জীবন এখানে যেমন. ..

শিলা চৌধুরী

(কালিংপঙ থেকে): প্রথম যখন ওকে দেখি , পাথর ভাঙছে প্রতিবেশীর ।জানতে চেয়েছিলাম কি হিসেবে কাজ করছে ? দিন চুক্তি হিসেবে, চারশ টাকা রোজ । পরদিন দেখি আরেক জনের বাড়িতে কুড়াল দিয়ে

লীলা

শুকনো কাঠ চিড়ছে।তার জন্যে পঞ্চাশ টাকা পাবে। বাড়িতে তিনজন সদস্য ওকে নিয়ে । অতি বৃদ্ধ বাবা-মা ।দু’জনেই চলন শক্তি হীন শয্যাশায়ী ।লীলার বয়স জানতে চাইলাম , বল্লো সাতাশ , নেপালি । সারাদিন পুরো পাড়া ঘুরে ফিরে, কার বাড়িতে কি কাজ রয়েছে তা খুঁজতে ।যার যা কাজ থাকে সবই করে দেয়, বিনিময়ে যাই দেয় তা নিয়েই ঘরে ফিরে । সঙ্গে ঘরের কাজ, বাবা মায়ের যত্ন ..। কদিন আগে পাশাওং ক্যালিম্পং যাচ্ছে, ওকে ডেকে দেখলাম এটিএম কার্ড আর পাসওয়ার্ড দিয়ে দিল টাকা তুলে আনার জন্যে । চার পাঁচ দিন আগে ওর ঘরে গেলাম ,রান্না করছে. ..পাথরের গায়ে জন্মানো শাক আলু দিয়ে । কিছুই নেই রান্না করার আর। প্রায়ই আসে আমার কাছে গল্প করতে কাজের ফাঁকে । দু’দিন ধরে আসছে না দেখে সেদিন সন্ধ্যে নাগাদ বৃষ্টি হচ্ছিলো তবুও গেলাম দেখতে..। চুপচাপ বসে, অথচ সারাক্ষণ ছুটে বেড়ায় আর আমার মতোই বকবক করে যায় যাকে পায় তার সঙ্গেই ।

বল্লো বাবার খুব অবস্থা খারাপ ।একা একটা মেয়ে দু’জন অসুস্থ মানুষকে ….। রইলাম তার সঙ্গে । রাতে একটা কথাই বল্লো …বাবা আমি স্কুল থেকে না ফেরা পর্যন্ত খেতো না কোনদিনই, বৃষ্টি হলে ছাতা নিয়ে স্কুলের সামনে বসে থাকতো…আর আজ বাবা কোন সাড়া দিচ্ছে না । দুপুরের পর দৌড়ে এলো, ,দিদি তোমার কাছে খাবার স্যালাইন রয়েছে ..! দু’টো ছিলো. ..দিয়ে দিলাম. ..। মনটা খচখচ করে উঠলো , গেলাম পিছু পিছু ..। অল্প একটু স্যালাইন বানি

আনিসা ভুজেল লীলা

য়ে দু’চামচ মুখে দিল,খেলো….তৃতীয় বার আর …. লীলার বাবা চলে গেলেন. ..। অস্হির আর অসহায় অনুভূতি হচ্ছিলো. … চুপচাপ চলে এলাম. ..কারণ কাউকে সান্ত্বনা দেবার যোগ্যতা আমার কোন কালেই নেই..।অথচ এখনো বারান্দা থেকে দেখতে পাচ্ছি লীলা গাঁয়ের সব মানুষকে সামলাতে ব্যস্ত । কাল শেষকৃত্য হবে. ..। লীলা যেমনি সবার সব কাজ করে দেয় হাসি মুখে তাই গাঁয়ের সব মানুষ ভালো ও বাসে তাকে সৎ আর পরিশ্রমী বলেই না শুধু একলা একটা মেয়ে নিজের সুখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে সংসার না শুধু অথর্ব বাবা মাকে যত্নে লালন করছে বলেও । গাঁয়ের সব মানুষ রাত জেগে বসে আছে লীলার বাড়িতে – লীলার পাশে ।কেউ একজন বলছিলেন একটা বোঝা কমলো লীলার. ..।নিজের বাবা মা না তবু ও এতো কিছু করছে. …. শান্ত স্বরে লীলা শুধু উত্তর দিলো – কিন্তু আমার বাবা তো চলে গেলো ,আমি তো কোনদিনই বোঝা ভাবিনি..! আমার বাবা মা নন তো কি হয়েছে ।আমাকে কি কম ভালোবাসতেন।নিজের পেটের সন্তান হলেই কি বেশি ভালবাসা পাওয়া যায় । আনিসা ভুজেল ওরফে লীলা ওনাদের দত্তক নেওয়া কন্যা ।লীলার মা লীলাকে জন্ম দেবার সময়েই মারা যান ।আর তখন থেকেই লীলা ওদের চোখের মনি হয়ে যায়. …… স্যালুট আনিসা ভুজেল লীলা…..

ছবি: লেখক