এই শহর আমাকে লড়তে শিখিয়েছে

1958380_834023686719853_5727978635352503567_nরুকসানা আক্তার: আমার বর্তমান ডেরাটা একটা একুশ তলা হাইরাজ বিল্ডিং এর সাত তলায়। ব্যালকনি বা আমার বেডরুম থেকে মোটামুটি ইস্ট লন্ডনের স্কাই লাইন অনেকটা ই দেখা যায় । ডান দিকে তাকালে দূরের সবুজ পাহাড় গুলো হাতছানি দিয়ে যেন ডাকে । আবার, সামনের দিকে তাকালে  ব্যস্ত শহরের উঁচু নিচু বিল্ডিং পাড় হয়ে অনেক অনেক দূরের ধূসর পাহাড়ের গায়ে দৃষ্টি আছড়ে পড়ে। বামে কুইন এলিজাবেথ অলিম্পিক পার্ক। এই পার্কে  ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান ফেমাস Sculptor আনিস কাপুর এর নির্মিত  sculpture অরবিট এতো উঁচু যে অনেক দূর থেকে ওর  চূড়াটা দৃষ্টিগোচর হয় । আর রাতের বেলা অরবিট যখন আপাদামস্তক লাল আলো নিয়ে জ্বলতে থাকে তখন মনে হয়  যেনো  সে  ইস্ট লন্ডনের কুইন । ArcelorMittal_Orbit_April_2012-682x1024

আজ দেশ থেকে হলিডে তে আসা আমার বড় ভাই আর ভাবীকে ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশন এ চানটেলহামগামী বাসে তুলে দিয়ে প্রিয়জন চলে যাওয়ার একরাশ বেদনা নিয়ে একা একা ফিরছিলাম । তারাও সম্ভবত ছেলেমেয়ে নিয়ে আমার যাপিত ব্যস্ত জীবন কিভাবে একহাতে সামলাচ্ছি তা দেখে আনন্দ বেদনায় আচ্ছন্ন মন নিয়ে  ফিরছিলেন । মেয়েও আজ ইস্টার হলিডের দিনগুলো ফুরিয়ে যাওয়ায় যথারীতি তার ইউনিভার্সিটি তে ফিরে গেছে । এই বছরটা তার ফাইনাল ইয়ার । আগামী মে মাসে  সব একজাম শেষ করে ওখানকার পাট চুকিয়ে আমার কাছে লন্ডন আবার ফেরত আসবে । এই কয়েকদিন আমি ছুটিতে । ছেলেরও ইস্টার এর  ছুটি চলছে । আমার মেয়ে , বড় ভাই, ভাবী মিলিয়ে বাসাটা খুব প্রাণবন্ত ছিল । আর তাই ভিক্টোরিয়া স্টেশন থেকে ফিরে ঘরটা কেমন শূন্য শূন্য লাগছিলো।
আজ রাতের আকাশটা খুব পরিষ্কার তার মধ্যে ভরা পূর্ণিমার আলো তে সব যেন চন্দ্রস্নান করছে । মন খারাপ বলে আমি জানালায় দাঁড়িয়ে বিল্ডিং এর পাশে ছোট ফরেস্টের মতো সিমেট্রিটা মোহাবিষ্ট হয়ে  দেখছিলাম । চাঁদের আলো যেন  এই কবরখানার ঘন গাছ-গাছালির সঙ্গে ছম ছম করা আলো আঁধারির মিতালী পেতেছে ।
এই দেশে প্রায় পনেরো বছর হয়ে গেল আছি । প্রথম প্রথম এত অপরিচিত লাগতো এই শহর যে ,দূরে কোথাও একা একা যাওয়া দূরে থাক ঘরের কাছে মুদির দোকানে যেতে পর্যন্ত ভয় পেতাম। অথচ এখন সুযোগ পেলেই বা ছুটির সময়ে ছেলে নিয়ে লন্ডনের বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গাগুলো বা মিউজিয়াম বা আর্ট গ্যালারিতে ঘুরে ঘুরে সুন্দর সময় কাটাই। মেয়ে আসলে সবাই  মিলে একসঙ্গে সারাদিনের জন্য ঘুরতে বের হয়ে যাই ।  এখানকার  মিউজিয়াম এবং আর্ট গ্যালারি  খুবই সমৃদ্ধ । রেয়ার সব কালেকশন দিয়ে ঢেলে সাজানো । একেকটা মিউজিয়াম বা গ্যালারিতে গেলে সারাদিন কাটিয়ে দেয়া যায় ।

আবার   কোভেন গার্ডেন  হলো আরেক  সজীব প্রাণের ভরপুর  জায়গা । ওখানকার স্ট্রিট এন্টারটেইনমেন্টগুলো খুব এনজয় করার মতো । ব্যস্ত জীবনে  ঘুরতে যাওয়া এই সময় অক্সিজেনের মত কাজ করে ।
এই লন্ডন  শহরকে তার হিস্টোরি , আর্কিটেকচার, মনুমেন্ট ,গ্যালারি এবং মিউজিয়াম , টেমস নদীর উপর বিখ্যাত টাওয়ার ব্রিজ সহ আরো অনেক বিভিন্ন ডিজাইনে করা ব্রিজ আর লন্ডন আই সব মিলিয়ে  প্রাণবন্ত  করে তুলেছে  ।  এর মাঝে মাঝে সুবজ গাছ গাছালি ছাওয়া এবং ছোট ছোট লেক  দিয়ে  নির্মিত  পার্ক গুলো এর শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে আরো অনেক বেশি । সব মিলিয়ে এক কথায় অপূর্ব এক প্রাণের শহর ।  কেমন জানি মিশে গেছি আমরা এর মাটি ,আকাশ বাতাসের সঙ্গে । এখন আর অচেনা ফিলিংস হয় না । এখন এই শহরটার সঙ্গে একাত্মতা বোধ করি আগে যেমন বোধ করেছি ঢাকা বা আমার জন্ম শহর হবিগঞ্জের সঙ্গে । এই শহর আমাকে  জীবনযুদ্ধে কিভাবে সারভাইভ করতে হয় শিখিয়েছে । কিভাবে নিজের  ও  অন্যর আত্মমর্যাদা এবং আত্ম সম্মান বজায় রাখতে হয় তা শিখিয়েছে । আজ পায়ের নিচে যে শক্ত মাটি তৈরী করেছি এবং বাচ্চাদের নিয়ে একটা স্বচ্ছ সুন্দর জীবন যাপন করছি  এর সম্পূর্ণ ক্রেডিট এই শহরের মাটি ,আলো, আকাশ ,বাতাস আর ওয়েলফেয়ার সিস্টেম ।

(লন্ডন থেকে)