তাহাদের প্রণয় কাহিনি

সিনেমার দৃশ্যে সেই জুটি

রাজ কাপুর সম্পর্কে পুত্র ঋষি কাপুর তার বই ‘খুল্লম খুল্লা’ তে বেশ স্পষ্ট করেই লিখেছেন, তার পিতৃদেব তিনটি বিষয়কে সবচাইতে বেশী ভালোবাসতেন। সিনেমা, সুরা এবং তাঁর নিজের চলচ্চিত্রের মূখ্য অভিনেত্রীদের।ঋষি কাপুর সামান্য ক্ষোভ মিশিয়েই লিখেছেন তার মা ছাড়া অন্য মহিলারাই ছিলো তার বাবার প্রেমিকা। আর এই প্রেমিকাদের মাঝে অন্যতম ছিলেন কিংবদন্তীসম অভিনেত্রী নার্গিস।
রাজকাপুরের জীবনে ১৯৪৭ সাল ছিলো গুরুত্বপূর্ণ বছর। বড় ছেলে রণবীরের জন্ম হয় ওই বছর।একই বছর জন্ম নেয় তাঁর নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ‘আর.কে ফিল্মস’। আর সেই ব্যানারেই প্রথম ‘আগ’ ছবির নায়িকা হয়ে আসেন নার্গিস। রাজ কাপুরের জীবনে শুরু হয় পরকীয়া প্রেমের নতুন এক অধ্যায়।
তাদের দুজনের প্রেমপর্ব শুরু হয়েছিলো ‘বরসাত’ ছবির শ্যুটিং থেকেই। অনেকে বলেন নীল চোখের রাজ কাপুরকে দেখেই প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন কুড়ি বছর বয়সী নার্গিস।তখন রাজ কাপুর বিবাহিত। কিন্তু নিজেকে আটকানোর জন্য খুব বেশীকিছু করার ছিলো না নার্গিসের। হয়তো তিনি নিজেও ভুলতে চেয়েছিলেন রাজ কাপুর যে বিবাহিত। আর সেজন্যই সাত বছর তিনি নানা ভাবে চেষ্টা করে গেছেন সেই ভালোবাসার মানুষটিকে বিয়ে করার।কিন্তু রাজ কাপুর? ভারতীয় সিনেমার পর্দায় আর জীবনে ভালোবাসার রাসপুটিন ছিলেন তিনি। নার্গিসের সঙ্গে যখন তাঁর প্রেম তুঙ্গে সেই সময়ে কয়েক বছরে তিনি আরো তিন সন্তানের জনক হন। কিন্তু নার্গিস হয়তো ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে ছিলেন। বুঝেও বুঝতে চান নি সেই নিদারুণ সত্য, প্রেম নেই। তিনি শুধুই ‘আর.কে ফিল্মস’-এর লোগোর সেই বিখ্যাত ফ্রেমে বন্দী।
এই সত্যটা বুঝতে নার্গিসের সময় লেগে গিয়েছিলো সাত বছরেরও বেশী। রাজ কাপুর ভালোবাসতেন তার সংস্থাকে, ভালোবাসতেন আরো অন্য নায়িকাদের। তবে নার্গিসকে তিনি ভালোবাসেননি এমনও নয়। সাত বছর পর নার্গিস যখন অভিনেতা সুনীল দত্তকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেন, ছেড়ে দিলেন রাজ কাপুরের হাত, শোনা যায় রাজ কাপুর তখন রাতে বাড়ি ফিরতেন মদ খেয়ে টালমাটাল হয়ে।নিজের ঘরে বসে কাঁদতেন একা একা।
কেন মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন নার্গিস? সে কাহিনিও সিনেমার গল্পের চাইতে কম নাটকীয় নয়। সময়টা ১৯৫৭ সাল। মুম্বাই থেকে একটু দূরে উমরাও নামে এক জায়গায় শ্যুটিং চলছে মাহবুব খানে‘র ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ছবির।

সুনীল দত্ত

হঠাৎ করেই আগুন লাগলো সেটে। সে আগুন মুহূর্তেই গ্রাস করে নিলো সবকিছু। আর আগুনের বেড়াজালে আটকা পড়লেন স্বয়ং নার্গিস। ঠিক তখনই সেই অগ্নিকুন্ডের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে নার্গিসকে উদ্ধার করে আনলেন সেই সিনেমার এক অখ্যাত অভিনেতা সুনীল দত্ত। মাদার ইন্ডিয়ায় সুনীল দত্ত অভিনয় করছিলেন নার্গিসের ছেলের ভূমিকায়। সেই অগ্নিকাণ্ডের কয়েকদিন আগে আত্নহত্যার চেষ্টা করেছিলেন নার্গিস। হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন রাজ তাকে বিয়ে করবেন না। তাদের মধ্যে প্রেমের নদী থাকলেও কোনো সেতু নেই। রাজ কাপুর কিছুতেই স্ত্রী আর সন্তানদের ছেড়ে এসে তাকে বিয়ে করবেন না। তাই সেদিন আগুনের ভেতর থেকে কোলে করে তাকে যখন বের করে আনছিলেন সুনীল দত্ত নার্গিসের হয়তো মনে হয়েছিলো এমন একজন পুরুষের সন্ধানই তিনি করেছেন সারা জীবন। এই ঘটনার পর ১৯৫৬ সালে ‘জাগতে রাহো’ সিনেমার শ্যুটিং শেষ করে ‘আর.কে ফিল্মস’-এর ফ্লোরে আর কোনোদিন পা রাখেননি নার্গিস। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন রাজ কাপুরের দিক থেকে।
মাদার ইন্ডিয়া ছবির শ্যুটিং শেষ হলে নার্গিস দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রথম সিদ্ধান্ত ছিলো আর সিনেমায় অভিনয় করবেন না। দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত, বিয়ে করবেন সুনীল দত্তকে।
নার্গিসের ভালোবাসা টালমাটাল করে দিয়েছিলো রাজ কাপুরের সংসারকে। কিন্তু রাজের স্ত্রী কৃষ্ণা শক্ত হাতে ধরেছিলেন সংসার আর সন্তানদের। সেই সময়েও তিনি ভাবেননি গৃহত্যাগ করার কথা। সেই ঝড় থেমে যাওয়ার অনেক বছর পরে এক পার্টিতে কৃষ্ণার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো নার্গিসের। কৃষ্ণাকে বলেছিলেন নার্গিস, ‘আমার জন্যই তোমাকে এতো ঝড় সামলাতে হয়েছিলো। আমি ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে।’
সেদিন কৃষ্ণা মৃদু হেসে নার্গিসকে উত্তরে বলেছিলেন, ‘ওই জায়গায় আমার বদলে অন্য কেউ থাকলেও তাকে এই সমস্যায় পড়তে হতো।’

বিনোদন ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ এই সময়, কলকাতা
ছবিঃ গুগল