যখন মানুষ নেই পৃথিবীতে…

ধরা যাক মানুষ নেই পৃথিবীতে। এই পৃথিবী থেকে রহস্যময় কারণে একদিনে উধাও মনুষ্য প্রজাতি। ঘর থেকে রাস্তা, রাস্তা থেকে অফিস, অফিস থেকে পার্ক, রেলস্টেশন, ক্যাফে, শপিং মল গবেষণাগার, পানশালা, লেখার টেবিল, নিরাপদ বিছানা-কোথাও নেই আর মানুষের ছায়া। তাহলে কেমন হবে সেই পৃথিবীর চেহারা? দালনানকোঠা, মাঠ, পথ সব অবিকল রয়ে গেছে কিন্তু শুধু মানুষ নেই!

ডারউইনের বিবর্তনবাদ বলে, কালের বিবর্তনে জীবের যেমন উদ্ভব ঘটেছে তেমনি তার বিনাশও ঘটবে। মানুষের এভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে গণ-বিলুপ্তি। গণ-বিলুপ্তি পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটেছিল ৫ বার। শেষবার ঘটেছিল এখন থেকে ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে। বিশাল উল্কাপতন অথবা জলবায়ুগত বিপর্যয়ে পৃথিবীর প্রায় ৭৫ ভাগ মানুষ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো।

পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা এমন এক ভবিষ্যত নিয়েও মাথা ঘামিয়েছেন। অঙ্ক কষে, বুদ্ধি খাটিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন মনুষ্যহীন সেই পৃথিবীর চেহারা।

মানবশূণ্য হয়ে যাবার কয়েক ঘন্টা পর থেকেই পৃথিবীতে জ্বলে থাকা আলো নিভতে শুরু করবে। কারণ বিদ্যূত শক্তি উৎপাদক স্টেশনগুলোকে সচল রাখার জন্য কেউ থাকবে না। ফলে পৃথিবীতে অন্ধকার নেমে আসতে শুরু করবে।

কয়েকদিনের মধ্যে পৃথিবীতে পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোকে ঠান্ডা রাখার জন্য ব্যবহৃত পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে।

পৃথিবীর মাটির তলায় রেলস্টেশনগুলো জলমগ্ন হবে।

মানুষের অস্তিত্বের পরিচায়ক হিসেবে থাকবে পাথরের তৈরী কিছু কাঠামো, পিরামিড আর চীনের মহাপ্রাচীর।

এই সংখ্যা প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো মানবশূণ্য পৃথিবীর কাল্পনিক অবয়ব।

পৃথিবীর বয়স মোটামুটি ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি বছর।পৃথিবী তৈরি হওয়ার সময় এটা ছিল গ্যাসিয় গোলক। তারপর পৃথিবী তাপমাত্রা হারিয়ে ঠাণ্ডা হতে শুরু করে। তারপর একসময় পরিণত হয় কঠিন  গোলকে। সেই কঠিন পদার্থগুলোকেই বলা হয় শীলা পাথর।

সেই পৃথিবীতে কালের বিবর্তনে একদা প্রাণের উদ্ভব ঘটে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীদের মধ্যে মানুষ সবচাইতে বুদ্ধিমান হলেও তাদের উদ্ভব ঘটেছে সবার শেষে। মানুষের জন্মের আগে হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণীরা দাপিয়ে বেড়িয়েছে এই পৃথিবী। তাদের অনেকেই অবশ্য হারিয়েও গেছে। সেই হারিয়ে যাওয়া প্রাণীদের মাঝে অন্যতম ডাইনোসর। তারাও এ পৃথিবীতে এসেছিল কোটি কোটি বছর আগে। প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে তারা বিলুপ্তও হয়ে গেছে পৃথিবী থেকে। মাছ, বানর, শিম্পাঞ্জিদের জন্মও হয়েছে মানুষের আগে। মানুষের জন্ম হয় মাত্র ৭০ লক্ষ বছর আগে। আর সে সময়ের মানুষ দেখতেও আমাদের মতো ছিল না। তারা এখনকার মানুষের মতো সোজা হয়ে হাঁটাচলাও করতে পারতো না। বলতে পারতো না কথা। সেই প্রাচীন মানবগোষ্ঠীই এক সময়ে আগুন জ্বালাতে শিখলো, আকার-ইঙ্গিতের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতে শুরু করলো। তারপর এক সময় কথা বলাও শিখে ফেলল। আর সেই তখন থেকেই হিংস্র পশুদের হাত থেকে বাঁচার জন্য দলবদ্ধভাবে থাকতে শুরু করল মানুষ। হলো গোষ্ঠীবদ্ধ। তৈরী করলো সমাজ, সভ্যতা।

প্রথম মানবসমাজের উদ্ভব হয়েছিল আফ্রিকা মহাদেশে, প্রায় ২ লক্ষ বছর আগে। এখন বিজ্ঞানীরা ভাবছেন সেই মানুষই যদি পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে যায় তাহলে পৃথিবীর অবয়ব কেমন হবে?

প্রথমে বলেছিলাম মানুষ উধাও হয়ে গেলে পৃথিবীর আলো নিভতে শুরু করবে মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে। সেইসঙ্গে আরেকটি বড় বিপদ হয়ে দেখা দেবে পৃথিবীর পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো। সেসব কেন্দ্র শীতল রাখার পানি বাষ্প হয়ে গেলে পারমাণবিক বিপর্যয় ঘটবে পৃথিবীতে। এরকম ঘটনা ঘটবে পৃথিবী মানুষ শূন্য হবার এক মাসের মধ্যে। কেউ বলতে পারেন পৃথিবীতে তখন সোলার প্যানেলগুলোর মাধ্যমে আলো জ্বলবে। বিজ্ঞানীরা সে গুড়েও বালি ঢেলেছেন। তারা বলছেন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্যানেলগুলো ঢেকে যাবে ধূলার আস্তরণে। ফলে সেগুলো আর কাজ করবে না। একমাত্র হাইড্রোইলেকট্রেক কেন্দ্রগুলো তখনও সচল থাকবে।

পৃথিবী থেকে মানুষ হাওয়া হয়ে গেলে বড় ধরণের বিপদ নেমে আসবে পোষা প্রাণীদের জীবনে। বিজ্ঞানীরা ভেবে দেখেছেন, প্রথম দশ দিনের মধ্যে বাড়ির পোষা  কুকুরগুলো ঘরে আটকা পড়ে খাবারের অভাবে মারা পড়বে। আর যারা পালাতে পারবে তারা কিছুদিন বেঁচে থাকলেও কিছুদিন পরেই পরিণত হবে তাদের চাইতে শক্তিশালী প্রজাতির কুকুরদের। মানুষের অভাবে গবাদী পশুর খামারে মারা যাবে গরু। যত্নের অভাবে খামারে মারা যাবে প্রচুর মুরগি।

বিজ্ঞানীদের আগাম চিন্তা জানাচ্ছে, মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার এক বছরের মাথায় মহাকাশে যতগুলো স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ প্রেরণ করা হয়েছিলো সেগুলো খসে পড়তে শুরু করবে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে। আর পঁচিশ বছর পর পৃথিবীর শহরগুলোর অবস্থা কেমন হবে? তিন চতুর্থাংশ শহরের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ির দখল নেবে বুনো আগাছা আর লতাপাতা। দুবাই অথবা লাস ভেগাসেরর মতো শহর চাপা পড়ে যাবে বালির নিচে। তবে এতো বিপর্যয়ের পরেও বিজ্ঞানীরা একটা শুভ সংবাদ জানিয়েছেন যে, সেই সময়ে পৃথিবীর বাতাসে দূষণের মাত্রা প্রায় শূণ্যে নেমে আসবে।

আগাছার আগ্রাসন তখন শূণ্য পৃথিবীতে ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। ঘরবাড়ির দেয়াল থেকে শুরু করে ছাদ ঢেকে যাবে সবুজ লতাগুল্মে। উদ্ভিদ জগতের অবাধ বংশবিস্তারে পৃথিবীকে দেখাবে আরো সবুজ। বাড়িঘরে মানুষের বদলে বাসা বাঁধবে পোকামাকড় আর ইঁদুরের দল। তবে মানব সভ্যতার বড় শত্রু তেলাপোকা কিন্তু পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে লোপাট হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে। কারণ পৃথিবীর মানুষের তৈরী কৃত্রিম তাপমাত্রায় তারা এতোদিন বেঁচে ছিলো। সেই তাপ তৈরীর উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়াতে তাদেরও বংশবৃদ্ধিতে যতি পড়বে।

মানুষ একদা যেসব জঙ্গল কেটে উজার করে দিয়েছিলো সেইসব জঙ্গলের সীমানা ক্রমশ বেড়ে এগিয়ে আসবে নগরের দিকে।এই উদ্ভিদ জগতের তলায় চাপা পড়ে তখন পৃথিবীর বড় বড় ভবনগুলো আস্তে আস্তে ভেঙ্গে পড়তে শুরু করবে। অন্তিম নিঃশ্বাস ফেলে বন্ধ হয়ে যাবে সব ঘড়ি। কাজ করবে না কোনো ব্যাটারি আর। ২৫ বছরের মধ্যে মানুষহীন পৃথিবীর ৭৫ শতাংশ নগর বনজঙ্গলে ঢেকে যাবে। বিশাল বিশাল ব্রীজ ভেঙ্গে পড়বে, ভেঙ্গে পড়বে আমাদের চিরচেনা প্যারিসের আইফেল টাওয়ার।

মানুষ হারিয়ে যাবার পঁচিশ বছরের মধ্যে পৃথিবীর নিচু অংশে অবস্থিত দেশগুলো চলে যাবে পানির তলায়। লন্ডন শহর পরিণত হবে বিশাল এক নদীতে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন পৃথিবীতে তখন টিনের পাত্রে রাখা খাবার হয়তো কিছুটা হলেও খাওয়ার যোগ্য থাকবে। কারণ সেগুলো পড়ে থাকবে গভীর কাদার তলায়। তিন‘শ বছরের মাথায় পৃথিবীতে বড় ধরণের কোনো ইমারতের অস্তিত্ব থাকবে না।তবে বড় বড় বাড়িঘর সব ভেঙ্গে পড়লেও প্রকৃতির ক্ষেত্রে কিন্তু তেমনটা ঘটবে না। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, তখন সমুদ্র যেমন ধীরে ধীরে তার সীমানার বিস্তার ঘটাবে তেমনি গভীর সমুদ্রের প্রাণী তিমি মাছের প্রজাতি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। কারণ তাদের শিকার করার জন্য আর মানুষ থাকবে না।

মানুষ আচমকা পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে যাবার বিষয়টা বিজ্ঞানীদের অতি ভাবনা বলে কেউ উড়িয়েও দিতে পারেন। কিন্তু এ ধরণের দৃষ্টান্ত কিন্তু পৃথিবীতে আছে। উদাহরণ খুঁজতে খুব বেশী দূরে যেতে হয় না। গণ-বিলুপ্তি বিংশ শতাব্দীর গোড়াতেই ঘটেছিলো। ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ নামে এক ভাইরাসে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলো। যার মধ্যে ৫ থেকে ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটেছিলো। আবার প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ঘটনার কথা তো আমরা সবাই জানি। এই দুটি যুদ্ধেও বিশাল সংখ্যায় মানুষের মৃত্যু ঘটেছিলো। তাই ভবিষ্যতের পৃথিবীতে এমনি কোনো ঘটনা সমগ্র জনসংখ্যাকে উধাও করে দেবে না এমন কথা জোর দিয়ে বলতে পারছেন না বিজ্ঞানীরা।

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে— এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয়— হয়তো বা শাঁখচিল শালিকের বেশে

জীবনানন্দের কবিতায় শেষ হয়ে গিয়েও আবার এই পৃথিবীতে ফিরে আসার স্বপ্নের কথাই ধ্বণিত হয়েছে। কিন্তু মানুষের পদপাত ছাড়া এক পৃথিবীর কথা কল্পনায় হিসেব কষেই দেখিয়ে দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীতে মানুষ ফুরিয়ে গেলে সেই চিরচেনা পৃথিবীর বদলে যাওয়ার রূপরেখাও তারা বলে দিচ্ছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মানুষ ছাড়া সেই পৃথিবী কিন্তু আপন নিয়মেই বিকশিত হবে। হয়তো সে পৃথিবীর এখনকার ঝলমলে অবয়ব থাকবে না। পৃথিবী চলবে মানুষ ছাড়াই। কিন্তু মানুষকে বেঁচে থাকবে পৃথিবী ছাড়া?

ইয়াসমিন আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক, দি গার্ডিয়ান।
ছবিঃ গুগল