে পেতে
খানিক কেশে
‘তো কি খবর,
বাচ্চারা ভালো? বর?’
ইত্যাদিতে মেতে উঠে
উড়াল না দেবার
অজুহাতে’
সচ্ছন্দ চুমুক
বরং শ্রেয় মনে করে
তখন তুমি নখের
টোকায় টোকায়
পিয়ানো বাজাবে টেবিলে,
পুরনো দিন মনে ক’রে
কফিময় বিকেলে
মেঘেদের হুড়োহুড়ি
বেড়ে গেলে
টেবিলের এপাশে
ফেসবুক মেলে ধীরে
আমিও হয়ত ডুবে যাবো
হাঁটুময় বৃষ্টির ভিতরে

 

বুননপর্ব

আমি আপনাকে কিছু মুহূর্ত উপহার দেবার কথা ভাবছিলাম,
শীতের উলে রোদের উচ্ছ্বাসের মতন;
একটা নরম বল থেকে আপনি বুনছেন সোয়েটার
আসন্ন ডিসেম্বরের কথা ভেবে,
পাতাঝরা বিকেলে অমন ঘুম পেয়ে গেলে
আপনি আমার কাঁধের মাপ নিতে ভুলে গেলেন
চিঠিতে ‘কল্যাণীয়াষু’ লিখেই
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলম বন্ধ করলেন

আর উলের কাঁটা দুটো
কাল বরফ পড়বে কি পড়বে না
এই নিয়ে তর্কে মেতে উঠল।

 

হলো তার সাধ

ছপছপ অন্ধকার শুধু,
কিছুতে জল নয়
তবু কালো জল ব’লে ভ্রম।
ঢেউ নেই,
হারিয়ে যাওয়া গল্প শোনায়
শনশন হাওয়া;
চাঁদ নামছে শিরশিরিয়ে
মনখারাপের রজ্জু বেয়ে বেয়ে,
দলা দলা মেঘের
সম্মোহনে
রূপোলী গাড়ি
বিষণ্ণ স্টিয়ারিং নিয়ে আকাশমুখী হলে
হাইওয়ে জুড়ে শুধু
জোছনাদের হুড়োহুড়ি

কত কাজ ছিল !
যত প্রমিজ, বকেয়া বিল,
ক্রেডিট কার্ড
লুকনো খাম,
হেডফোনে পুরনো গান —
ঘুড়ির ল্যাজ হয়ে ঝোলে
পেছনের নাম্বারপ্লেট খামচে ধ’রে

‘আ হা’, বলছিল কেউ
খুব ফিসফিস স্বরে ,
অথবা মাছের ঘাই
এমন ঘোলাজল
ঘুটঘুটে শহরে –
‘এমন কেউ করে?
পুরো শিশি ঢালে বুঝি
এমন নিঃশেষ ক’রে!’

 

হিমঘর – ১

আঙুলের একটা প্রান্ত থেকে
নোখ বেয়ে নেমে গিয়ে
চুঁয়ে চুঁয়ে রক্তের রেখা বয়ে চলছিল
তুষারপাতের সাথে পাল্লা দিয়ে,

মদের বোতল ছুঁড়ে দিয়ে’
একটা অন্ধ গাড়ি গোঁ গোঁ ছুটে গেল
সবুজ বাতিকে হলুদ হতে
দেবে না বলে;
নিষ্পাপ ঊষার মত
জ্ব্বলজ্বল করছে রাত, দ্যাখো!
কার জানালা ভেঙে ভেসে আসছে স্ল্যাঙ,
পতপত উড়ছে ট্র্যাশবিনের কালো পলিথিন;

এসবের মধ্যেই কব্জি কোণাকুণি
একটা সরল আঁচড়,
অস্ফুট সমর্পণ।

কেউ জানছেনা এই গোলাপের উৎস কোথায়

অতিকথন – ১

কত না নির্ঘুম মাঠ তুমি লুকিয়ে রাখছিলে
ঝোলার ভেতরে, আর না লেখা কয়েকশ’ চিঠি
খামের আঠাহীন প্রান্তরে;
মুঠোর ভেতর
একটা সাদা ঘোড়ার লাফিয়ে ওঠা দেখে
বিহবল হলে তুমি, বায়না ধরলে
আকাশ এনে দেবার

আমি শুধু বালিশটাকে ফালা ফালা করে
সারা ঘরময় ছড়িয়ে দিলাম
একরাশ তুলো।