রান্নাশিল্প…

আশিক বিশ্বাস

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আমার রান্না করতে বেশ ভালো লাগে। সত্যি বলতে গান শোনা আর রান্না করা, এ দুটোর মধ্যে কোনটা বেশী পছন্দ তা নিয়ে আজকাল নিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। রান্না করতে ভালো লাগে দেখেই যে ভালো রান্না করি, ব্যাপারটা তা না। তবে রান্না নিয়ে আমার গর্বের শেষ নেই আর এ নিয়ে জ্ঞান বিতরণ করতেও বাঁধে না। শায়ান হবার পর আম্মু এসে ছিলেন আমাদের সঙ্গে কিছুদিন। তখন একদিন বলেছিলাম “আম্মু তোমার ডালের বাগারটা ঠিক হয় না”। মা রাগে, বিষ্ময়ে মিনিট পাঁচেক কথা বলতে পারেনি। যা মজা লেগেছিলো 🙂

আমিও ছাত্রাবস্থায় রান্না শিখেছি বিদেশে পড়তে আসা আরো অনেক স্টুডেন্টদের মতই, তবে সেই সঙ্গে অন্যদের তুলনায় আমি রান্না করেছিও বেশী। এর জন্য অবশ্য সাগরকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। ও আমার বছর খানেক আগে আমেরিকাতে এসেছিল। সেই সময়ে সে অনর্গল ইংলিশে কথা বলে। ড্রইং রুমকে অনায়াসে লিভিং রুম বলে। বিদেশীদের মত জামা-কাপড় পরে। আমি সাগরকে দেখে মুগ্ধ। সব কিছুতেই ওকে ফলো করি। শুধু রান্নার ব্যাপারে এসে তা আর পারা গেলো না।

আমরা দুজন তখন প্রথম অ্যাপার্টমেন্টে উঠেছি একসঙ্গে। সাগর রাতে পাস্তা রান্না করছে। স্প্যাগেটি। রান্নার সঙ্গে চলছে সে সম্পর্কিত লেকচার। এক পর্যায়ে এসে গরম পানি থেকে একটা স্প্যাগেটি স্ট্রিং তুলে নিয়ে ওপরে ছুঁড়ে মেরে আমাকে বললো ওটা যদি সিলিং এ আটকে যায় তবে বুঝতে হবে পাস্তা সিদ্ধ হয়েছে। আমি ঢোক গিললাম। মনে হলো বোনের বাসা ছাড়াটা বিরাট ভুল হয়েছে। এর ভরসাতে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে। জীবন রক্ষার্থে রান্না শেখা শুরু করলাম। কে দিয়েছিল তা আরে মনে নেই, তবে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের কিচেনে হলুদ স্টিকি নোটের ওপরে লেখা “ফর্মুলা” টা (রেসিপি বলাটা ভুল হবে) এখনও মনে আছে। এক চা চামচ পরিমানে হলুদ, মরিচ, ধনে আর জিরা। হোক সে গরু, মুরগী বা ডিম, না হয় ডাল বা বেগুন বা আলু ভাজা … চোখ বুজে দাও ঢেলে এক চামচ করে। ব্যাস।

এই রান্নায় অন্য মশলার অবদান বোঝা না গেলেও মরিচের তারতম্য ঠিকই টের পাওয়া যেত। মাহাবুব, শৈবাল, জয় থাকতো একই বিল্ডিং এ। রতন আর কোয়েল থাকতো একটু দূরে। ওরা সবাই আসতো রান্না হলেই। খালেদ ভাই, মাঝে মধ্যে। তরকারিতে ঝাল বেশী হলেই সবার উৎফুল্ল মন্তব্য (বিশেষ করে রতন আর কোয়েলের) … “আজকে রান্না কঠিন হইসে”। সেই সময় আমাদের খাওয়াটা, বিশেষ করে শীতকালে, ছিলো দেখার মত। গরম ভাত আর তরকারি নিয়ে প্যাটিও ডোর খুলে প্লেট বাইরে ধরে রাখা হতো যাতে তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়। এরপর খাওয়া। সেটাকে ঠিক খাওয়া না, “গেলা” বলা যেতে পারে। পরেরবারে আর তরকারি পাওয়া যাবে কি না নির্ভর করতো কত দ্রুত প্রথম প্লেট শেষ করা যায় তার ওপর। যাই হোক, বন্ধুদের প্রশংসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি মরিচের ব্যাবহারকে কুটিরশিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেলাম। সব কিছুতেই ভয়ঙ্কর ঝাল দেয়া শুরু করলাম। মনে আছে একবার মাংস রান্না করেছিলাম যার মধ্যে দুই প্যাকেট কাঁচা মরিচ দিয়েছিলাম সবজি হিসেবে।

শায়ান একেবারেই ঝাল খায় না। আজ ওর জন্য রান্না করতে গিয়ে মরিচ একটু বেশী পড়ে যাওয়াতে সেই দুর্দন্ত “ঝাল দিন” গুলোর কথা মনে হলো। ঝালের প্রতি অকৃত্তিম ভালোবাসার কারনেই হয়তো জীবনে মিষ্টি বানানো শেখা হলো না। বলা যায় না, ওতেও হয়তো কিছু মরিচ দিয়ে বলতাম “সুপার হইসে” ।

ছবি: লেখক