ভয় …

শিলা চৌধুরী

(ক্যালিম্পং থেকে) ‘দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে তব মঙ্গল- আলোক…তবে তাই হোক।’রবী ঠাকুর লিখছিলেন।এর সঙ্গে হয়তো ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে ভয় ডর গুলো. ..।বাবা বাড়িতে আমাদের ঘর গুলো মাটির দেয়ালের আর উপরে টিনের ছাউনি ।আগে আমাদের মাঝখানের ঘরটায় বারান্দা ছিল না ।চারপাশে অনেক গাছপালা ছিল।সন্ধ্যে হলেই শেয়াল চোর মশাইদের আনাগোনা চলতো ।আমাদের কালুটার চিৎকারে সেটা বুঝতে অসুবিধা হতো না ।আর আসতেন দলবল বেঁধে হাঁস মুরগী চুরির ধান্দায় ।বিদ্যুৎ ছিলনা গ্রামে আমাদের।ঠাম্মী নয়তো বাবা লাঠি হাতে বের হতেন আমাদের সঙ্গে যখন এক ঘর থেকে আরেক ঘরে উঠোন পেরিয়ে যেতাম।ভয় পেতাম বেশ ভালোই তবে উৎসাহ ও কম ছিল না…কটা এসেছে সেটা গোনার জন্যে ।বাবা টর্চের আলো ফেলতো আর তখন শেয়ালের চোখে সেই আলো পড়লেই হতো -জ্বল জ্বল করে অনেক গুলো আলো জ্বলে উঠতো।দৌড়ে পালিয়ে দূরে গিয়ে বিকট স্বরে হুক্কা হুয়া রবে এলাকা জাগিয়ে দিতো। সেই রবে বেশ ভালোই ভয় পেতাম ।মাঝে মাঝে বন বিড়াল ও ঢুকে যেতো চৌকির তলায় ।ভাওয়ালের প্লায়ষ্টোসিন যুগের বনাঞ্চলে আমাদের গ্রামের বাড়ি তো। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করছিলাম একদিন, প্রচন্ড বৃষ্টি আর সঙ্গে মেঘের গর্জন, ঘরের দরজায় বসেই ব্রাশ করছিলাম, ঠিক ওই সময় সাত সকালে ঘন অন্ধকার ঝলসে দিয়ে বিদ্যুৎ চমক আর প্রচন্ড শব্দে বাজ পড়ে…মনে আছে আমি শুধু মা বলে একটা চিৎকার দিতে পেরেছিলাম ।অনেক ক্ষণ পর তখন চোখ খুলি দেখি সবাই হাতে পায়ে তেল মালিশ করে যাচ্ছে ।তখন আমি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি।ঠিক তার কিছু দিন পর বর্ষার দিনে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল আর তখনি স্কুল ছুটি হয়।সেই প্রথম মনে হয় জীবনের সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলাম, একসঙ্গে দল বেঁধে যদিও আমরা স্কুলে যেতাম ,তবুও ..।হাত পা শক্ত করে চলতেছিলাম,মনে হচ্ছিলো পৃথিবীতে আমি ছাড়া অন্য আর কেউ নেই, বিদ্যুৎ চমকে বাজ গুলো সব আমাকে উড়িয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে ।ঠিক তার ক’ঘন্টা পরেই সন্ধ্যে নাগাদ খবর পাই পাশের গ্রামের আমার সহপাঠী জেঠতুতো ভাই বাজ পড়ে মারা যায় ।একসঙ্গে ক্লাস শেষে খানিকটা একই পথে বাড়ি ফিরি আমরা।সারা জীবন বলবো না ..সেই ভয়টা আজো খানিকটা পাই।মা জানে সেটা, তাই আকাশে ঘনকালো মেঘ করলেই দূরে থাকলে ফোন করতেন…সেই ফোনটা এখন আর বেজে ওঠে না ।মা জেনে গিয়েছে মেয়ে তাঁর ভয় পেতে পেতে এখন ভয় গুলোই ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে তার জীবন থেকে । নিজের দেশ ছেড়ে কলকাতায় সাংবাদিকতায় পড়তে আসলাম ছিয়ানব্বই সালে।থাকার জন্যে আবাসিক কোন ব্যবস্থা ছিল না কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেতাজী নগর কলেজে ।আমি ছিলাম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক স্তরে সাংবাদিকতা বিভাগ শুরু হবার দ্বিতীয় বছরের ছাত্রী ।তখন সবে তিনটে কলেজে ছিল শুধুমাত্র সাংবাদিকতা বিভাগ  ।সান্ধ্য বিভাগ ছিল আমাদের ।ক্লাস শেষ হতো রাত দশটা নাগাদ ।এদিকে থাকার জায়গা পাচ্ছিলাম না কোথাও কলকাতা শহরে।নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, ভাষা উচ্চারণ সমস্যা ,এখনকার মতো মোবাইল ছিল না।বাড়িতে যোগাযোগ মানেই চিঠি বা ফ্যাক্স নয়তো বাবা বা কাকুদের অফিসে ফোন তাও দু এক সপ্তাহ পর পর ।কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে আগ্রহী নন বিদেশী ছাত্রী হিসেবে ।ক্লাস শেষে তাই শেষ ট্রেনে রানাঘাটে ফিরতে বাধ্য হতাম বাবার মামা বাড়িতে ।ওখানেই থাকছিলাম ।সেই ট্রেন রানাঘাট ষ্টেশনে পৌঁছাতো রাত বারোটা দশ মিনিটে ।শিবুকাকু ( বাবার মামাতো ভাই ) দাঁড়িয়ে থাকতেন সাইকেল নিয়ে।প্রতিদিন কোন কামরায় বেশি ভীড় সেটা দেখে উঠতাম।একেকটা ষ্টেশন আসতো আর কামরার যাত্রী কমতে থাকতো।নৈহাটি পেরোতেই শুরু হতো আমার কামরা বদলানো।এক দুজন করে থাকতো যাত্রী ।আর হাত পা ঠান্ডা হয়ে শিরদাঁড়া শক্ত হতে শুরু করতো ভয়ে…।ভেতরে ছিল ভয়ের লুকানো কান্না ।কাউকে বুঝতে দিতাম না সে দুর্বলতা ।বইয়ের ব্যাগটা ধরা হাতটা আস্তে আস্তে ঠান্ডা বরফের মতো অনুভব করতাম ।পুরুষ মানুষ কিছু যাত্রীর চাহনি আর অঙ্গ ভঙ্গি দেখে ।একদিন দুদিন. ..ধীরে ধীরে ভয় পেতে পেতে জানি না কবে সাহসী হয়ে উঠেছিলাম।ভেতরের কান্না টা কমতে শুরু করেছিলো… মনকে বুঝিয়েছিলাম হারলে হবে না, হেরে যাওয়া মানেই দেশে ফিরে যাওয়া আমার সারা জীবনের স্বপ্নের বিষয় নিয়ে না পড়েই।বাবা বুঝিয়েছিল যখন খুব ছোট ছিলাম তখন থেকেই -সাংবাদিকরা নির্ভীক হন।মন্ত্রের মতো জপে জপে ভয়টাকে ভয় পাইয়ে দিয়ে তাড়িয়েছিলাম। খুব সকালে ফোন মায়ের, তাও রাত চারটের সময়।আতঙ্ক নিয়ে ফোনটা উঠালাম।বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউ -তে ।সেদিন ছিল তিন জুন ২০১১ সাল ।যদিও আন্তর্জাতিক সময়ের হিসেবে চার জুন।হাত ফসকে মোবাইল ফোনটা কখন পড়ে গিয়েছিল বলতে পারবো না।অনেকটা সময় পর খেয়াল করলাম আমার হাত পা কাঁপছে ।আমি হাত পা নাড়াচাড়া করতে পারছিনা ।সারাটা দিন একই ভাবে উৎকণ্ঠিত হয়ে একই জায়গায় প্রায় বসে রইলাম।অনেক চেষ্টা করেও বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারছিলাম না ।রাত দশটা নাগাদ মা ফোনটা দিলো বাবাকে…মা ভয় পেও না আমি ভালো আছি এখন,একটু সুস্থ হয়েই আসবো তোমার কাছে ….বাবার গলার স্বর জড়িয়ে জড়িয়ে ছিল ।ভয়টা লক্ষ গুণ বেশি করে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল ভয়ের দিকে সেই অজানা বাবার গলার স্বর গুলো . ..।রাতটা মনে হচ্ছিল ফুরোচ্ছে না…। পাঁচ জুন সকাল আটটা মায়ের ফোন. …সব শেষ, বাবা নেই আমাকে ক’ঘন্টা আগেই ভয় না পেতে বলে নিজেই সব ভয়ের উর্ধে চলে গিয়েছেন । কদিন আগে কলকাতা ছেড়ে আসছিলাম ক্যালিম্পং এর জন্যে মানসিক কষ্টের ভয় থেকে দূরে সরে থাকার জন্যে ।ক’মাসের ব্যবধানে নিজের আসন্ন সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই হারিয়ে আর প্রান প্রিয় সন্তান সম পোষা সারমেয়। অনি কে হারিয়ে নিজের ছায়াটাকেও ভয় পেতে লাগলাম একটা সময়ে একা ঘরে ।পালিয়ে এলাম ভয় থেকে বাঁচতে ।আসার দিন গরীব রথের কামরার মধ্যরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে মনে হচ্ছিলো কেউ যেন নেই এই পৃথিবীতে. ……। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো, গলাটাকে কেউ যেন চেপে ধরে টেনে হিঁচড়ে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে ।উপরের বার্থ থেকে কখন যে গার্ড এর ওখানে বসার জায়গায় পৌঁছেছি জানি না ।গার্ড দরজা খুলে দিয়ে জলের বোতল হাতে নিয়ে আমাকে জল খেতে বললেন…।বুক ভরে শ্বাস নিলাম শীতল হাওয়ায়. ..।শীতল সেই হাওয়া সব ভয় গুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল যখন মনে পড়লো ছয় জুন ছুঁয়ে দেখেছিল, দেখেছিলাম বাবার নিথর স্পর্শের বাইরে শীতল শরীর টা. …। চিমটি কেটে দেখলাম নিজের হাতে. ..আমি পৃথিবীতেই আছি বুঝলাম. ..হাসলাম নিজের মনেই… বাবা নাহ ভয় পেতে মানা করেছিলেন. ..কানে বেজে ওঠলো আবার সেই শেষ শোনা বাবার অজানা স্বর …যে স্বর এক সময়ে নির্ভীক সাংবাদিক, লেখক হবার স্বপ্ন দেখিয়েছিল

ছবি: লেখক