মাঠের বাইরে ক্লাসিক মাতামাতি

রুদ্রাক্ষ রহমান

‘জীবন মানেই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
যুদ্ধ মানেই আমার প্রতি তোমার অবহেলা’
কত আগে কী মায়াময় ভাষায় চির রোমান্টিক কবি হেলাল হাফিজ বলেছেন এমন কথা। আর চার বছর পর পর ফুটবলের বিশ্বকাপের আসর ফিরে এলেই আমার কবিতার এই চরণটি মনে হয় খুব করে। বিশেষ করে আমার দেশে, আমার এই শহরে ব্রাজিল-আর আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মরিয়া মাতামাতি দেখলে! তাদের ‘ক্লাসিক সব পাগলামি’ দেখলে হেলাল হাফিজের কথার সুরে বলতে ইচ্ছে করে
ফুটবল মানে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
ফুটবল মানে খেলার প্রতি সমর্থকদের অবহেলা।
প্রাক বর্ষার সকালে ঘুম ভাঙতেই যতদূরে দৃষ্টি যায় মানুষের ছাদে, জানালায় দোল খাচ্ছে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের পতাকা। এটা আইনী বিবেচনায় ‘সঠিক’ নয়। আমাদের সর্বোচ্চ আদালতও এরকম মত দিয়েছে। কিন্তু এই দেশে কে শোনে কার কথা! আদালত আদেশ দিয়েছে, রায় দিয়েছে, পর্যবেক্ষণ দিয়েছে কিন্তু তার বাস্তবায়ন করবে কে? কেবল শুরু, ক‘দিন পরে কোন দেশের পতাকা কে কত বড় করে বানাতে পারবে তার প্রতিযোগিতা হবে। পাড়ায় পাড়ায় তর্কযুদ্ধ অনেক সময় হাতাহাতিতে রূপপান্তর ঘটার খবরও পাওয়া গেছে। কদিন আগে ফেসবুকে খবর আসে কোথায় যেন ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা আর্জেন্টাইন সাপোর্টার বাপ-ছেলেক পিটিয়ে জখম করেছে! খবরটা বিশ^াস করিনি। মেনে নিচ্ছি না এখনি। এই জখমের পেছনে হয়তো অন্য কোনো কারণ আছে! আমার দেশের ব্রাজিল সমর্থকরা অনেক ফুটবলবোঝদার হন। তারা এমন আচরণ করবেন কেনো? করতে পারেন না।
আর আর্জেন্টাইন সমর্থকরা ম্যারাডোনাভক্ত! তাতে দোষের কী? ১৯৮২ সালে বিশ^মাঠে এক ঝলক দেখা গেছে এই ল্যাটিন ফুটবল জাদুকরকে। তারপর তার জাদু দিয়ে ১৯৮৬ সালে বিশ^কাপটা জয় করে নিলেন। ইয়েস, সেবার ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলার সময় একটা গোলে ম্যারাডোনার হাতের জাদু ছিলো। তিনি স্বীকারও করেছেন ওই গোলে ‘ঈশ^রের হাত ছিলো’। এই গোল নিয়ে ম্যারডোনাকে এখনো একহাত নেন ব্রাজিল সমর্থকরা। ম্যারাডোনার নীতি-নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। আমার নিরীহ প্রশ্ন হলো-ফিফা এতো বড় একটা সংগঠন। তারা সব জেনে-বুঝেও ম্যারাডোনার সেই গোল বাতিল করলো না কেনো? কেনো শাস্তি দিলো না বিশ^ফুটবলের এই গতিময় মানবকে?
ব্রাজিল ছান্দসিক, নান্দনিক ফুটবল খেলে। পেলে, সক্রেটিস, জিকো, রোমারিও, রোনালডো, রবার্তো কার্লোস আর হালের নেইমারের মতো দুনিয়ামাতানো খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে দেশটি। পাঁচবার বিশ^কাপ জয়ের ইতিহাস কেবল তারেদরই। অতএব, দেশে দেশে ব্রাজিল নিয়ে মাতামাতি হবে এটাই স্বাভাবিক; যদিও গেলো বিশ^কাপে জার্মানির সঙ্গে সাত গোল খাওয়ার বিষয়টি-‘সেভেন আপ’ টক হয়ে ভাইরাল হয়ে গেছে। আর এই খোটাটা ব্রাজিল সমর্থকদের সইতেই হবে।
তো, এতো কিছুর পরও আমরা যে কথাটা জোর দিয়ে বলতে চাই, দুনিয়ার যেখানেই চার বছর পর পর ফুটবলের বিশ^ আসর বসুক সেখানে যেন আর্জেন্টিনার সঙ্গে ব্রাজিলও থাকে। আর আমরাতো এটাও চাই, ‘অতো গ্রুপ-ট্রুপ বুঝিনা; এতো হিসেব কষতে চাই নাÑ ফাইনালটাও খেলুক আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল’। আমরাতো এটা বরাবরই চাই বিশ^কাপটা যাক ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল বা আর্জেন্টিার ঘরে। আমরাতো এটা চাইই বিশ^কাপজুড়ে লেগে থাক ‘সাম্বা’ নৃত্যের ক্লাসিক দোলা; আর আর্জেন্টিনার ‘স্বপ্নবাজ বিপ্লবী’দের গল্প।
অবশ্য কবুল করছি, এই দেশে ইউরোপের জ্যামিতিক ফুটবলের ভক্ত সমর্থকও আছেন অনেক। তবে তারা ব্রাজিল-আর্জেনাইন সর্থকদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার মধ্যে নিতান্তই কোনঠাসা। ১৯৯০ সালে ম্যারাডোনাকে হারিয়ে জার্মানি যখন চ্যাম্পিয়ন হলো তখন ট্রাকমিছিল করে এদেশের জার্মান সমর্থকদের গুলশানে জার্মান দূতাবাসের দিকে যেতে দেখেছি। ব্যাজিওর রূপ আর খেলা দেখে এদেশের অনেক রমনী ইতালির সমর্থক হয়েছিলেন।
সেই ১৯৮২ সাল থেকে যেহেতু বিশ^কাপ ফুটবল দেখার চেষ্টা করি; বাঙালি হিসেবে মাঠে দু-একবার লাথি দিয়েছি ফুটবলে, তাই বলছি ভালোবাসি ফুটবল। বিশেষ করে ল্যাটিন ফুটবল। আর খুব করে চাইছি মাঠের বাইরে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল সমর্থকদের যুদ্ধটা জারি থাকুক। আর এটাকে আমি রক্তপাতহীন এক ক্লাসিক যুদ্ধই বলি।
বিশ^ ফুটবলের মাঠের যুদ্ধটা শুরু হবে ‘মহান’ রাশিয়ার শহরে শহরে। তার আগেই বিশ^জুড়ে, দেশে দেশে, শহরে শহরে, ঘরে ঘরে, পথে পথে, চায়ের কাপে, অফিসে কাজের টেবিলে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
আর, মাঠের বাইরে মাঠের খেলা ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের যুদ্ধটা সত্যি সত্যি ‘ক্লাসিক’! মূল যুদ্ধটা শুরু হবে ১৪ জুন। আর আমাদের চায়ের কাপে ঝড় বইতে শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। এখানে লিখে রাখা কী বাহুল্য হবে যে ফুটবলের বিশ^কাপে বাংলাদেশ ছিলো না কোনো কালে; নিকট ভবিষ্যতে জায়গা হবে; এমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না! তাহলে ফুটবলের এই আসর নিয়ে এতো মাতামাতি কেনো আমাদের?
১. ফুটবল ভালোবাসি বলে?
২. স্কুলবেলায় আমাদের মহান ব্রাজিলিয়ান কালো মানিক বা পেলের জীবনী পড়ানো হয়েছিলো বলে? বাংলা অনুবাদে জেনেছি পেলে বলেছেন, ‘পড়াশোনা আর ফুটবল-এই দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। একই সঙ্গে দুটো চালিয়ে নেয়া যায়।’
৩.আমরা মহান বিপ্লবী চে’ গুয়েভারাকে ভালোবাসি বলে ভালোবাসি আর্জেন্টিনাকে, সেই দেশের ফুটবল আর ‘ম্যাজিকম্যান’ ম্যারাডোনাকে। ১৯৮৬ সালে প্রায় একাই বিশ^কাপ জিতে ম্যারাডোনা সে বিজয়কে উৎসর্গ করেছিলেন বিশ^তারুণ্যের উদ্দেশ্যে।
৪. আরো হয়তো অনেক অনেক কারণ আছে ফুটবলের বিশ^কাপের আসর নিয়ে আমাদের মাতামাতির। তবে, এখন পর্যন্ত মোটা দাগে যতোটুকু দেখি, তাতে মনে হয় আমরা আটকে আছি ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনায়।
তাতেও দোষের কিছু নেই। এই দুটো দেশ এখনো ভালো ফুটবল খেলে। এখনো এই দুই দেশে ফটবল নিয়ে অনেক গল্প তৈরি হয়। এই দুই দেশ এখনো পরিচিত হয় ফুটবল দিয়ে। তাই, এই দুই দেশের ফুটবল নিয়ে আমার দেশের সমর্থকদের যুদ্ধটা ভীষণ উপভোগ করি আমি এবং আমরা।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা