বসন্তবৃষ্টি বড় নিত্য এখানে

স্মৃতি সাহা

অসময়ের শ্রাবণ ধারায় সদ্য আলো ছড়ানো কৃষ্ণচূড়া অবিরত ভিজে যে মায়া ছড়ায় তাতে চোখ ভেজানো হয় না অনেকদিন বা বৃষ্টির তুমুল ছটায় বারান্দার টবে রাখা বেলির তিরতির কেঁপে যাওয়া, কতদিন ছুঁয়ে দেখিনি! পাশের বাড়ির ছাদে যখন বৃষ্টি নুপুরের নিক্কণ সুর তোলে তখন চোখের কার্ণিশে সেই ছবি ধরে রাখাও হয় না আজ অনেকদিন। আর এই “না” গুলো যখন মনের ভিতর ঘুণপোকা হয়ে কুটুর কুটুর আওয়াজ তোলে তখন সত্যিই চারপাশটা বড্ড ধূসর হয়ে আসে। কিন্তু জীবন তো! একমুখী গতির জীবনে আমি থমকে গেলে সময় এগিয়ে যাবে আমাকে পিছনে রেখে! আর ঠিক একারণেই আমাদের চলতে হয় সময়ের লয়ে লয় মিলিয়ে। আমার এখানে মধ্যবসন্ত; কিছুদিন আগের ন্যাড়া গাছগুলোতে নানারঙের খেলা জানিয়ে দেয় সঠিক সময়ের অপেক্ষা আমাদেরকে নিরাশ করে না কখনো। সেদিন আমার সকাল হয়েছিল জানালার গ্লাসে বৃষ্টির স্কেচ দিয়েই। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি কখনো রুমঝুম শব্দে ঝরলেও সে সুর আমা অব্দি আসার আগেই ফিরে যাচ্ছিল বন্ধ জানালার ওপার থেকে। বসন্তবৃষ্টি, এ বড় নিত্য এখানে। এই বৃষ্টি ছোঁয়াতেই গাছে গাছে প্রাণের সঞ্চার হয় যে! সেই বৃষ্টিদিনে আমার জন্য অপেক্ষায় ছিল এক গোলাপি পরী ; যার নাম উইপিং চেরি।এবছর প্রথম বারের মতো আমি এই উর্বশীর দেখা পেলাম! অনান্য চেরি গাছে ফুল ঝরে এখন সবুজ পাতার জয়গান চলছে। তবে উইপিং চেরি তে ফুল আসছে সবে। গাছের ফুলগুলো অশ্রুজলের মতো নিম্নমুখী বলেই কি এর নাম উইপিং চেরি!? হবে হয়তো! উইপিং চেরি ফুলগুলোর রঙ সবার আগে মন কাড়ে; ঠিক যেন এক একটি গোলাপি মুক্তো। যাদের গোলাপি আভায় বৃষ্টির ধুসরবেলাও কেমন রঙীন হয়ে ওঠে! নিউইয়র্ক এখন পুস্পবিভোর। আর প্রকৃতি তার সাথে রচে চলেছে পান্না সবুজের কাব্য। যে সবুজে চোখ মেললে হারিয়ে যায় ক্লান্তি, সে সবুজ ঝিরঝির বাতাসে তিরতির করে কেঁপে অনবরত গেয়ে যায় জীবনের জয়গান। ধূসর আকাশ বা জলভরা মেঘের আকাশ এখন অন্য কোন আসর জমিয়েছে বুঝি! তাই তো আমার শহরের আকাশ যেন নীলার রঙ চুরি করে হয়ে উঠেছে নীলাভ। মেঘের আঁচরবিহীন এমন গাঢ় নীলাকাশ স্নিগ্ধতায় অনবরত ভরিয়ে দেয় জীবন। আর সেই নীলের পটে যদি কেউ রঙতুলি দিয়ে এমন ছবি এঁকে দেয় যেখানে থাকে নীল,গোলাপি আর অল্প সবুজের মেলবন্ধন; তা অবধারিত ভাবে হয়ে ওঠে একটা মাস্টারপিস! নীল আকাশের পটে যাদের স্নিগ্ধ আলাপন চলছে তাদের নাম “পিংক ডগউড”। অল্পকিছু সবুজ পাতাকে আড়াল করে সারা গাছজুড়েই চলছে এদের রাজত্ব। বৃক্ষরাজি না জানি কোন যাদুর পরশে হয়ে ওঠে ফুলেশ্বরী! এসব অনিন্দিতা ফুলেশ্বরীরা হাওয়াই দুলে, বৃষ্টিমেখে যেন পৃথিবীর সব ঐশ্বর্য এনে হাজির করছে আমার আঙিনায়। এতটুকু আবাস আমার, এত ঐশ্বর্যে আকুল হই আমি।আপ্লুত হয়ে প্রাণভরে দু’চোখের কোলে মেখে নেই এদের রঙ, হাওয়ায় গা এলিয়ে মেখে নেই এদের মৃদূ মিষ্টি সুবাস, চুলের পাটে গুঁজে একথোকা পরশ; আমি হয়ে উঠি রাজেশ্বরী! রঙের আলোয় ধরণী আলোকময় করছে যে অপ্সরীরা তাদের নাম ক্রাবআপেল ফুল।তবে আমি ডাকি রুবি ফুল; রুবির মতো রঙ যে তাদের! খুব অল্পদিনের জন্য রঙের ডালি নিয়ে হাজির হয় এই ফুলগুলো। সাধারণত এখানকার অধিকাংশ ফুল শুধু রূপের আলো ছড়ায়, সুবাসিত করে না বাতাস। তবে এই উর্বশীরা মিষ্টি মৃদূ সুবাসে চলার পথ মোহনীয় করে রাখে। এপ্রিলের একদম শেষে আভরণহীন এই আপেল গাছগুলি অল্প পাতা আর ফুলকলিতে হেসে ওঠে। আর মে মাসের শুরুতেই গাছগুলোতে গাঢ় গোলাপী আর লাল রঙের বাহারী আলাপনে মুখরিত হয়ে ওঠে। প্রকৃতির এই ঐশ্বর্য দেখেই বুঝি কবিগুরু লিখেছিলেন, “ অলক্ষ্য রঙ লাগলো আমার অকারণের সুখে” আমাদের চারপাশে প্রকৃতির উজাড় করা এইসব রঙ বিধাতার দান, সেই রঙ জীবনে জড়িয়ে জীবনকে মহিমান্বিত করার ইঙ্গিত যেন অনবরত দিয়ে যায় সেই আভাসের আড়ালে থাকা ইচ্ছাময়ী!!

ছবি: গুগল