স্ট্রিট ফাইটিং ইয়ার্স…

সময়টা ১৯৬৮ সালের মে মাস। জন লেনন লন্ডন শহরের অ্যাবি স্ট্রিটের এক স্টুডিওতে বসে একটা গান বাঁধলেন। গানের প্রথম লাইন ‘রেভোলিউশন’। পৃথিবীজুড়ে সময়টা তখন উত্তাল, উদ্বিগ্ন। তখনই, ঠিক তখনই, প্যারিস শহরের দেয়ালে লাল রঙের পোঁচ টেনে বিদ্রোহী তরুণরা লিখে দিলো, ‘যে সমাজ তোমার সব রোমাঞ্চ শেষ করেছে, শেষ করো সেই সমাজকে-সেই-ই তোমার শেষতম রোমাঞ্চ’। ইউরোপের মাটিতে তখন জেগে উঠছিলো দুঃসাহসী স্পর্ধিত তারুণ্যের বিদ্রোহ, প্যারিস শহরে মিছিলে নেমে এসেছিলো ৩০ হাজারেরও বেশী তরুণ।ট্যাংকের নলে তারা এঁকে দিয়েছিলো সাহসের চুম্বনচিহ্ন, উদ্যত বেওনেটের মাথায় বেঁধে দিয়েছিলো ফুল। তখনকার ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিস দ্য গল সরকারের পতনের দাবি ছিলো তাদের কন্ঠে।এই বিদ্রোহ তারও কয়েকমাস আগে ছড়িয়ে পড়েছিলো লন্ডন শহরে।পথে পথে তখন লড়াই, পথে পথে ব্যারিকেড।তরুণরা লড়ছে পৃথিবীর দেশে দেশে। মুক্তিকামী মানুষের স্বপ্ন তাদের চোখে।ঠিক তখনই, ভিয়েতনামে আগ্রাসী মার্কিন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জনযোদ্ধারা শুরু করেছিলো তাদের ইতিহাসখ্যাত অভিযান ‘টেট অফেনসিভ’। আর এসব অগ্নিস্পর্শ করা ঘটনা ঘটার ঠিক এক বছর আগে এই মে মাসের ২৫ তারিখে ভারতের আকাশ কাঁপিয়ে শোনা গিয়েছিলো সেই শ্লোগান-নকশাল বাড়ি লাল সেলাম।

ষাটের দশকের মধ্যভাগ। যেন ধ্বংসের ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো পৃথিবীর আকাশে ডানা মেলে ভেসেছিলো মানুষের মুক্তির স্বপ্ন। পৃথিবীর ইতিহাসে সেই জাগরণের কাল অতিক্রম করছে পঞ্চাশ বছর।

লন্ডন শহরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা এই মে মাসেই পথে নেমেছিলো ভিয়েতনামে যদ্ধের নামে ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধের দাবিতে। তারা সমর্থন জানিয়েছিলো ভিয়েতনামের মুক্তিকামী মানুষকে।গোটা পৃথিবী এবং খোদ আমেরিকায় সাধারণ মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিরোধীতা করেছিলো সেই অন্যায় যুদ্ধের, গণহত্যার।শুধু অক্সফোর্ড নয় মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সে সময় পথে নেমেছিলো ইংল্যান্ডের হাজার হাজার তরুণ। লন্ডনের ট্রাফেলগার স্কোয়ারে জমা হয়েছিলো প্রায় ২৫ হাজার তরুণ মুষ্টিবদ্ধ হাতে। তাদের সেই প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে দিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো সরকারী বাহিনী। সূচনা করেছিলো এক প্রতিরোধ যুদ্ধের। পশ্চিমা রক গায়ক মিক জ্যাগার তাদের নিয়ে গান লিখেছিলেন, ‘স্ট্রিট ফাইটিং মেন’। ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অসাম্য আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে লন্ডনে তরুণদের এই প্রতিরোধ যুদ্ধ যেন আগুনের ফুলকির মতো সেদিন ছড়িয়ে পড়েছিলো ইউরোপ্। সেই ফুলকি অগ্নিকান্ড তৈরী করলো ফ্রান্সের মাটিতে।

বাংলা ভাষায় বিদ্রোহের কবি সুকান্ত ভট্টাচারয কবিতায় লিখেছিলেন,

আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ

স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি।

পৃথিবীজুড়ে সেই অগ্নিকালে তরুণরা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলো গভীর স্পর্ধায়। প্যারিস শহরে ১৯৬৮ সালের ১০ মে ৩০ হাজার তরুণ রাস্তায় জড়ো হয়ে অচল করে দিয়েছিলো গোটা শহর। সম্পদের সুষম বন্টনের অধিকার, শিক্ষার অধিকারের দাবিতে তারা দাবি তুলেছিলো সরকার পতনের। তাদের সঙ্গে সঙ্গে পথে নেমেছিলো প্যারিসের মজদুর ইউনিয়নগুলো। ফ্রান্স অচল হয়ে গিয়েছিলো  ধর্মঘটে।আর ঠিক সেই সময়ে ভারতের বুকে নেমে আসা ‘থান্ডার স্টর্ম অফ স্প্রিং’ দার্জিলিংয়ের পাহাড় থেকে বন্যার গতিতে নেমে এসে তার এক বছর পূর্ণ করলো। মাও সে তুঙ-এর লালবই হাতে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত সেইসব তরুণরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে ভয় পায়নি সেদিন। কারণ তারা জানতো ‘‘মোষের শিং-এ মৃত্যু বাঁধা’’। চারু মজুমদার নামে মানুষটি ভারতে সূচনা করেছিলেন আরেক অগ্নিযুগের। সূচনা করেছিলেন গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের লড়াই।

মাও সে তুঙ বলেছিলেন,‘‘পূর্ব দিগন্ত লাল হয়ে গেছে’’।কিন্তু শুধু পূর্ব দিগন্ত নয় পৃথিবীর সকল দিগন্তেই সেই ষাটের উত্তাল সময়ে জ্বলে উঠেছিলো লাল আগুনের দিশা। অধিকার হারানো মানুষ সেই সেই আগুনের চিহ্ন দেখে খুঁজছিলো পথের দিশা। আবারো খুঁজবে কি? হয়তো সময়ের কাছে সে উত্তর জমা আছে।

ইরাজ আহমেদ  

তথ্যসূত্রঃ স্ট্রিট ফাইটিং ইয়ার্স, তারিক আলী

ছবিঃ নিউইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান