দুধিয়া অথবা দুধে থেকে…

অর্ণব সরকার

ভারতের উত্তরবঙ্গ বেড়াতে এসে হাতে কয়েক ঘন্টা সময় আছে, কি করবেন কোথায় কাটাবেন ভাবছেন??? চলুন তাহলে আজ ঘুরে আসি শিলিগুড়ি থেকে ২৫ কিমি দূরে বালাসন নদীর ধারে একটা সুন্দর নিরিবিলি জায়গা নাম- “দুধিয়া অথবা দুধে”. দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়লাম কোথায় যাই কোথায় যাই করতে করতে ভাবলাম বাইকটা নিয়ে বেরোই তো তারপর দেখা যাবে. শিলিগুড়ি থেকে বেরিয়ে দার্জিলিং মোড় হয়ে হিলকার্ট রোড ধরে চলতে শুরু করলাম কিছুদূর যেতেই দাগাপুর আর শালবাড়ি এলাকার কোলাহলটা পার করলেই যেন মনে হয় আমি শহরে বন্দি দশা থেকে মুক্তি পেলাম. (তবে বলে না সব খারাপ এর মধ্যেই কিছু ভালো জিনিস থাকে তা হলো এক দিল্লী র লোটাস টেম্পল-এর আদলে তৈরি দাগাপুর এ খুব সুন্দর একটা লোকনাথ বাবার মন্দির আছে দুই শালবাড়ি বাজার এ আমাদের সবার ই প্রিয় দার্জিলিং-এর গ্লেনারিস এর একটি শাখা আছে. যেখানে আপনি মূল শাখার পরিবেশ না পেলেও খাবার এর স্বাদ কিন্তু একই রকম অনবদ্য) এর পর প্রথমেই যেটা পেলাম সেটা হল পেট্রল-ডিজেল এর গন্ধের পরিবর্তে চা বাগান-এর বন জঙ্গলের মন ভালো করা একটা গন্ধ. সঙ্গে উপরি পাওনা ছিল সকালের পর হয়ে যাওয়া কয়েক পশলা বৃষ্টির ফলে মাটির সোঁদা গন্ধ. আহা কি অপূর্ব তার মিশেল। এখানে তা বর্ণনা করা মুশকিল।

দুধিয়ায় বালাসন নদী

আক্ষেপ হচ্ছিলো যদি এই গন্ধ টা বোতল বন্দি করে বাড়ি নিয়ে যেতে পারতাম। যাই হোক আপসোস নিয়েই আবার চলতে শুরু করলাম। ট্রয় ট্রেন এর লাইন এর ধার ধরে চলতে চলতে পৌছালাম শুকনা মোড়-এ যেখান থেকে একটা রাস্তা যাচ্ছে রংটং…তিনধারিয়া হয়ে কার্শিয়াং আর দ্বিতীয় রাস্তাটা যাচ্ছে শুকনা আর্মি এরিয়া– শিমুলবাড়ী হয়ে রোহিনী রোড আর মিরিক রোড। আমি ধরলাম দ্বিতীয়টি। চলতে চলতে জঙ্গলের গা ছমছমে একটা অনুভূতি হয় যদি মহারাজ(হাতি) সামনে এসে দাঁড়ায়। যাই হোক এ যাত্রায় তেমন কিছু ঘটেনি। কিছুটা পরেই শুরু হয় শুকনা আর্মি এরিয়া। খুবই সুন্দর ভাবে সাজানো এরিয়াটি। এখানেই আছে মধুবন পার্ক. পার্ক টি আর্মিরাই পরিচালনা করে। প্রবেশমূল্য ১০/- সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬ টা অবধি খোলা থাকে। বাচ্চাদের আনন্দের জন্য এখানে অনেক আয়োজন আছে, আছে অনেক রাজঁহাস, গিনিপিগ, আর আছে প্রচুর বাঁদর তবে বাঁদর থেকে একটু সাবধান। এরপর আর্মি এরিয়া টা পার করে যেতে যেতে পড়বে শিমুলবাড়ী এখানে যদি রবিবার করে আসেন তবে দেখতে পাবেন একটা বড়ো গ্রাম্য হাট বসে্ এর উল্টো দিকেই নতুন তৈরী হওয়া পথের সাথী মোটেল, খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং একটা ভালো মোটেল এ যা যা সুযোগ সুবিধা থাকে তা সবই এখানে আছে্। এর পর রোহিনী রোডটা ডানদিকে রেখে সোজা এগিয়ে চললাম মিরিক আর পাঙ্খাবাড়ি রোডের দিকে। এই রাস্তা ধরে চলতে চলতে দেখা যায় ডানদিকে পাহাড় আর বামদিকে বহুদূর বিস্তৃত চা বাগান। কিছুদূর যাবার পর আসলো গাড়িধুরা বাজার যেখান থেকে মিরিক যাবার রাস্তা আর পাঙ্খাবাড়ি হয়ে কার্শিয়াং যাবার রাস্তা আলাদা হয়ে যায়। এখানে অবশ্যই VICKY TEA STALL-এ (GUPTA TEA STALL নামেই বেশি পরিচিত) খেয়ে দেখবেন চা…সিঙ্গারা…চাট… খুরমা… গরম গোলাপজাম।

অনুসন্ধান সিনেমার ঝুলন্ত সেতুর এখনকার রূপ।

প্রতিটা খাবারই অসাধারণ বিশেষত চা। তবে সপ্তাহান্তে আসলে ভিড়ের জন্য কিছুক্ষন অপেক্ষা করতেই হবে আপনাকে। তবে আমিও খাবো কিন্তু ফেরার সময়। এর পর প্রায় ৫ কিমি রাস্তা একদিকে চা বাগান আর একদিকে বন-জঙ্গল সঙ্গে সঙ্গ দিলো মসৃন রাস্তা, আহা আমার বাইক এর আনন্দর ধরে না সঙ্গে আমারও। তাকে অর্থাৎ নিজেকে একটু লাগাম টেনে বললাম “আস্তে”। এইভাবেই ৫কিমি রাস্তা পাড় করে পৌঁছে গেলাম দুধিয়া/দুধে। এখানে দুটি পাহাড়ের মাঝে দিয়ে বালাসন নদীর বয়ে আসার অপরূপ দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই, নিচে নদীতে নেমে পাথরের ওপর বসলে সময় কিভাবে কেটে যায় বোঝাই যায় না। আর এই নদীর ওপর দিয়ে গেছে দুধিয়া ব্রিজ। যারা বাগডোগরা এয়ারপোর্ট থেকে মিরিক অথবা দার্জিলিং যাবে তারা কিছুটা সময় বাঁচাতে ও যানজট এড়াতে পানিঘাটা হয়ে এই ব্রিজ এর ওপর দিয়ে যাতায়াত করে। আর গল্পে শোনা এই ব্রিজের ওপরই হয়েছিল বিখ্যাত বাংলা সিনেমা “অনুসন্ধান” এর শুটিং. যেই দৃশ্যে প্রথম অমিতাভ বচ্চন আর আমজাদ খান এর দেখা হয়। একদিক থেকে আমজাদ খান তার সাঙ্গ-পাঙ্গ দের সঙ্গে জিপ নিয়ে ব্রিজে উঠছে আর অন্য দিক থেকে অমিতাভ বচ্চন টুপিতে মুখ ঢেকে ঘোড়ায় চেপে আসছে। তখন অবশ্য এটি ছিলো ঝুলন্ত সেতু। এবার অতীত ছেড়ে বর্তমান এ আসি ব্রিজের শেষে কিছু দোকান আছে সেগুলি আমাদের মতো ভ্রমণপাগল মানুষ গুলোর ওপর নির্ভর করেই সারাটা বছর দোকান খোলা রাখে। সেই রকমই একটা দোকান থেকে চপ কিনে নিয়ে বসলাম নিচে নদীর মধ্যে একটা পাথরের ওপর। সঙ্গে এক অচেনা বন্ধু ও জোগাড় হয়ে গেলো তার জন্য নেওয়া হলো একটা বিস্কিটের প্যাকেট, এর পর দুজনে বিকেলটা নদী পাহাড়ের সহাবস্থান দেখতে দেখতে ভালোই কেটে গেলো। কিছুক্ষণ পর নদী থেকে উঠে বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে ফেরার জন্য রওনা দিলাম, সেও হয়তো লেজটা নাড়িয়ে বিদায় জানালো। এর পর ঘরে ফেরার পালা। ফিরেও এলাম কিছু দিনের জন্য মন ভালো রাখার ওষুধ নিয়ে.

শিলিগুড়ি থেকে দূরত্ব – প্রায় ২৫ কি.মি.
রাস্তার অবস্থা- খুবই ভালো.
গাড়ী ভাড়া – ১০০০/- থেকে ১২০০/- (রিজার্ভ)
অথবা শিলিগুড়ি থেকে মিরিক যাবার গাড়িতে উঠে দুধিয়া তে নেমে যাবেন ফেরার সময় ও একই ভাবে ফিরতে হবে.

ছবি লেখক