ঘুমিয়ে যায় বিশ্বচরাচর, আমি জেগে থাকি একা

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

আমার বাবা-মা

মায়ের কোন দিবস হয়না, কিন্তু আমাকে কেউ শুভেচ্ছা জানালে ইদানীং দেখি ভালোই লাগে।তারমানে মা দিবস অল্প অল্প করে জায়গা করে নিচ্ছে।এবারের মা দিবসে আমি রাজশাহী থেকে ফিরছিলাম। ফেলে আসা চারদিনের রাজশাহী আমাকে জ্বালাচ্ছিল। ফেরার পথে ট্রেন যখন বঙ্গবন্ধু সেতুর উপর তখন হঠাৎ নীচের যমুনা আমাকে সমূলে টান দিল।আমি ট্রেনের অন্ধকার বাথ এ শুয়ে কাঁদতে লাগলাম। ঠিক তখনি আমেরিকা থেকে রতনা’পা ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জার এ জিজ্ঞেস করলেন “কেমন আছিস কনা” আমি আবেগাপ্লুত হয়ে ট্রেনের হিমায়িত এসিতেও ঘেমে গেলাম।কি যন্ত্রণা! আমার রত্না’পা আমার মায়ের মত একজন! মাত্র তিন বছরের বড় কিন্তু তার কোলেপিঠেই বেড়ে ওঠা

আমার।তার হাতের তালুতেই আমার ঘুম খাওয়া নাওয়া চুল বাঁধা কান টানা খাওয়া! ওর সব জামাজুতা আমার দখলে ছিলো।গানের গলা ছিলো পাখীর মত, কিন্তু কি মনে করে সরে দাঁড়ালো, আমি আব্বার নজরদারীতে পড়লাম। সেই রত্না’পাকে মা দিবসে একটু ইনবক্সে ভালবাসা জানাবো, তার আগেই একই সময়ে তার জিজ্ঞাসা, কনা কেমন আছিস! হঠাৎ মনে হল রত্না’পাকে সঙ্গে নিয়ে যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে দাদীবাড়ী কাজিপুরের সেই মাইজবাড়ী গ্রামে দাদীমার সামনে গিয়ে দাঁড়াই।কিন্তু কিভাবে? দাদী কবেই নাই, বাড়ীও তার আগে যমুনাগর্ভে বিলীন। অস্থির হয়ে ফেসবুক থেকেই বের হয়ে এলাম।নাহ, এই মা দিবস আমাকে অস্থির করে দিল।যমুনার পশ্চিমে আছেন বড়বোন পারুল আপা , তাকেও কতদিন দেখিনা! হঠাৎ মনে হল আরে! মার সঙ্গেই তো কথা হয়নি।সঙ্গেসঙ্গেই ফোন দিলাম। আম্মার সেই উদ্বিগ্নতা, কেমন আছিস মা? এতো ব্যস্ততা, শরীর ভালো আছে মা?

সত্তর বছর বয়সী মা আমার, আমার জন্য উদ্বিগ্ন, মায়ের সঙ্গে মন ভরে কথা শেষ করার আগেই নেটওয়ার্ক আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিলো। আবার ফেসবুক খুলে বসলাম। দেখলাম ফেসবুকের এক বোন দোলন আশরাফ লিখেছেন “মা, তোমাকে কখনওই বলা হয়নি তোমাকে কতটা ভালবাসি! কখনো একটা চুমুও দেয়া হয়নি, জড়িয়েও ধরিনি, কারণ আমি তোমাকে ভয় পাই! আমি অবাক হয়ে গেলাম।দোলনের জন্য দুঃখ হলো, আবার সঙ্গে সঙ্গে নিজের কিছু দুঃখ বোধ আবার জেগে উঠলো। দোলন কে ধন্যবাদ, তার লেখা আমার মনের আফসোস কে ফেনিয়ে তুললো।চলে গেলাম সেই অবধারিত শৈশবকালে। মনে পড়ে মা আমার অসম্ভব রূপবতী ছিলেন।কিন্তু সাজগোজ একদম পছন্দ করতেন না।আব্বার খুব ইচ্ছায় চোখে কাজল আঁকতেন।এই পর্যন্তই।আব্বা নিজ হাতে মায়ের দীঘল চুলে খোঁপা বাঁধতেন।

বাবা মায়ের সঙ্গে আমরা

সে অন্য অধ্যায়।কিন্তু যখন থেকে আমি সাজগোজ শুরু করলাম তখন কি বা প্রসাধনী ছিলো আমার তবুও যা ছিলো তা দিয়ে আম্মাকে সাজানোর প্রচণ্ড ইচ্ছাকে আমি রোজ দমনের চেষ্টা করেছি।তারপর ও যখন আমি পিল অফ আইলাইনার ও মাসকারা হাতে পেলাম তখন ভয়াবহ ইচ্ছে হতো আম্মার অদ্ভুত সুন্দর চোখে পয়লা কাজল দিয়ে একে উপরের পাতায় লাইনার একে মাসকারা দিয়ে আম্মার লম্বা লম্বা পাপড়ি আরো সুন্দর করে দেই।এই লোভটি এমন হয়ে উঠলো যে রোজ স্বপ্নে আম্মাকে সাজাই! সাজাই আর মুছি, মুছি আর সাজাই! কিন্তু এই ইচ্ছেটি আম্মাকে বলার এক কনা সাহসও আমার নাই, আমি এই অবদমিত ইচ্ছা বুকে নিয়ে রোজ ঘুমাই জাগি জাগি ঘুমাই।একসময় তা ফিকেও হয়ে যায়। জীবনের এই মধ্য বয়সে এসে নিজের জীবন কে সাদা চোখে দেখতে গিয়ে মাকেও দেখি।স্বামীর প্রিয়তমা স্ত্রী ছিলেন আমার মা, তিনি এখন বৈধব্য জীবন যাপন করছেন। সব গয়না খুলে ফেলেছেন। আমার আর মাকে সাজানোর আফসোস আফসোসই রয়ে যায়। মাকে নিয়ে বিদেশ বেড়িয়েছি, আমেরিকা নিয়ে গেছি, মাঝেমধ্যে এখানে ওখানে খেতে যাই, কিন্তু হঠাৎ এক অদ্ভুত ইচ্ছে মনে এসে ভর করলো। জীবনে কখনওই মায়ের গান শুনিনি, কোরআন পড়া শুনেছি, কিন্তু মায়ের গুনগুন কখনওই শুনিনি, কিন্তু নিশ্চয়ই আমাকে ঘুম পাড়াতে গান গাইতেন, সেই গান শরীরের, আত্মার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেলেও কোন শিশুই তা মনে রাখতে পারেনা।সে আফসোস ও আমার রয়ে গেলো কিন্তু একটা ইচ্ছে আমাকে মানিপ্ল্যান্টের শেকড়ের মত নাগপাশে জড়িয়ে নিচ্ছে।সেই ইচ্ছেটি হল শিশুর মত বুকে জড়িয়ে মাকে ঘুম পাড়াবো! অপরূপ করুন সুরে গাইবো ” দোলে খুকুমণি ঘুমায় সেতো জানি চাঁদ হাসে ঘোমটা টানি মিটিমিটি চায়রে, আমার ঘুম মামার ঘুম খুকুর চোখে যায়রে” মা আমার গানে ঘুমাবেন।জাগবেন, ভাববেন তাঁর মা এসে তাঁকে ঘুম পাড়াচ্ছিলেন, তিনি আবেশে আনন্দে মায়ের বুকের ওম নিয়ে আবার ঘুমাবেন, তারপর আবার জেগে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলবেন “মাগো, আবার গাও, আমি আবার ঘুমাই মা! আমার এই ইচ্ছাটি খুব নাটকীয়। মায়ের সামনে গান আমি গাইতেই পারিনা, তাই অন্যসব ইচ্ছের মত এ ইচ্ছেটিও মুঠিবদ্ধ করে জেগে থাকি আমি, ঘুমিয়ে যায় বিশ্বচরাচর, কিন্তু আমার আমিকে কান্না থেকে কিছুতেই বের করে আনতে পারিনা। একজীবনে কি আর সব ইচ্ছে পূরণ হয়?

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে