সব মা’দেরকে…

রুকসানা আক্তার

(ইংল্যান্ড থেকে): “মা ” সত্ত্বা এক স্বর্গীয় এবং অপার স্নেহ-মমতা-ভালবাসার  অনুভূতির  যেমন ,তেমনি একাধারে ত্যাগ , যন্ত্রণা , উৎকণ্ঠাএবং দুশ্চিন্তার নামও । এই যন্ত্রনা প্রসববেদনা থেকে শুরু হয় এবং দুশ্চিন্তা শুরু হয় তারও আগে থেকে। কিন্তু ” মা” সব সয়ে নেয়। সন্তানের জন্য যাপিত জীবনের যে কোন কষ্টই , এক মাত্র  মাই হাসি মুখে বরণ করে নেয়। উপরের এই লাইন গুলো একজন  মায়ের মেয়ে এবং একজন বাচ্চাদের মা হিসাবে  আমার একান্ত নিজস্ব অভিজ্ঞতা,অনুভূতি এবং উপলব্ধির প্রকাশ মাত্র। আমি জীবনে দুইবার মা হয়েছি। এই দুইবার ই সন্তান ধারণ থেকে জন্মদান পর্যন্ত পুরো মাস গুলো বলতে দ্বিধা নেই যে,  আমার জন্য খুব একটা সুখকর ছিল না। মানসিক যাতনা ছিল সেই সঙ্গে ছিল দুশ্চিন্তা। মানসিক যাতনা কার দ্বারা সেই কথায় নাই বা গেলাম। দুশ্চিন্তা ছিলো প্রথমবার এই কারণে যে , এই রকম মানসিক এবং শারীরিক যাতনা চলতে থাকলে বাচ্চার ভবিষৎ কি হবে। বয়স কম ছিল। সাহসের কোটা ছিল শূন্যতে। আশা ছিলো হয়তো একদিন ঠিক হয়ে যাবে সব।
দ্বিতীয় বার যখন সন্তান ধারণ করলাম,  যুক্তরাজ্যে এসাইলামে আছি তখন।।অনেক দুশ্চিন্তা। পারমিশন পাব তো?না পেলে আমার বাচ্চা দু’টোর ভবিষৎ কি? সেই সঙ্গে মানসিক অত্যাচার। দ্বিতীয় বাচ্চা জন্ম হওয়ার সাত দিনের মাথায় প্রচন্ড হাই ব্লাড প্রেসার নিয়ে দ্রুত হসপিটালে ভর্তি হই। ডাক্তার বলে তুমি ভাগ্যবতী যে স্ট্রোক হয় নাই। তারপর  প্রেসার এ ছয়মাস ভুগি। কিন্তু মনের জোর হারায় নি। অনেক চেষ্টা করে ও “একজন” তা ভাঙতে পারেনি আর এর সিক্রেট হলো আমার  মা সত্তা। যা এখন আমার বাচ্চা দু’টোর জন্য আমাকে পাহাড় ডিঙাতে সাহস যোগায়। 

বাচ্চা জন্ম দেয়া থেকে এখন পর্যন্ত  প্রতিটা দিন একবার হলেও আমার মায়ের জন্য আমার ভিতর বাহির অশ্রুসিক্ত হয় ,কারণ মায়ের অনুভূতি এবং কষ্ট ত্যাগ আমি নিজে বহন করে চলেছি প্রতিদিন । আমার তো দু’টো বাচ্চা আর আমার মায়ের ছিল আট জন বাচ্চা। না জানি আমার মায়ের  কত কষ্ট এবং ত্যাগ করতে  হয়েছে। না জানি আমাদের জন্য কত নির্ঘুম রাত পার করেছেন। আমার মাকে  কষ্টের সব কিছু বলতাম না । হয়তো কিছু কিছু শুনে ছিলেন আর তাই ফোন করলে এবং  মাঝে মাঝে উনার প্রতি আমার ভালবাসা আদর প্রকাশ করে যখন বলতাম ,তুমি না জানি আমাদের জন্য কত কষ্ট করেছ। আমাদের মাফ করে দিও। আমার মা   বলতেন ,তুমি  সুখে আছতো। আমি বানিয়ে বানিয়ে অনেক কথা বলতাম। কিন্তু আমার সহজ সরল মায়ের আশঙ্কা থেকেই যেত।  আমি  যেদিন যুক্তরাজ্যে  থাকার পারমিশন পাই সেদিন দেশে ফোন করে খবর জানিয়ে বলি আম্মাকে আগে খবর টা দিয়ো। খবর শুনে আমার মা কেঁদে বলেছিলেন নাকি , আমার মেয়েটা এতো কষ্ট করেছে। একজন মা তার বাচ্চার কষ্টে কতটুকু কষ্ট পেলে  যে, এত  ভালো খবরে শুনে ও মেয়ের কষ্টের কথা মনে করে কাঁদতে পারে !! আমার চেয়েও মনে হয় আমার মা বেশি কষ্ট পেতেন আমার জন্য। আমি দেশে থাকতে মায়ের কাছে গেলে এখনো মনে পড়ে কাছে এসে বলতেন , ওগো বেটি তুমি কিতা খাইবায় অর্থাৎ আমার মন কি চায় খেতে। আহা রে এখন আর কেউ তো এভাবে জিজ্ঞেস করে না। আমার প্রাক্তন দেশে গেলে আমার মা বার বার ফোনে জিজ্ঞাস করতেন ,  জামাই আমাকে দেখতে কবে আসবে। ভদ্রলোক এসে বলতেন ,আমার মা প্রচুর  রান্না বান্নার আয়োজন করে খাইয়েছেন। আর বার বার নাকি আমার কথা জিজ্ঞাস করেন। কেমন আছি, কবে যাবো।  গিয়েছিলাম একবার তিনি বেঁচে থাকতে সাত বছর পর।

আমাকে কাছে পেয়ে ছোট মেয়ের মত আমার বুকে মাথা রেখে ডুকরে অঝরে কেঁদে ছিলেন। আসার সময় বিদায় বেলা বাসার গেইটের কাছে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন , আর কি আমারে আইয়া পাইবায়? আর তার ছোট বাচ্চারা মত কেঁদে ওঠা ।  আমার মায়ের সেই কান্নার মুখ আমাকে এখনো কাঁদায় ।উফ আমার নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হয়। এক কুলাঙ্গার সন্তান আমি।  কারণ আমার কষ্টে আমার মা অনেক কষ্ট পেয়েছেন এবং একজন মাকে আমার যা কখনোই দেয়া উচিত হয়নি। কাল রাতে কাজ থেকে  নার্গিসের বাসায় যাই। জেসমিন , অপু ভাই এবং আরো অন্যান্য জনের সঙ্গে দেখা হয়। একটু দেরি করে যখন বাসায় আসি ,দেখি আমার বাচ্চাদু’টো আমার বিছানাতে লেপ বালিশ নিয়ে লেপটপে ছবি দেখছে আর অপেক্ষা করছে। একটু অপরাধী লাগছিলো দেরি করে ফেরায়। তখন দশটা  বাজে। বাচ্চা দু’টো বড় হয়ে গেছে । ওদের মানসিক বয়স ওদের বয়সের তুলনায় একটু বেশি।  ওরা জানত আমি একজায়গায় গিয়েছি কাজ শেষে ।আমি কাছে গিয়ে দু’জনের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে সরি বলি। দেখি দুজনের চোখে মুখে আহ্লাদের উষ্ণ ছটা । আমার মায়ের কথা মনে হয়। পরীক্ষার সময় টাতে খুব চাইতাম আম্মা  যেন আমার পাশে আসেন বসেন । মুখে বলতাম না কিন্তু আম্মা ঠিক বুঝতেন । এত বড় সংসার আমাদের তবু  ছুতো নাতায় এটা সেটা নিয়ে মাঝে মাঝে এসে আমার পাশে ঘুরাঘুরি করতেন। নিজে মা না  হলে মায়ের  সার্বক্ষণিক অনুভূতি , দায়িত্ব , কষ্ট , উৎকন্ঠা কোন কিছুই অনুধাবন করা অসম্ভব। যেখানে  আছেন আমার মা যেন অনেক শান্তিতে থাকেন। খুব বলতে যে ইচ্ছে করে , তোমাকে অনেক ভালবাসি আম্মা। তোমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে আমার সব গুলো অশ্রু  বিসর্জন  দিয়ে দিতে বড় সাধ হয়। কিন্তু তা কি সম্ভব?তাই অশ্রু ভান্ডার আর নিঃশেষ হয় না।

ছবি: গুগল