এই গিটারটা বন্দুক হয়ে যেতে পারে…

‘‘এই গিটারটা বন্দুক হয়ে যেতে পারে,যদি ভয় দেখাও’’।
অনেক বছর আগে রাগি বাঙালি রক গায়ক শিলাজিৎ বেঁধেছিলেন এমন চোখ রাঙানি দেয়া গান। এলোমেলো যুবক, দাড়িপূর্ণ মুখ, অবাধ্য চুল নেমে এসেছে হয়তো কাঁধ পর্যন্ত। একটা গিটার হাতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে শাসাচ্ছে যেন ক্ষমতার অদৃশ্যে বলয়কে। গিটারের সঙ্গে বারুদঠাসা এইসব শব্দবাণের কোথায় যেন একটা সম্পর্ক আছে। গিটার নামে সুর তৈরীর এই যন্ত্রটি হয়ে ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠেছে বিদ্রোহের স্বজন।
গিটার হাতে তারুণ্য যেন সবকিছুকেই অস্বীকার করতে চায়।তাদের উচ্চারিত গানের শব্দের লুকানো রুমালে বাঁধা থাকে অস্বীকার করার সাহস। জন লেনন গিটার হাতে গেয়ে ওঠেন ‘ইমাজিন’র মতো গান। জিম মরিসন শোষন আর সামাজিক বন্ধনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভে মঞ্চে সম্পূর্ণ নিরাভরণ হয়ে যখন গেয়ে ওঠেন ‘দিস ইজ দি এন্ড’, বব মার্লে গিটারে ঝড় তুলে উচ্চারণ করেন ‘গেট আপ স্ট্যান্ড আপ ফর ইওর রাইট’ তখন মূলত বিদ্রোহ করে গিটারের সুর। তছনছ হয়ে যায় আপাতঃ সব স্থিতি। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে ‘এই গিটারটা বন্দুক হয়ে যেতে পারে’।

কিংবদন্তীসম গায়ক জন লেনন । ‘ইউ নো আই লাভ ইউ’, ‘আই ওয়ান্ট টু হোল্ড ইয়োর হ্যান্ড’ ও ‘শি লাভস মি’-র মতো গানগুলোতে জন লেনন জে-১৬০ই মডেলের একটি গিটারে সুর তুলেছিলেন। তার ব্যবহৃত সেই গিটারটি ষাটের দশকে ব্রিটেন থেকে হারিয়ে যায়। সত্তর দশকে আমেরিকার সান দিয়েগোর শৌখিন গিটারশিল্পী জন ম্যাকগ্র কয়েকশো ডলারের বিনিময়ে গিটারটি কেনার সুযোগ পান। বিটলস বিশেষজ্ঞ অ্যান্ডি বাবিউকের লেখা একটি গ্রন্থে গিটারটির ছবি দেখে বন্ধুরা তাকে জানান। সেই গিটারটি আমেরিকার লস অ্রাঞ্জেলসের ‘জুলিয়ান অকশন’-এর নিলামের আসরে বিক্রির জন্য উঠেছে। দাম ধরা হয়েছিল ৬ থেকে ৮ লাখ মার্কিন ডলার। নিলামের আগে গিটার নিয়ে কয়েকটি প্রদর্শনীও হয়। তারপর সেই বিখ্যাত গিটারটি নিয়ে যাওয়া হয় লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্র্যামি সংগ্রহশালায়। বব মার্লে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানান। গায়কের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী জ্যামাইকায় তার কবরে মরদেহটি ছাড়াও সঙ্গে গেছে গিটার।
গিটারটি ১৯৬৬ সালে তৈরি। ভেতরে অর্ধেক ফাঁপা। জন লেননের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে ভক্স কোম্পানির তৈরি করা। ষাটের সাড়া জাগানো বিটলসের ১৯৬৭-এর ‘ম্যাজিক্যাল মিস্ট্রি ট্যুর’ অ্যালবামে গানের সংগীত করেছে এই গিটার। কখনো বাজিয়েছেন জন লেনন, কখনো জর্জ হ্যারিসন। এই গিটার বাজিয়ে জন লেনন গেয়েছেন ‘আই অ্যাম দ্য ওয়ালরাস’ এবং ‘হ্যালো গুডবাই’।
১৯৬৭ সালে লেনন তাঁর ব্যান্ডের ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ার ইয়ানি মার্ডাসকে (ম্যাজিক অ্যালেক্স নামে খ্যাত) জন্মদিনের উপহার হিসেবে গিটারটি দেন। মার্ডাস ২০০৪ সালে গিটারটি একবার নিলামে বিক্রি করে দিলেও আবার এটি নিলামে ওঠে ১৯ মে ২০১৩। অজ্ঞাতনামা একজন ক্রেতা চার লাখ আট হাজার ডলারে কিনে নেয় গিটারটি।
গিটার ভালোবাসারও প্রতীক। একা ঘরে বসে েযে যুবকটি গিটার বাজিয়ে সুর তোলে অথবা গলির মোড়ে দুপুরবেলা গিটার কাঁধে যাকে হেঁটে যেতে দেখা যায় তার ভালোবাসা ভর করে গিটারে। তারুণ্যের ভালোলাগা গিটারে সুর হয়ে ঝরে পড়ে।
বিদ্রোহী ও প্রেমিক গিটারের বয়স কত হলো? এলোই বা কোত্থেকে?গিটার বাদ্যযন্ত্রটির বয়স কিন্তু অনেক। লেখক মরিস জে. সামারফিল্ড এর মতে স্পেনে ৪০০ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা ” সিথারা ” নামক একটি বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আসে, যা থেকেই গিটার বাদ্যযন্ত্রটির উদ্ভব । আরবরা বাজাতো “উদ” নামে একটি বাদ্যযন্ত্র। তবে কেউ কেউ বলে থাকেন, চারটি তার সম্বলিত “তানবুর” নামক বাদ্যযন্ত্র থেকে গিটার বাদ্যযন্ত্রটির উদ্ভব। খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ শতকে এখনকার সিরিয়ায় “হিটরাহিট” নামে এক জাতি বেঁচে ছিলো। তারা নাকি এই “তানবুর” বাজাত। ইতিহাস সাক্ষ দেয়, গ্রীকরাও এই ধাঁচের একটি বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেছিলেন যা থেকে পরবর্তীতে রোমানরা ” সিথারা ” নামক বাদ্যযন্ত্রটি তৈরি করে ।তাহলে মিশরীয় সঙ্গীত শিল্পী হার-মোজের সেই তানবারের কী হবে? তানবারের উপস্থিতি ইতিহাস ঘোষণা করছে প্রায় ৩,৫০০ বছর আগে। হার-মোজের সেই তানবারে ছিল তিনটি তার আর একটি মেজরাব(তান তোলার যন্ত্রবিশেষ)। সেই যন্ত্রের অনুনাদক ছিল দেবদারু গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি সুন্দর গড়নের আর সাউন্ডবোর্ডটি ছিল চামড়ার তৈরী। হার-মোজে যখন মারা যান, তখন তার কবরে তার দেহের সাথে তানবারটিও দিয়ে দেওয়া হয়েছিল যা প্রত্নতাত্ত্বিকরা পরবর্তী সময়ে খুঁজে পেয়েছেন।
সাড়ে তিন‘শ বছর আগে হার-মোজের সেই গিটার বিদ্রোহের সুর তুলেছিলো কিনা তা অবশ্য জানা যায় না। তবে এটুকু জানা যায় রেনেসাঁ যুগের শুরুতে ইউরোপে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে গিটারের দাপট খুব বেড়ে যায়। তখন গিটারে এক তারের ব্যবহারও দেখা গিয়েছিল। একসময়ে ইতালিতে পাঁচ-তারের গিটার জায়গা দখল করে চার তারের গিটারের। সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে গিটারে ছয় তারের ব্যবহার শুরু হয় এবং ইতালি থেকে ইউরোপেও এর প্রভাব দেখা যেতে লাগলো। জার্মান মাস্টার হ্যামবার্গ, জোয়াকিম থিয়েল্ক প্রমুখ ব্যক্তিরা আধুনিক গিটারে তৈরীর সলতে পাকানোর কাজটা করেন। একেবারে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক গিটারের সূচনা ঘটে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় গিটার হাতে মঞ্চে উঠেছিলেন জর্জ হ্যারিসন। বাংলাদেশে বিপন্ন মানবতাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন। গেয়েছিলেন সেই বিখ্যাত গান ‘যশোর রোড’।পৃথিবী ঘুরে তাকিয়েছিলো যুদ্ধে বিক্ষত বাংলাদেশের দিকে। বাড়িয়ে দিয়েছিলো সাহায্যের হাত।
দুনিয়াজুড়ে গিটার নিয়ে পাগলামীরও অন্ত নেই। মমতাজের জন্য সম্রাট শাজাহান তাজমহল তৈরি করেছিলেন। ভালোবাসার এমন প্রকাশ আজও পৃথিবীতে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। কিন্তু ভারত সম্রাটের চাইতে কম যান না আর্জেন্টিনার পেদ্রো মার্টিন ইউরেতা। মৃত স্ত্রীর জন্য তৈরি করেছেন ভালবাসার এক আশ্চর্য বাগান। সাত হাজার দেবদারু ও ইউক্যালিপ্টাস গাছ দিয়ে তৈরি এই বাগানের আকৃতি গিটারের মতো।গণমাধ্যমে এই সংবাদ আলোড়ন তৈরী করেছে।
ষাটের দশকের এই প্রেমকাহিনীর নায়িকা গ্রাসিলা। প্রথম দেখাতেই যার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন পেদ্রো। সব ঠিক ছিল। কিন্তু, ৭৭ সালে পেদ্রোর পঞ্চম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে সেরিব্রাল স্ট্রোকে মারা যান গ্রাসিলা। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৫। গ্রাসিলার মৃত্যুর পর ভেঙ্গে পড়েছিলেন পেদ্রো। জীবন যেন শেষ হয়ে গিয়েছিল তার কাছে। হঠাৎ তার মনে পড়ে গ্রাসিলার এক সুপ্ত ইচ্ছার কথা। নিজের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র গিটারের আকৃতির এক বাগান তৈরি করতে চেয়েছিলেন গ্রাসিলা।
মনে পড়তেই যেন বাঁচার নতুন আশা খুঁজে পান পেদ্রো। ১৯৭৯ সালে নিজের জমিতে শুরু করে দেন বাগান তৈরির কাজ। এ কাজে তাকে সাহায্য করেন ছেলেমেয়েরাও। সবাই মিলে তিলে তিলে তৈরি করেন ভালবাসার এই বাগান, শুধুমাত্র গ্রাসিলার জন্য।
শুরু করেছিলাম গিটারের সঙ্গে বিদ্রোহের আত্নীয়তা খোঁজার কাজ। গিটার নামে বাদ্যযন্ত্রটি যে একদা তারুণ্যের বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে উঠেছিলো তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে গণতন্ত্রের জায়গায় উপনিবেশের গর্ভে জন্ম নেওয়া নয়া উপনিবেশবাদ, পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, সামরিকীকরণ, অস্ত্র-বাণিজ্য এবং এর প্রতিবাদেই ঘটে ষাটের দশকের বিস্ফোরণ। পৃথিবীর দেশে দেশে তৈরী হয় উত্তাল আন্দোলন। ছাত্র-শিক্ষক, নারী-পুরুষ, শ্রমিক-কৃষক, বুদ্ধিজীবী-বিজ্ঞানীসহ বিশ্বব্যাপী এত মানুষের প্রতিবাদ এর আগে দেখেনি পৃথিবী।আর ঠিক তখনই সঙ্গীতের জগতে গিটার হাতে গায়কদের বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিখ্যাত বিটলস ব্যান্ডের জন লেনন তখন স্কুলের ছাত্র। তাকে একবার রচনা লিখতে দেয়া হলো; প্রসঙ্গ-জীবনে কী হতে চাও। ক্লাসের সহপাঠীরা স্বাভাবিক ভাবেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট , প্রেসিডেন্ট এসব হতে চাওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে রচনা লিখে জমা দিলো । জন লেনন ওসবের কিছুই লিখলেন না , তিনি লিখলেন- আমি জীবনে সুখি হতে চাই ।
এই লেখা দেখে শিক্ষক তাকে ডেকে বলেছিলেন, লেনন সম্ভবত বিষয়টির অর্থই বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। শিক্ষকের কথার জবাবে লেনন শিক্ষককে সেদিন বলেছিলেন-“ আপনি সম্ভবত জীবনের মানেই বুঝতে পারেন নি ।’’
গিটার হাতে জন লেনন পৃথিবীর বুকে জীবনের অর্থ খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। প্রতিবাদ করেছিলেন, সত্য কি সেটা গিটারের তারে ঝংকার তুলে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তার মতো এমন অনেক তরুণই গোটা দুনিয়া জুড়ে গিটার হাতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন মানুষের অধিকারের কথা বলতে। ষাট থেকে যাত্রা শুরু করে সত্তরের দশকেও প্রভাব বিস্তার করেছিলো এই বিদ্রোহী গিটার। যার সুর কাঁপিয়ে দিয়েছিলো স্রোতাদের হৃদয়। বব ডিলানের আসল নাম রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান। রক অ্যান্ড রোলে প্রথমে তাঁর উৎসাহ থাকলেও পরে তিনি আমেরিকান ফোক সংগীতে, বিশেষ করে যেসব সংগীতে অ্যাকুস্টিক গিটার ব্যবহৃত হয় তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। মিনেসোটার বিভিন্ন কফি হাউসে জিমারম্যান গান গাইতেন। ডিঙ্কিটাউনে থাকাকালে জিমারম্যান নিজেকে ‘বব ডিলান’ নামে পরিচয় দিতে শুরু করেন।
সেই সময়টা ছিল এক উত্তাল আন্দোলনের ঐতিহাসিক কালপর্ব। সেই ষাটের দশকে সাম্রাজ্যবাদ নয়া উপনিবেশবাদের ব্যাপক উত্থান, যুদ্ধের বিস্তার, দেশে দেশে সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক ও জনপ্রিয় সরকারগুলোকে জোর করে বিদায় করে দেওয়ার ঘটনা যেমন দেখা যায়, তেমনি এর বিপরীতে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ-বিক্ষোভের চিত্রও এর আগে এত ব্যাপক পরিসরে দেখা যায়নি।সেইসব আন্দোলনে প্রথম সারিতে ছিলেন বব ডিলান। গিটারকে তখন নিয়ন্ত্রণ করছিলো রাজনীতির ঝড়।
সত্তরের শুরুতে জন্ম নিয়েছিলো রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশ। সেই সদ্য স্বাধীন দেশেও তরুণরা গিটার হাতে উঠে এসেছিলেন সঙ্গীতের মঞ্চে। তাদের হাতে তখন গিটারকে বন্দুকের চাইতে কম কিছু মনে হয়নি।
গিটার কেন জানি না সবসময়ই তারুণ্যের প্রতীক, বিদ্রোহের প্রতীক। গিটার হাতে দুনিয়া কাঁপানো তরুণ গায়করাও ভয়ের সামনে, রাজনৈতিক তান্ডবের সামনে গিটার হাতে প্রতিবাদ করেছেন তাদের গান দিয়ে। তারা ভয় পাননি। কারণ তারা জানতেন গিটারটিও বন্দুক হয়ে উঠতে পারে।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল