আমাদের প্রিয় বেলাল ভাই

ঊর্মি রহমান

বেলাল ভাই তাঁর একটি কবিতা ‘এখনো যারা বেঁচে আছি’তে লিখেছিলেন, “দীর্ঘজীবী হোক সুস্থ জীবন এবং যাবতীয় সুন্দর/এবং ভালবাসা”। বাস্তবে তো তা ঘটে না। তবে তাঁর এই প্রার্থনা নিশ্চয়ই পূরণ হবে, ‘যাবতীয় সুন্দরও ও ভালবাসা’ দীর্ঘজীবী হবে। বেলাল ভাই আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। এই ভাবনাটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যাঁর সম্পর্কে ‘নেই’ শব্দটা একেবারে বেমানান। তাঁর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। এমন প্রাণবন্ত, হাসিখুশি ও আন্তরিক মানুষটা কি করে নেই হয়ে যান? অনেকদিন দেখা না হলেও মনে হতো বেলাল ভাই তো আছেন। থাকবেন।
তাঁর সঙ্গে কবে থেকে পরিচয় সেটা মনে করতে পারি না। সত্তর দশকের কোন এক সময়ে। তারও আগে তাঁর কথা শোনা ছিল। তিনি কবি, শক্তিশালী কবি। তিনি কলকাতা গিয়ে থেকে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানকার কবিদের বন্ধু এবং প্রিয়জন হয়ে উঠেছেন। তাই দেখা হবার আগে একটু কৌতূহল ছিল। কিন্তু ভাবিনি তিনি কাছের মানুষ হয়ে উঠবেন আর আমি তাঁর অপার স্নেহের  পাত্রী হয়ে উঠবো। সেটাই হয়েছিল। সত্তর দশকেই নানা জায়গায় বেলাল ভাইর সঙ্গে আড্ডা হতো। এখানে বলে রাখা ভাল, বেলাল ভাই ও আড্ডা প্রায় সমার্থক। সে সব আড্ডার রঙ-রস-গন্ধ আর অবয়ব ছিল অন্য মাত্রার। বেলাল ভাই মানুষের সঙ্গে মিশতে জানতেন। তিনি চলে যাবার পর কলকাতায় আমাদের একজন চিত্র নির্মাতা বন্ধু বললো, তার সঙ্গে বেলাল ভাইর একবার আলাপ হয়েছিল। তার মনে হয়েছিল এমন চমৎকার মানুষ কম পাওয়া যায়। অত্যন্ত সুদর্শন আর হাসিখুশি বেলাল ভাইর সঙ্গে যারই দেখা হয়ছে, তারই এমন কথা মনে হওয়া স্বাভাবিক।
সাংবাদিকতার সূত্রে তাঁর ভাই গিয়াস কামাল চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় ছিল। সে সময় ঢাকার সাংবাদিক মহলও খুব বড় ছিল না, তার ওপর আমরা নারী সাংবাদকিরা সংখ্যায় ছিলাম খুব কম। আমরা প্রায় সবাই সবাইকে চিনতাম। কিন্তু গিয়াস ভাই বেলাল ভাইর ছোট ভাই জেনে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ বেলাল ভাই ছিলেন চির তরুণ। বেলাল ভাই অনেক পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বে নিযুক্ত থেকেছেন। সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ, ভারত বিচিত্রা, সচিত্র সন্ধানী। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত কৃত্তিবাস পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও তিনি এক সময় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে সামলেছেন। তিনি যখন সচিত্র সন্ধানীর দায়িত্ব নিলেন, তখন তাঁর ব্রিগেডে আরো অনেক তরুণ কর্মীর মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। আমি তার আগেও সচিত্র সন্ধানীতে কিছু লিখেছি। পত্রিকাটির সত্ত্বাধিকারী ছিলেন আমার আর একজন প্রিয় মানুষ প্রয়াত মনু ভাই, গাজী শাহাবুদ্দিন। বেলাল ভাই আসার পর পত্রিকাটির চেহারায় যেন জৌলুস এলো। তাঁর সঙ্গে কাজ করাটা ছিল খুবই আনন্দদায়ক। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা চলতো। আড্ডার মত পত্রিকাতেও নানা বিচিত্র বিষয় অন্তর্ভূক্ত থাকতো। একবার মধুমাস নামে একটি কভার স্টোরি করা হয়। সেখানে আম নিয়ে লিখেছিলাম এবং প্রভূত আনন্দ পেয়েছিলাম। টেলিভিশন সমালোচনা লিখতে বললেন বেলাল ভাই। লিখলাম ছদ্মনামে। বিটিভি কর্তীপক্ষের কড়া সমালোচনা পছন্দ হয়নি। তাঁদের একজন আমার খোঁজে এসেছিলেন। বেলাল ভাই অম্লান বদনে বলে দিলেন, ‘ও তো এখানে আসে-টাসে না। বাড়ি থেকে লিখে পাঠিয়ে দেয়।’ আমাকে বললেন,‘ক’দিন আর এ মুখো হয়ো না।’ সচিত্র সন্ধানীতে বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল আনন্দের, মধুর। তারপর তিনি সচিত্র সন্ধানী ছেড়ে দিলে আমরাও অনেকে ছেড়ে দিয়েছিলাম।
এরপর বুড়িগঙ্গায় অনেক পানি বয়ে গেছে। আমার জীবনেও অনেক ওঠা-নামা হয়েছে। কিন্তু বেলাল ভাইর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। মাঝে মাঝে আড্ডা হয়েছে। তিনি ভারত বিচিত্রায় যোগ দেবার পর সেখানেও গিয়েছি। একদিন ঠাট্টা করে বললেন,‘সকাল থেকে প্রথমে করি ছাত্র বিচিত্রা, তারপর ভিসা বিচিত্রা এবং সবশেষে ভারত বিচিত্রা।’ একবার আমারও ভারতের ভিসা দরকার ছিল। আমিও বেলালভাইর ‘ভিসা বিচিত্রা’র সুযোগ নেবার জন্য তাঁর শরণাপন্ন হলাম। সহজেই আমার ভারত ভ্রমণের ভিসা হয়ে গিয়েছিল। এরই মাঝে আমি লন্ডন চলে গেলাম বিবিসি’তে যোগ দিতে। দেশে এলে যথারীতি আড্ডা হতো। সাধারনত কবি রফিক আজাদের বাড়িতেই সেটা হতো। বেলাল ভাই তো থাকতেনই, থাকতেন রবিউল ভাই ও আরো কেউ কেউ। এরা সবাই আবার আমার বড়ভাই বাবুলের বন্ধু। তাঁদের সবার কাছে অপার স্নেহ পেয়েছি। বেলাল ভাই আমার ভাইদের কোম্পানী রহমান কেমিক্যালস্’এ কিছুদিন বসেছেন এবং কোনো একটা দায়িত্ব পালন করেছেন। একবার গিয়ে শুনলাম রবিউল ভাই খুব অসুস্থ। সেবার আড্ডাটা তাঁর বাড়িতে হয়েছিল। আমার স্বামী সাগর চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম আলাপেই বেলাল ভাইর দারুণ সখ্য হয়েছিলো। এরকম কোনো একবার দেশে এলে বেলাল ভাই আমাকে ও আমার স্বামী সাগর চৌধুরীকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এক প্রকাশকের কাছে নিয়ে গেলেন। এরকম সাধারণত কেউ করেন না। বেলাল ভাই শুধু আমাদের সম্পর্কে তাদের বলা নয়। সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন। তারা আমাদের কতটা চিনত জানি না, বেলাল ভাইর কথায় সাগরের একটি বই প্রকাশ করল, ‘প্রবাস বৃত্তান্ত: বিলেতি সংস্কৃতির নানা কথা’। লেখাগুলো আগে কালি ও কলম পত্রিকায় বেরিয়েছিলো। তাদের সঙ্গে সেই পরিচয়ের পর একবার তাদের অনুরোধে আমি লিখলাম ‘যুদ্ধাপরাধ দেশে দেশে’।
এরপর লন্ডনে দেখা হলো বেলাল ভাইয়রে সঙ্গে সেখানকার একটি কবিতা সম্পর্কিত সংগঠন ‘সংহতি’ সেবার তাদের নিয়মিত বার্ষিক কবিতা উৎসবে বেলাল ভাই ও রফিক (আজাদ) ভাইকে আমন্ত্রণ জানাবে বলে ঠিক করেছিলো। আমি এবং সাগর কবি না হওয়া সত্ত্বেও তাদের আপনজন ছিলাম। প্রবাসে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কিছু তরুণ-তরুণী যে বাংলা সাহিত্যের চর্চা করে, আমি তাতে মুগ্ধ ছিলাম। তাদের উৎসাহ দিতাম। তারাও আমাদের ভালবাসতো, শ্রদ্ধা করতো। বেলাল ভাই ও রফিক ভাই লন্ডন যাচ্ছেন জেনে সংহতির ছেলেমেয়েদের বলেছিলাম, তাঁরা দু’জনে আমার বন্ধু। ওরা বললো চাইলে তাঁরা আমাদের বাড়িতে থাকতে পারেন। তারা আবার তাদের সুভ্যেনিরে আমাকে রফিক ভাই সম্পর্কে লিখতে বললো। একজন কবি, যিনি আমার মতই তাদের অগ্রজের মত, তিনি অবশ্য আপত্তি জানিয়েছিলেন, কেন একজন অ-কবি কোন কবি সম্পর্কে লিখবে! আমি তাতে সরে আসতে রাজী ছিলাম, কিন্তু ওরা শুনল না। আমি লিখলাম। পওে বেলাল ভাই বলেছিলেন, ‘তুমি আমার সম্পর্কেও লিখতে পারতে।’ তাঁকে ঐ কবির আপত্তির কথা জানিয়ে বলেছিলাম, একজন সম্পর্কে লেখার কারণেই অসন্তোষের মুখোমুখি হয়েছিলাম। দু’জনের সম্পর্কে কি করে লিখি?
যাহোক আবার সেই কবিতা উৎসব উপলক্ষে আমার দুই প্রিয় মানুষের সঙ্গে লন্ডনে দেখা হল। কবিতা উৎসব সুন্দরভাবেই হল। উদ্যোক্তাদের অনুরোধে আমি বেলাল ভাইর হাতে স্মারক তুলে দিলাম। উৎসবকে কেন্দ্র করে নিমন্ত্রণও হল এখানে সেখানে, প্রবাসে যা দস্তুর। একদিন সংহতির উদ্যোগে পিকনিক হল। কয়েকদিন আমাদের বাড়িতে ছিলেনও তাঁরা। তুমুল আড্ডা, কিছু ঘোরাঘুরি হলো। সেবার লন্ডনে খুব কাছে পেয়েছিলাম রফিক ভাই ও বেলাল ভাইকে। লন্ডনে আমাদের বন্ধু নাজেস আফরোজের সঙ্গে বেলাল ভাইর দেখা হল। নাজেস এক সময় কলকাতার আজকাল পত্রিকায় কাজ করত। সেই সময় ও নকশাল আন্দোলন সম্পর্কে বেশ কিছু নিবন্ধ লিখেছিল। সম্ভবত একটা সিরিজ লিখেছিল, যা বেলাল ভাইর খুব পছন্দ ছিল। তিনি সেগুলোকে গুছিয়ে বই আকারে ছাপার জন্য নাজেসকে বললেন। আমি নিশ্চিত ছিলাম, প্রকাশকও তিনিই জোগাড় করতেন। নাজেস রাজী হল না। বললো, শুধু ঐ নিবন্ধগুলো থেকে একটা বই হয় না। বেলাল ভাই ও আমরা বললাম, ‘বেশ, তুমি সেভাবেই পাণ্ডুলিপি তৈরী কর। আরো যা যোগ করার করো।’ নাজেস কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজটা করেনি। ওর সময়ের অভাবও ছিল। বিবিসি’তে বড় দায়িত্ব পালন করছিল তখন। বেলাল ভাই কিন্তু তারপরও বহুবার এই একই অনুরোধ করে গেছেন। শুধু নিজের সাহিত্যকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকার মানুষ তিনি ছিলেন না। অন্য কারো লেখা ভাল লাগলে তার জন্য বাড়তি সময়-শ্রম দিতে রাজী ছিলেন আমাদের প্রিয় বেলাল ভাই।
তারপর আমরা অবসর নিয়ে কলকাতা এসে বসতি গাড়লাম। বেলাল ভাই তাঁর প্রিয় শহর কলকাতায় মাঝে মাঝেই আসতেন। এখানে তাঁর বন্ধু-বান্ধব অনেক। তারপরও আমাদের বাড়িতে উঠেছিলেন একাধিকবার। তখন দেখেছি, তিনি কলকাতা ছেড়ে গেলেও কলকাতা তাঁকে ছাড়েনি। জগত-সংসারে সবাই পূর্ব বঙ্গের রান্নার প্রশংসা করে। কিন্তু বেলাল ভাইর পশ্চিম বঙ্গের রান্না পছন্দ। তিনি যতদিন ছিলেন, আমি এদেশেীয় রান্না করে তাঁকে খাওয়াবার চেষ্টা করেছি। কোন কোনদিন তিনি শুধু ঝিঙে- আলু পোস্ত দিয়ে ভাত খেয়েছেন, অন্য কোন পদের দিকে ফিরেও তাকাননি। একবার আমাদের বড়িতে ছিলেন না, কলকাতায় এসেছিলেন বলে জানিয়েছিলেন। বইমেলায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দেখি একটা ব্যাগে অনেকটা লাল আলু নিয়ে তিনি ঘুরছেন। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম তিনি তাঁর ইন্দ্রনাথদার জন্য ঢাকা থেকে ওই আলু নিয়ে এসেছেন। ইন্দ্রনাথ মজুমদার শান্তিনিকেতনে থাকতেন বলে শুনেছি, দূষ্প্রাপ্র বই নিয়ে তাঁর কাজ ছিল। বেলাল ভাইর প্রিয় ব্যক্তিত্ব। বেলাল ভাই জানালেন ঠিক ঐ আলুটা কলকাতায় পাওয়া যায় না। আমি বললাম, ‘আমার ভাগের আলু কোথায়, বেলাল ভাই।’ বললেন, ‘তুমি ঢাকা এসো, তোমাকে লাল আলু দেব।’
তার কিছদিন পর তিনি খুব অসুস্থ হয়ে গৃহবন্দী হয়ে পড়লেন। থাকতেন একটি লিফটবিহীন পাঁচতলা অ্যাপার্টমেন্টে। আগে একাধিকবার গেলেও এখন সেখানে হেঁটে ওঠা আমাদের পক্ষে সহজ ছিল না, বিশেষ করে আমার স্বামী সাগরের পক্ষে। বেলাল ভাই-ই একবার ফোনে ওকে বললেন, ‘এ জীবনে তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।’ সত্যি আর দেখা হয়নি। তাঁর খবর পেয়েছি। ফোনে কথা হয়েছে। শেষে একবার তাঁর কথা বুঝতে পারিনি। বিষন্নভাবে ফোন ছেড়ে দিয়েছি। নিয়তিকে মেনে নিয়েছি। অথচ সত্যি যখন তিনি চলে গেলেন, তখন কিন্তু মানতে পারছি না বেলাল ভাই আর নেই। বেলাল ভাইকে ভালবাসি বলে নয়, সত্যি তাঁর মত অকপট, সহজ, আন্তরিক মানুষের দেখা আমি কম পেয়েছি। আমি কবিতা বুঝি বলে দাবী করি না। কিন্তু এখানে তাঁর একটি কবিতা উদ্ধৃত করবো, যা বলবে তিনি কতটা অকপট ও সহজ মানুষ ছিলেন।
“সারাদিন আমি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে
কী দেখছিলাম? ভাট ফুল, আকন্দের ঝোপঝাপ
মাছরাঙাদের অকারণ খিটিমিটি?
গ্রামীণ ছবিতে আজ আর নেই সেই কিংবদন্তীখ্যাত
মসলিন, নকশিকাঁথার দিন?
. . . . . . . . . . . . . . .
হঠাৎ আমার মনে হল: এই বিংশ শতাব্দীর একজন
নিঃসঙ্গ মানুষ আমি
ভান করি নির্বাসিতের, অনিকেত বনতে উদ্বাহু হয়ে উঠি
অথচ জন্মেছি এই সব অখ্যাত গ্রামে গঞ্জেই, পূর্বপুরুষেরা ছিলেন কৃষিকর্মী;
অধুনা আত্মপ্রতারণায় নগরনিবাসী আমি
আর কতকাল এমন করে নিজেকেই নিজের চোখ ঠাওরাবো।”

কবি বেলাল চৌধুরী, আমাদের প্রিয় বেলাল ভাইর প্রতি আমি আমার অসীম শ্রদ্ধা জানাই।

ছবি: গুগল