দরোজার ওপাশে…

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

শান্তিবাগ যখন থাকতাম তখনকার কথা।বয়স কতই আর হবে! জন্ম থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত ওই এলাকায় থেকেছি।কিন্তু খুব অদ্ভুত ভাবে সেই সময়ের ঘটনা এমনভাবে মনে গেঁথে আছে যে এখনকার কথাও এভাবে মনে থাকেনা। শান্তিবাগে আমাদের বাসায় যেতে যদি মালিবাগ মোড় থেকে ধরি তবে মোড় থেকে পূবে যেতেযেতে আমলকী বাগান, তেতুলতলা স্কুল পাড় হয়ে উত্তরে ঘুরেই একটা রিকশা যায় এমন গলি।সেই গলির শেষদিকেই আমাদের বাসা।বাসায় যাওয়ার কিছুদূর আগেই হাতের বায়ে ছোট একটা উঁচু ইট বিছানো রাস্তা, তারপর একটা গেট।গেটটা যেন দূর্গম কোন ফাটক, মোটা দেয়াল, কাঠের কারুকাজ করা দরোজা। গেট এর উপরে মুখোমুখি বসা দুইটা সিমেন্ট এর রাগী সিংহ। সিংহ দুইটা সব সময়ই রেগে থাকে।ওই বাড়ির ভেতর আমার বন্ধু মুন্নী থাকে।মুন্নী যখন সঙ্গে করে ভেতরে নিয়ে যায় তখন সে থাকে সংকুচিত, আর আমি নির্ভার।কারণ ও আমাকে ভেতরে নিয়ে যায়।কিন্তু ও যখন ভেতরে থাকে তখন আমি ভয়ে সংকুচিত হয়ে যাই, গেট খুলতে দেরী হলেই ভয় লাগে কখন সিংহ নেমে আসে! তারচেয়েও ভয় লাগে দারোয়ান চাচা লেভলু খোঁড়া পা নিয়ে কখন দাঁত খিচিয়ে গেট না খুলেই বলে মুন্নী ঘুমায় তুমি বাড়ি যাও! তারচেয়ে আরো ভয় মুন্নী স্বয়ং এসে বলে কনা, আমি এখন দরোজা খুলতে পারবো না! ওইটুকু বয়স হলে কি হবে ভয়ের চেয়ে অসম্মানিত হওয়ার ভয় দ্বিগুণ ছিল।ভেতরে থেকে কেন বলে আমি দরোজা খুলতে পারবো না এই উত্তর মুন্নী দেয়ই না।আমার জিজ্ঞাসু চোখের সামনে কেঁদে ফেলে।একদিন সে আমাকে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেলো। অসুস্থ রাগী বাবা সিংহের চেয়েও বিশাল দেহ নিয়ে ভয়ংকর ভঙ্গিতে বের হয়ে গেলেন আর মুন্নী আমাকে নিয়ে ভেতরবাড়ির লাল মেঝের ছড়ানো ছিটানো আসবাব কাপড় জামা ছড়ানো ঘর পেরিয়ে পেরিয়ে পূতিগন্ধময় একটা আলো আঁধারি ঘরে নিয়ে গেলো। গিয়ে দেখি সারাগায়ে শিকল বাঁধা অপরূপা একজন মহিলা! মুন্নী বললো মা।মহিলা গায়ের পাশেই ছিটিয়ে থুতু ফেলে উচ্চারণ করলেন থুহ! মুন্নী আমাকে নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে ফটক পেরিয়ে রাস্তায় এলো! আমার হাত ওর হাতে ধরা তখনো। বললো এজন্যই রেডি না হয়ে কাউকে ভেতরে নেয়া মানা।হাতপা খোলা থাকলে সবাইকে মারেন।জন্মের পর থেকেই এমন দেখতেছি।অপূর্ব সুন্দর মুন্নীকে আমার ভয়াবহ দুখী মানুষ মনে হল।আর সিমেন্ট এর সিংহ গুলোর জন্যও ভয়ানক মায়া হল।মনে হল ওদের দুঃখ পাহারা দিতেই ওরা এমন রাগী চেহারা নিয়ে বসে থাকে।যেন আরো কষ্ট না ঢুকে যায় সেই জন্যই দিবারাত্রি এতো পাহারা! কোন বাড়ির গেইট এভাবে কারো মনে দাগ কাটে কিনা জানিনা। যখন শুনলাম আব্বা আম্মা শান্তিবাগ ছেড়ে মাদারটেকের দক্ষিণ গাঁয়ে বাড়ি করবেন বা করছেন তখন আব্বাকে লুকিয়ে লুকিয়ে একটা আবদার ছিল।তা হল একটা গেট।আব্বা হাসেন।টিনের, বেড়ার বাড়ির আবার গেট, এই রকম অর্থই হয়তো আব্বার সেই হাসি বহন করতো। কিন্তু অমন গেট না হলেও বাড়ির তো একটা গেট লাগেই।আম্মা, আমরা তিনটা বোন,যে বাড়িতে থাকি সেই বাড়ির একটা গেট লাগবেই।কিন্তু কি দিয়ে সেই গেট হবে? দক্ষিণ গায়ের অন্য বাড়ির গেটের বালাই ছিল না। বাড়ি তৈরি করার সময় একটু আড়াল তৈরি হতো হয়তো কোন বেড়া বা কলাগাছ দিয়ে।এবং ঢোলকলমীর ঝোপ দিয়ে ঘেরাও দেয়া হতো বাড়ির আব্রুর জন্য।কিন্তু আমার সেগুলো পছন্দ ছিলনা।আব্বা বাঁশের বেড়া দিয়েই গেট বানালেন। সুন্দর ফ্রেম করে একটা শক্ত বাঁশের সঙ্গে বাঁধলেন। তার গোড়াটা একটা লোহার হামানদিস্তার ভেতর বসিয়ে গেটের ফ্লেক্সিবিলিটি তৈরি করলেন।এবং সবশেষে আটকানোর জন্যই আংটা বসালেন।মজবুত গেট হলো আমাদের।তখন বুঝলাম যা কিছু উপকরণেই তৈরি হোক গেট তো গেটই।কেউ তা হুকুম ছাড়া ডিংগায় না।ভিক্ষুক আসলেও ওপারে দাঁড়িয়ে ভিক্ষার জন্য হাঁক ছাড়ে।আকাঙ্ক্ষিত মেহমান এলে হুমড়ি খেয়ে গেট খুলি আমরা।এবং সবসময় কান পেতে থাকি, তাঁর জন্য, যিনি আমার পয়লা প্রেম! তিনি আসেন, আস্তে করে নরম সুরে আমাকেই ডাকেন! আমি চটজলদি আয়নায় নিজেকে তাঁর দৃষ্টিতে দেখে উড়ে উড়ে গিয়ে গেট খুলি, জানি আমার আকাঙ্ক্ষিত সেই মানুষ কখনওই বলবেন না “ভালবাসি ” কিন্তু আমার যে তাঁর জন্য কি অপেক্ষা! সেই অপেক্ষা আজো শেষ হয়নি, হবেও না।কারণ বিরহে, না পাওয়ার বেদনায়ই প্রেম বেঁচে থাকে।তিনি চলে যাওয়ার পর দিনের পর দিন গেট ধরে দাঁড়িয়ে থেকে ভাবতাম আহা,গেইট টা কতই না সুন্দর! আজ নয় বছর হল আব্বা চলে গিয়েছেন, যেদিক চলে গেছেন সেদিন আমি এখন যে ফ্ল্যাট এ থাকি সেখানে এসেছি।আমার এ বাড়ির দরোজায় আব্বার অত্যাশ্চর্য হাতের লেখায় লিখা “আয়াতুল কুরসি “। জানি আব্বার আশীর্বাদপুষ্ট আমার এই দরোজা।কিন্তু কখনওই আব্বার জন্য এ দরোজা আমি খুলিনি।তবুও এই মধ্যবয়সে অবুঝ “কনা” হয়ে দরোজা খুলে দরোজা ধরে দাঁড়িয়ে থেকে অদৃশ্য আব্বাকে আহবান জানাই, আব্বাগো, আসেন, কেমন আছেন আব্বা? আব্বা তার ঠান্ডা তুলতুলে শুকনো আঙুল দিয়ে আমার মুখখানি তুলে ধরেন, আব্বার দাড়ি আমার বুকে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, প্রশান্তিময় হাসি ছড়িয়ে আব্বা জিজ্ঞেস করেন “কেমন আছো আমার গানের পাখী? হুঁশ ফিরে লজ্জা পেয়ে দেখি বোকার মত দেখি আমার খোলা দরোজায় আমি একলা দাঁড়ানো, কোথাও কেউ নেই।কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে দরোজা বন্ধ করে ঘরে আসি আমি আর মনে মনে বলি “বাবা, আমি আর তোমার গানের পাখী নাই বাবা, আমি এখন একলা পাখী ” আর ভাবি যত দামীই হোক যত সুন্দর হোক আর যত সাধারণ ই হোক, পৃথিবীর সব গেইট ফটক দরোজা গুলো আসলে ভিষন বিষণ্ণতা মাখা। সব দুঃখ গুলো কি সবাই ঘরে আসার সময় দরোজার গায়ে মাখিয়ে বা জমা রেখে ঘরে ঢোকে? নাকি কিছুটা সাথে করে নিয়ে ভেতরবাড়ি যায়? ভেতরবাড়ি আর বাইরের দুঃখ গুলো কি একজন আরেকজনের দেখা পায় একজীবনে? কি জানি, সব উত্তর কি পাওয়া যায় না পেতে আছে!

ছবি: লেখক