খাটের তলায় অন্য পৃথিবী

ইরাজ আহমেদ

সেই কোন এক শৈশবে খাটের তলায় আশ্চর্য জগৎ ছিলো।কী ছিলো না সেখানে?ছিলো ট্রেজার আইল্যান্ডের রবিন, ছিলো বাড়ির ধূলোপড়া পুরনো সুটকেসের অন্তরাল, ছিলো বৃষ্টির দুপুরে ছবি আঁকা, খাটের ওই রহস্যময় তলাটাকে সমুদ্র ভেবে ডুবুরী হয়ে যাওয়া। খাটের তলায় জ্যান্ত হয়ে উঠতো রবিনহুড, অরণ্যদেব, প্রাণ পেতো ঠাকুরমার ঝুলির নীল কমল আর লাল কমল।সেখানেই পর্দা উঠতো অন্য এক পৃথিবীর।এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে ইন্টারনেট আর টিভি পর্দার ঝলমলে আকর্ষণে হারিয়ে গেছে শৈশবের খাটের তলার সেই অপূর্ব নিভৃতি।

বাসার খাটের তলা আমার বড় আশ্রয় ছিলো দুপুরবেলা। শুনশান শূণ্য বাড়ি, বড়রা ঘুমের আয়োজনে তলিয়ে গেছে, আর ঠিক তখনই আমি ঢুকে পড়তাম দাদুর শোবার ঘরের খাটের নিচে।সেখানে কাপড় দিয়ে ঢাকা একটা কালো ট্রাংক,মাটির খেলনা ভর্তি ঝুড়ি, হাঁড়ি..এসবই ছিলো বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে আমার একান্ত আড়াল। ওইসব সযত্নে রক্ষিত বস্তুগুলোর আড়ালেই সেইসব দুপুরে আমার কাছে ধরা দিতো, রবিনহুড, অরণ্যদেব হয়ে। আসতো লাল কমল আর নীল কমল। গল্পের ভেতর থেকে চরিত্রগুলো আমার কাছে, আমার ভাবনার মতো করে কথা বলতো, আমার অদ্ভুত সব অভিযানে অংশ নিতো।

খাটের তলায় দাদুর সেই কালো ট্রাংকটার ছিল চুম্বক আকর্ষণ। জানতাম দাদুর শাড়ি, বইপত্র আর ছোটখাট প্রাচীন বস্তু যত্নে রাখা ছিলো সেই ট্রাংকে। তালা দেয়া থাকায় সেই ট্রাংকে চালানো আমার অভিযান ব্যর্থ হতো বারবার। বাড়ির অভিবাবকদের হাতে মার খাওয়ার হাত থেকেও বাঁচার জন্য তখন খাটের তলার আড়াল ছিলো আমার কাছে অভয়ারণ্য। সেই অভয়ারণ্যই জায়গা দিয়েছিলো ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। গভীর রাতে কানে তালা লাগানো গোলাগুলির শব্দে জেগে উঠে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম খাটের তলার আশ্রয়ে।বাইরে তখন চলছে তুমুল গোলাগুলি। আর  আমরা কটি প্রাণী সেই গুলি থেকে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছি খাটের তলায়।

খাটের নিচে মৃদু অন্ধকার মাখা জায়গাটায় আমার মনের কল্পনারা জাহাজ ভাসাতো ছেলেবেলায়। সেই জাহাজে থাকতো জলদস্যুর দল। তারা আমার ভাবনার মতো করে কত যে অভিযানে অংশ নিতো তা বলে শেষ করা যাবে না। খাটের তলায় লাগানো কাঠের ফ্রেমটাকে তখন মনে হতো জলদস্যুদের জাহাজের মাস্তুলে ওঠার সিঁড়ি। রঙ পেন্সিল দিয়ে ওই কাঠের কাঠামোতে ছবিও আঁকতাম মনে পড়ে। সেই খাটগুলোও এক সময়ে আমাদের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়েছে। মাঝে মাঝে ভাবি, আবার যদি ফিরে খাটের গায়ে আঁকা আমার ছবিগুলো দেখতে পারতাম!

আমাদের গ্রামের বাড়িতেও আমার একটি প্রিয় খাটের তলার জগৎ ছিলো। আমার বাবার মাতামহী একটি বিশাল ঘরে থাকতেন। সে ঘরে প্রাচীন বার্মা টিকের তৈরী নকশাদার খাটে তিনি শুতেন। তখন বাড়ির কর্ত্রী বড় মায়ের খাটের তলায় ছিলো রাজ্যের জিনিসের গুদামখানা। গুড়, মুড়ি, বিস্কিট থেকে শুরু করে আম, কাঁঠাল সবই জমা হতো সেই খাটের তলায়। আমাদের বৃহত্তর পরিবার অর্থাৎ বাবার মাতৃকূলের ভাইবোনদের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হতো।সেইসময় বড় মা‘র সেই নকশাদার খাটের তলাই হতো আমাদের বড় আশ্রয়।আম খাওয়া, বিস্কুট চুরি করা, গুড় নিয়ে পালিয়ে যাওয়া এসব ছেলেমানুষী কান্ডে ভরা থাকতো সেই সময়টা। মনে আছে, ওই খাটের তলায় বড় একটি ট্রাংকে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম রবার্ট লুইস স্টিভেনশনের ‘ব্ল্যাক অ্যারো’ উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ। তখনও ব্ল্যাক আরো‘র পড়ে বোঝার বয়স হয়নি। পরে আরেকটু বড় হয়ে বাড়ি গিয়ে পড়েছিলাম বইটি।আমাদের গ্রামের বাড়ির ঘরগুলোর মেঝে ছিলো মাটির। খাটের তলায় ঢুকে নানা অ্যাডভেঞ্চার করার সময় বৃষ্টি নামলে মাটিফুঁড়ে ছোট ছোট পোকাদের ঘরের ভেতরে অনুপ্রবেশ দেখতাম শুয়ে শুয়ে। সেই মাটির ঘ্রাণ আজো আমার নাকে লেগে আছে মনে হয়।

বড় হয়ে খাটের তলায় আমার এক অন্য গোপন জগত তৈরী হয়েছিলো। ছাত্র বয়সে একটা সুটকেসের মালিক হয়েছিলাম। সেটার আবার তালাও ছিলো। সেই সুটকেসে যে বিশেষ কোনো গুপ্তধন রক্ষিত ছিলো এমন নয়। কিন্তু তবুও খাটের তলার গোপন নিভৃতিতে রক্ষিত থাকতো আমার সেই সুটকেস আর গোপনীয়তা।

খাটের তলার এই নিভৃতি প্রথম উড়িয়ে দিলো বক্স খাটের প্রচলন। খাটের সঙ্গে লাগোয়া ড্রয়ারের কৌশলের সামনে বিদায় নিলো খাটের তলা। তারপর এলো রঙীন টেলিভিশন আর ক্রমে ইন্টারনেট।আমার মনে হলো খাটের তলার সেই স্বপ্নের জগত হারিয়ে গেলো। এখন বাটন পুশ করলেই কত কত অজানা পৃথিবীর গল্প আর ছবি। খাটের তলায় শুয়ে কষ্ট করে কে আর একলা দুপুরে পাল তুলবে কল্পনার জাহাজে?

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ গুগল