কাজ শেষে ঘরে ফেরারও তাড়া থাকে না…

ডা. এম আল মামুন

এক 
(জর্ডান বর্ডার, তাবুক থেকে): এই ধূ ধূ মরুভূমিতে এখনও সন্ধ্যার ছায়া মিলিয়ে পুরোপুরি রাত নামে নি। ইফতারি আর মাগরিবের নামাজ পর্ব শেষ হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। মাথার ওপর মেঘহীন পরিস্কার আকাশ। হাতে আরব্য কফির ছোট্ট পেয়ালা। ঐ তো পশ্চিমাকাশে দেখা যাচ্ছে একদিন বয়সী এক ফালি বাঁকা চাঁদ। ঝকঝকে রূপায় মোড়ানো রামাদানের নতুন রূপালী চাঁদ। ইভিনিং শিফটের কাজের ফাঁকে কফির পেয়ালায় ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছি। আর ভাবছি, এবারের চাঁদটা যেন বয়সের তুলনায় একটু বেশিই স্বাস্থ্যবান। ঠিক যেমন কোনও কোনও বছর ঈদের চাঁদকেও এ রকম স্বাস্থ্যবান বলে ভ্রম হয়।

জায়গাটা সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে জর্ডান বর্ডার ঘেঁষা এক প্রত্যন্ত এলাকা। মূলতঃ এটি একটি স্থলবন্দর। যে বন্দর দিয়ে রামাদান এবং হজ্জ্বের সময় পিলগ্রিমগণ ইউরোপ, আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়া থেকে স্থলপথে সৌদি আরবে প্রবেশ করে। এই স্থলবন্দরটিই এবারের রামাদানে আমার এক মাস মেয়াদী অস্থায়ী কর্মস্থল।

চিকিৎসাশাস্ত্রে Mass Gathering Health বলে একটা বিষয় আছে। পূর্ব নির্ধারিত কোনও জায়গায় অস্বাভাবিক সংখ্যায় জন সমাগম ঘটলে, ঐ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য বিষয়ক দেকভাল করাটাই হচ্ছে Mass Gathering Health কর্মসূচীর মূল উদ্দেশ্য। বিশ্বকাপ ফুটবল, মুসলিম সম্প্রদায়ের হজ্জ্ব, রোজার মাসে ওমরা, এগুলোকে আন্তর্জাতিক Mass Gathering – এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তাবুক প্রাদেশিক অধিদপ্তর থেকে আমাকে কখনো সখনো হজ্জ্ব কিংবা ওমরার Mass Gathering Health কর্মসূচীর ‘পাবলিক হেলথ্ সারভাইল্যান্স’ দলকে টেকনিক্যাল সহযোগিতা প্রদানের জন্য পাঠানো হয়। হজ্জ্ব বা ওমরা পিলগ্রিমদের ইম্যুনাইজেশন স্ট্যাটাস নিশ্চিতকরণ, ফুড সেফটি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য শিক্ষা, পরিবেশ স্বাস্থ্য, ইত্যাদি বিষয়কে সামনে রেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ্ রেগুলেশন’ এর আলোকে আমাদের দল কাজ করে। এবারের রামাদানে চব্বিশ ঘন্টায় চারটি শিফটে ভাগ হয়ে আমরা চারজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এই দলকে প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল সহযোগিতা প্রদান করছি।

দুই. 
এখন মধ্যরাত। একটু আগে আমার ইভিনিং শিফট শেষ হয়েছে। ইচ্ছে করেই আমি ডরমিটরিতে ফেরার মাইক্রোবাস মিস্ করেছি। আমি হাঁটছি আম্মান-তাবুক-মদিনা মহাসড়ক ধরে। হালকা হর্ন দিতে দিতে আমাকে পাশ কাটিয়ে ভুস করে দুটি ওমরা যাত্রীবাহী বাস চলে গেল। নির্জন মধ্যরাতের মহাসড়ক ধরে স্যুটেড-বুটেড একজন মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে এই দৃশ্য বড়ই বেমানান। জর্ডানের দিক থেকে বয়ে আসা ফুরফুরে ঠান্ডা বাতাস আমাকে এলেবেলে করে দিচ্ছে। আমি ডরমিটরিতে ফেরার কোনও তাড়া অনুভব করছি না। এই বিশাল পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে কাজ শেষে যাদের ঘরে ফেরার কোনও তাড়া থাকে না। হয়তো আমিও সেই মানুষদেরই একজন…।

ছবি: লেখক ও গুগল