জীবনের প্রথম চিঠি লিখে পোস্ট করলাম

জয়দীপ রায়

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

চিঠি পোস্ট করলাম। বহুদিন পর। ইন্ডিয়ান পোস্টে। এখন তো অনেকরকম পোস্টাপিস্। সারাহা, স্টালিশ্ আরও সব বিচিত্র নামের ডাকহরকরা। সব বেনামী চিঠি পাস করে। বেনামী চিঠি মানে টু আছে, ফ্রম নেই। ইতির পরে বাদবাকী অন্ধকার হাতড়ানো। বেনামী চিঠি পাবার নিশ্চয়ই একটা আলাদা মজা আছে।

বেনামী চিঠি দেবারও মজা আছে। বেনামী চিঠি যদি একবার বিয়ারিং করে পোস্ট করা যায়, তাহলে তো শিওরশট্। বিয়ারিং মানে টিকিট না লাগিয়ে, এদিক ওদিক দেখে ডাকবাক্সে ছেড়ে আসা গোপন এনভেলপ্। ও পোস্টম্যান ঠিক অবাক প্রাপকের কানমুলে পোস্টেজ আদায় করে নেবে। জরিমানাসহ। তোমার নাম ঠিকানা কিভাবে জেনে যায় কোনও ঠগবাজ প্রেরক? তুমিও এবার থেকে ছদ্মনাম আর ভুল ঠিকানা বলে দেবে চোখ বন্ধ করে। পাঠাক যত ইচ্ছে ভুল নাম ঠিকানার বিয়ারিং বেনামী চিঠি।

চিঠি পোস্ট করলাম। শেষবার করেছিলাম দার্জিলিং জিপিওর সামনের টকটকে লাল রঙের বাক্সে। দাস স্টুডিও থেকে কেনা পিকচার পোস্টকার্ডগুলো আমি আর মাম্মা ঠিক করলাম দার্জিলিং থেকেই পোস্ট করবো প্রিয় কিছু ঠিকানায়। সেইমত ডাকটিকিট চাইলাম নেপালী ডাককর্মীর কাছে। হিমালয়ান বার্ডসের নানান স্পিসিসের ছবি দেওয়া এত পাতাভর্তি ডাকটিকিট দিল আমাদের। আমি আর মাম্মা একটা পাখি তুলে নিয়ে বাতাসিয়া লুপের টয়ট্রেনের গায়ে লাগিয়ে দিয়ে বললাম, নিয়ে যা তপাদিদির কাছে। এইভাবে এক এক করে সিংগমারীর রোপওয়ে, দলবলসহ কাঞ্চনজঙ্ঘা, জলাপাহাড়ের মাথার সেন্ট পলস্ স্কুল সব আমরা পাখির ঠোঁটে ঝুলিয়ে দিয়ে ভাসিয়ে দিই দক্ষিণবঙ্গের কিছু লেটারবক্সের সন্ধানে।

ছ’বছর হয়ে গেল আমরা অপেক্ষা করে আছি, প্রিয় ঠিকানা থেকে প্রিয় কোনও কন্ঠস্বর ফোন করে বলবে, আহ্, পেয়েছি। কি ঠান্ডা মেঘেভেজা দার্জিলিংয়ের ছবি! কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও পোস্টম্যান আমাদের সেই পাখি ওড়া পোস্টকার্ডগুলো কোথাও ডেলিভারি দেয়নি। ছ’বছর হয়ে গেল। মাম্মা এতদিনে বারো বছরের হয়ে গেল।

মাম্মার এখন চিঠি লেখার স্বভাব হয়েছে। একজন মানুষকেই লেখে। রাস্কিন বন্ড। ল্যান্ডোর ক্যান্টনমেন্টে রাস্কিন বন্ডের বাড়ি
বা মুসৌরীর ম্যল রোডে কেমব্রীজ বুক স্টোরে চিঠি পাঠায় মিষ্টিদাদুর নামে। উত্তর আসে না। তবু পাঠিয়ে যায়। কোণারকের যাত্রীনিবাসের ঘরে ঘুম থেকে উঠেই বললো, বাবা, রাস্কিন বন্ডকে একটা চিঠি পাঠাবো কোণারকের পোস্ট অফিস থেকে? আমি দেখেছি পোস্ট অফিসটা। রাস্তার ধারেই পড়ে। বলে খাতা পেন নিয়ে বসলো। লেখা হয়ে গেলে আমরা বেরোলাম পোস্ট অফিসের উদ্দেশ্যে। রাস্কিন বন্ডকে লেখা বনগাঁর এক কিশোরীর চিঠি স্পীড পোস্টে জমা পড়লো কোণারকের ডাকঘরে।

আমারও খুব লোভ হলো চিঠি লেখার। একটা ইনল্যান্ড কিনলাম। যেসব ঠিকানাগুলোতে একসময় নিয়মিত লিখতাম, মানে যে ঠিকানাগুলো মনে আছে, তার একজন প্রাপক এবং প্রযত্নে দীর্ঘদিন আগেই মারা গেছেন। আর এক ভালোবাসার ঠিকানা বাড়িবদল করেছে। মেশোমশাইয়ের কথা মনে পড়লো। একসময় দুর্গাপুরে মাসির বাড়ি নিয়মিত চিঠি লিখতাম। তোড়াকে। পিনকোডসহ ঠিকানাটা এখনও হুবহু মনে আছে।

লিখে ফেললাম মেশোমশাইকে প্রথম চিঠি। রণজিৎ রায়কে একা সেই মুচিপাড়ার ঠিকানায় রেখে বাদবাকি সবাই কবেই চলে গেছে। আমারও যে আর কোনও ঠিকানা মুখস্ত নেই। তাই মেশোমশাই রণজিৎ রায়কেই লিখে ফেললাম ইনল্যান্ডজুড়ে ভালবাসা কৃতজ্ঞতা আর প্রণামের কথা।

বাইশ বছর আগে যার হাত ধরে প্রথম কোণারকে এসেছিলাম, তাকেই জীবনের প্রথম চিঠি লিখে পোস্ট করলাম, কোণারক থেকেই।

ছবি: লেখক