প্রীতি সম্মিলন: প্রবাস জীবনের ওয়েসিস

শহীদুল ইসলাম বাচচু

 ( নিউইয়র্ক থেকে): “ব্যস্ততার চেতনা ছাড়া বাকি সব চৈতন্য উধাও…” (বিনয় ঘোষ) “Here is no water but only rock Rock and no water.. If there were water we should stop and drink, Amongst the rock one cannot stop or think..” (T. S. Eliot) নাগরিক জীবনে ‘ঘড়ি’ নিত্য এক অনুষঙ্গ। পৃথিবীর বড় বড় শহরে, যেগুলোকে বলা হয় মেগা মেট্রোপলিস, এই যন্ত্রের কাঁটার যে নন-স্টপ ঘুর্ণন, তার সঙ্গে গতি (pace) বা তাল রেখে চলে মানুষের জীবন। অধিকাংশের। বাঙালিরা এটা খুব ভালোভাবে বলা যায় অস্তি-মজ্জা দিয়ে অনুভব করে বিদেশের মাটিতে। তাঁদের ‘ব্যস্ততার চৈতন্যহীন’ প্রবাস জীবনে! এবং বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকার মতো পাশ্চাত্যের রক্ত-ঘাম নিংড়ানো ‘ওয়ার্কাহোলিক (workaholic)’ দেশগুলোতে। এমন ‘যান্ত্রিক’ জীবন কি একঘেঁয়েমিপূর্ণ নয়? বলতে পারেন। লন্ডন, প্যারিস, নিউইয়র্কের মতো ‘মেট্রোপলিটন’-এ থাকবেন, আর মাঝে-মধ্যে একটু-আধটু ‘মনোটনি’ আপনাকে ছুঁবেনা, তা কি করে হয়! তাহলে জর্জ সিমেল (Georg Simmel) কি আমাদের এমন মনোস্তত্বকে “metropolitan individuality” অভিধা দিয়েছেন? হবে হয়তো। তারপরও আমরা, প্রবাসীরা, নিরন্তর খুঁজে ফিরি দু’দন্ড শান্তি। মরুদ্যানে ওয়েসিস। কার্ল মার্ক্স ধনতান্ত্রিক সমাজে ‘মর্মান্তিক ব্যক্তি-বিচ্ছিন্নতার’ যতই ‘ভয়াবহ পরিণতি’ দেখুন না কেন, নিউইয়র্কের মতো মেগা সিটিতে কঠোর হ্যান্ড-টু-মাউথ জীবন প্রতিদিন যাপন করেও আমরা বিনয় ঘোষ, সিমেল, মার্ক্স কিংবা নিটশের মতো ওতোটা নৈরাশ্যবাদী নই। এই শহরের আকাশছোঁয়া ইট-পাথরের জঙ্গলের মধ্যেও আমরা ‘আর্দ্র’ হই আন্তরিক বাঙালিয়ানায়। বিনয় বাবু ‘মহানগরের মানুষের কাছে হৃদয় পরিত্যক্ত” ঘোষণা দিতে পারেন, “বাস্তু ভিটার মতো শহুরে মানুষের হৃদয়ে ঘু ঘু চরিয়ে” দিতে পারেন যত ইচ্ছে; কিন্তু আমরা, প্রবাসী বাঙালিরা এখনও ওতোটা ‘পাত্থর দিল’ (stone-hearted) হয়ে যাইনি। তাই এই শহরে, এই মহানগরের লাইফ-স্টাইলের ডিফল্ট সেটিং যতই হোক না “ব্রেকফ্রাস্ট-কিডস’ স্কুল-সাবওয়ে-অফিস-ওয়ার্ক-এগেইন সাবওয়ে-ব্যাক টু হোম-স্লিপ”-এ আবর্তিত, তারপরও আছে উইকএন্ড! পরম কাঙ্ক্ষিত স্যাটারডে-সানডে! মাঝে-মধ্যে শনি-রবি’র বাইরেও প্রবাসীরা সময় বের করে নেন। নিউইয়র্কের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছেন বাঙালিরা। জ্যাকসন হাইটস, জামাইকা, ওজন পার্ক, চার্চ ম্যাকডোনাল্ড এলাকায় বিকেল আর সন্ধ্যায় গেলে মনেই হবে না এই শহরের নাম ‘নিউইয়র্ক!’ হোটেল-রেঁস্তোরা, ফুটপাতে জমজমাট আড্ডা। সারা বছরই নানা উৎসব এবং গেট-টুগেদার বা প্রীতি সমাবেশ অব্যাহত থাকে। দেশ-বিদেশে থাকা বিখ্যাত ব্যক্তি, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী, কবি-সাহিত্যিক, গুণী মানুষেরা থাকেন এসবের মধ্যমণি হয়ে। প্রাণের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস স্পর্শ করে সবাইকে। অল্প সময়ের জন্য হলেও বাঙালিরা ভুলে যান টানা-কাজের সমস্ত ক্লান্তি, মেট্রোরপলিটন মনোটনি। তেমনই এক সন্ধ্যা ছিলো মঙ্গলবার, ২৯ মে। বাঙালি-ঘন এলাকা বলে সুপরিচিত জ্যাকসন হাইটসে। কুইন্স বরোর এই জায়গাটি কেবল প্রবাসী বাঙালি নয়, অন্যদের কাছেও খুব জনপ্রিয় এক Hang-out স্পট। বাঙালি, ভারতীয়, পাকিস্তানী, স্প্যানিশ, চাইনীজ, আফ্রিকান-আমেরিকান গ্রোসারী, হোটেল-রেঁস্তোরা, দোকান পাটের ছড়াছড়ি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নামগুলোও রাখা চমৎকার বাংলায় — ইত্যাদি, হাটবাজার, মেঘনা। ইত্যাদি’র দোতলায় মঙ্গলবারের ঘরোয়া এই প্রীতি সম্মিলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) নবনিযুক্ত কমিশনার মাহবুব রিপন। যিনি বস্টনে একটি আন্তর্জাতিক পুলিশ কনফারেন্সে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে এসেছিলেন। রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার হিসেবে এখানে এসে তিনি খবর পান চট্টগ্রামের দায়িত্ব নেওয়ার। সম্মিলনে আরো উপস্হিত ছিলেন প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়। ঢাকা-নিউইয়র্ক আসা-যাওয়ার মধ্যেই থাকেন এই গুণী শিল্পী। নানা শহরে অনুষ্ঠান করেন। তাঁর গলার মাধুর্য্য এখনও অটুট। কথা বলেন কম, মিষ্টি হাসি দেন বেশি বেশি। এই নিউইয়র্কে দীর্ঘ দিন ধরে আছেন বাংলাদেশের আরো দুই গুণী মানুষ, খ্যাতিমান সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ ও অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (BFUJ)-এর প্রথম সভাপতি মনজুর আহমদ। দু’জনই এসেছিলেন সম্মিলনে। সুদর্শন মোহাম্মদ উল্লাহ তাঁর চমৎকার ড্রেস-আপের মতো কথাবার্তাও পরিপাটি, চৌকস, বুদ্ধিদীপ্ত। তাঁর সহধর্মিনীও ছিলেন সঙ্গে। মনজুর আহমদ বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অনেক চড়াই-উৎরাই ও ইতিহাসের সাক্ষী। সমৃদ্ধ তাঁর ভান্ডার। কথা বলতে পারেন সাবলীল, যতিবিহীন। তরুণ সাংবাদিক মনির হায়দার ও হাসানুজ্জামান সাকী দীর্ঘদিন বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করে এখন নিউইয়র্কের স্হায়ী বাসিন্দা। টিভি টক শো’র কারণে মনির খুব আলোচিত এবং “এই টক শো’র কারণেই আজ আমি প্রবাসী” বলে জানালেন মনির। বহু বছর পর আমার সাবেক সহকর্মী মনির হায়দারকে দেখে ভালো লাগলো। সাকী বাংলাদেশে টেলিভিশন সাংবাদিকতা করতেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন প্রেজেন্টার। এখানেও দু’জন টাইম টিভি’র সঙ্গে আছেন। সাকীর সঙ্গেও এই প্রথম সাক্ষাৎ আমার। প্রীতি সম্মিলনের আয়োজক ছিলেন জ্যাকসন হাইটসের সুপরিচিত মুখ, সজ্জন ও দিলদরিয়া মানুষ জাহেদ শরীফ রাসেল। জাহেদের বাবা এবং শ্বশুর দু’জনই বিখ্যাত মানুষ। বাবা নজির আহমদ ছিলেন চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্হার (বিএসএস) চট্টগ্রাম অফিসের প্রধান। আর শ্বশুর হলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী, ‘অপরাজেয় বাংলা’র স্রষ্টা সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ। ভালো সংগঠক হিসেবেও নাম-ডাক আছে জাহেদের। প্রীতি সমাবেশের আবহ ও উষ্ণতা সবাইকে ছুঁয়ে গেছে, কিছু সময়ের জন্য হলেও। নিরানন্দ প্রবাস জীবনে বাঙালিরা এভাবেই বের করে নেন আনন্দ-খুশি ভাগাভাগি করার উপলক্ষ্য।

ছবি : লেখক