বন্ধুতা…

আসিফ ইকবাল

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আমি মাসুদ সোমেন শাফকাত (শাফকাত আর আমাদের মাঝে নেই। আল্লাহ ওকে বেহেশতের সবচে সুন্দর জায়গায় রাখুন। আমিন) আর কখনো সখোনো পলাশ। আমরা একসঙ্গে পায়ে হেটে স্কুল যেতাম। সোমেন জামাল খান থেকে, শাফকাত মোমিন রোড থেকে, মাসুদ নন্দনকানন ফার্স্ট লেন আর আমি সেকেন্ড লেন এর বাসা থেকে বেরিয়ে একসঙ্গে সেকেন্ড লেনের সিঁড়ি ভেঙে তিন পোলের মাথা হয়ে রেয়াজউদ্দিন বাজারের সরু চৈতন্য গলি ধরে উঠতাম স্টেশন রোডএ। তারপর রেলওয়ে স্টেশনের ওভারব্রিজ পেরিয়ে আইস ফ্যাক্টরি রোড এর ইন্দোনেশিয়ান আইসক্রিম খেয়ে তারপর কলেজিয়েট স্কুল এর পুরোনো ক্লাসরুম আর খোলা মাঠ। কত দাপাদাপি কত মাখামাখি কত মান অভিমান কত ঝগড়া ঝাটি। বাড়ি ফেরার সময় পলাশ আসতো মাঝে মাঝে সঙ্গে। আমরা এক এক দিন এক এক রাস্তা দিয়ে হেটে স্কুল যেতাম। কোনো ক্লান্তি ছিলোনা। পথ চলতে চলতে গল্প আর আড্ডা হতো সীমাহীন। আমাদের স্কুলের এক এক জন স্যারদের এক একটা ছদ্ম নাম ছিল। পরম্পরায় এ নামগুলো আমরাও পেয়ে এসেছি। বোতল, পোয়া মতিন, ভেড়া, শিয়াল, কালা পানি, মাখন আরো কত কি। এ একসঙ্গে স্কুল যাওয়াতে আমরা একজন আরেকজনের কাছে শিখতাম নতুন নতুন কত কিছু। কার বাসায় কি হলো, স্কুলে আমরা কে কি দুষ্টুমি মিস করলাম, স্কুল পালিয়ে শেখ আনিস কোন সিনেমাটা দেখতে গিয়েছিলো, খেলার মাঠে কে কাকে গালি দিয়েছিলো এসব নানা বাহারি গল্প। আমাদের সম্পর্কটাকে বন্ধুতা বললে আসলে ভুল হবে। আমরা ছিলাম ঘরের ছেলে। আমাদের একজনের মা বাবা আরেকজনকে বকতে পারতো, আমরা তাদের পথে দেখলে সালাম আদাব জানতাম, তাঁরা আমাদেরshudhu নয় আমাদের পুরো পরিবারের কুশল জানতে চাইতেন। আমরা মনোযোগ দিয়ে সম্মানের সঙ্গে তাঁদের উপদেশ শুনতাম, কখনো তাচ্ছিল্য করেছি বলে মনে পড়েনা। আমরা যখন একজন আরেকজনের বাসায় যেতাম, আমাদের মা রা যে কি খাতির করতো, কত আদর কত যত্ন। আমাদের দেখে আমাদের ভাই বোনরাও খুব ঈর্ষা করতো। বন্ধুটার ধরনটাই ছিল এমনি।

সোমেন ছিল ক্লাসের ফার্স্ট অথবা সেকেন্ড বয়। মেট্রিক ইন্টারমিডিয়েট দুটোতেই স্ট্যান্ড করা ছেলে। যেনতেন স্ট্যান্ড নয় কুমিল্লা বোর্ডে যথাক্রমে সেকেন্ড আর ফার্স্ট স্ট্যান্ড করা। বই এর পোকা। অন্যরকম মেধাবী। কিন্তু দারুন বন্ধু। পলাশ ছিল হ্যাপি গো লাকি টাইপ। পড়াশুনায় অনেক ভালো কিন্তু একটু chill টাইপ অ্যাটিচুড। ফুর্তিবাজ যাকে বলে। তবে সবকিছুই সাধ্য আর সীমার মধ্যে। ও ছিল সবকিছুতেই উৎসাহদাতা। এ পারফেক্ট টীম-ম্যান।
পলাশ আর আমার গ্রামের বাড়ি এক জায়গায় – সাতকানিয়ার কাঞ্চনায়।

মধুমিতা আমাদের চট্টগ্রাম কলেজের বন্ধু। থাকতো রহমতগঞ্জে। খুব শান্ত শিষ্ট, বাবা মার বাধ্য একটা মেয়ে। আর্টস এ পড়তো। আমি দেওয়ানজী পুকুর পারে অগ্রণী সংঘ নামে একটা ক্লাব এ জড়িত ছিলাম। সেই সুবাদে তাকে প্রায়ই পাড়ায় বা এখানে সেখানে দেখতাম কলেজ যাওয়ার পথে। কিন্তু কোনোদিন কথা পর্যন্ত বলিনি। আমাদের সে সব দিনগুলোতে প্রাইভেট পড়ার সময় বা কলেজে ক্লাস এ যাওয়ার আগে পরে ছাড়া মেয়েদের সঙ্গে কথা বলাটাও কল্পনার বাইরে ছিল যদিও কেউ কেউ লুকিয়ে ছাপিয়ে ফোন নম্বর নিয়ে টি এন্ড টি ফোন এ কথা চালাতোনা এমন গ্যারান্টি কেউই দিতে পারবেনা। মধুমিতার ইন্টারমিডিয়েটের পরেই বিয়ে হয়ে যায়।

আজ তেত্রিশ বছর পর আমরা এ কজন বন্ধু একসঙ্গে হলাম। সোমেন কলকাতার একটা নামকরা পাওয়ার এনার্জি জেনারেটিং কোম্পানির বিশাল বড়ো কর্মকর্তা, পলাশ খুবই ভালো একজন ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবসায়ী, আর মধুমিতা পুরো দস্তুর গৃহিনী হয়ে ছেলেমেয়েগুলোকে মানুষের মতো মানুষ করে ফেলেছে।

মধুমিতা কে যখন বললাম আমি তোমাকে চিনি তোমার বাসা ছিল রহমতগঞ্জ ও পুরো অবাক হয়ে গিয়েছিলো। শুনলাম সোমেনের কৃতিত্বের কাহিনী আর ও তো এমনিতেই আমাদের সবার চেয়ে এগোনো কৃতি ছিল। পলাশ কেন আজ বাংলাদেশ ছেড়ে কলকাতায়। এসব গল্প শুরু করে শেষ না হতেই রাত বেশি হয়ে যাওয়ার কারণে বিদায় নিতে হলো। তাই বাকি গল্পগুলো হয়তো অন্য আরেক সময়ের জন্যে জমা রইলো।

ওদের বিদায় জানানোর পর অনুভব করলাম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ত্ব বদলে যায়না, মলিন কিংবা ধূসর হয়না, শুধু ধুলোমাখা হয়, ধুলো সরিয়ে দিলেই আবার আগের মতোই উজ্জ্বল।

ভালো থাকিস তোরা। তোদের সঙ্গে আবার এই সংস্পর্শ আমাকে উজ্জীবিত করেছে, আনন্দে ভাসিয়েছে।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে