কিসের টানে কে জানে…

মৃত্তিকা মৃত্যুঞ্জয় ব্যানার্জী

মেয়েরা বড়ো আঁকড়ে ধরতে চায়, কেন কে জানে!!!সংসারের মায়ায় আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে থাকা এক জীব তারা।অনাদর, অমর্যাদা,অপমান সয়েও চোখে আঁকা হয়ে থাকে ভালোবাসার ঐন্দ্রজালিক হাঁড়িকাঠ। একটার পর একটা শর্ত আর পরীক্ষায় পাশ করে অথবা না করে ছুটতে ছুটতে কেটে যায় জীবন….তবু পাওয়া হয়না, জীবনের রেলগাড়ি থেমে থাকেনা….সফর শেষের আগে বড় বড় দলা দলা অভিমান জমে ওঠে অস্তিত্বের গায়ে, পেকে ওঠে,ফেটে যায়। সেই দগদগে ঘা নিয়ে, নিঃসীম শূন্যতা আর একাকীত্বে কাটে দিনগুলো….তবু তারা আঁকড়ে ধরতে চায়,সংসারের মোহ ঘোচেনা ভালোবাসার তেষ্টা মেটেনা।

বছর পঁচিশের মাধবী, নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে এবং বৌ, হাঁপানি,শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা আছে তার…কিছুদিন আগে আলাপ হলো… একটি প্রাইভেট হসপিটালের সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টে হাজার সাতেক টাকার চাকরি তার…চাকরির বয়স দুই বছর…২০১৬ সালে একমাত্র কন্যাসন্তানকে হারায় সে…আড়াই বছর বয়সের সেই সন্তান খাবার গিলতে পারত না…গলায় টিউমার ছিল, সেটা ফেটে যায়…তারপর থেকে মন টেকেনা বাড়িতে, কাজে ঢুকে যায়….স্বামী অটো চালায়…. মাধবী টানা ষোল ঘন্টা, আঠারো ঘন্টা ডিউটি শেষে বাড়ি পৌঁছায়, রান্না বান্না করে….সারাদিনের পরিশ্রমে শরীর ক্লান্ত বিধ্বস্ত থাকে, রান্নার স্বাদ সবদিন সমান হয়না….এদিক ওদিক হলেই বর বলে,”কিছুই ঠিক করে পারনা???….বাচ্চাটা রোগ নিয়ে জন্মেছিল তোমার জন্যে,নিজে হাজার রোগের বাসা,বাচ্চাকেও ছাড়লেনা!!!”….বলতে বলতে চোখে জল এলো….বললাম,”তুমি বলবে, তুমিও দায়ী…বাচ্চা কি আমার একার??”….মাধবী উপরের ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরল নীচের ঠোঁট…দু ফোঁটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল ঝকঝকে মার্বেলের মেঝেতে…

ভাবলাম আমরা পারি??….”এত ঘনঘন বাড়ি যেতে হবে??আর কারো কি বুড়ো মা বাপ নেই ??”, ” আরে, বেশি কথা বোল না তো”, “বাবা মা শেখালো কী??”…..এসব কথার প্রত্যুত্তর থাকে সবসময় আমাদের কাছে??….আমরা আসলে দু পয়সার মালিক হলেও ছেড়ে যাওয়ার কথা কিছুতেই ভাবতেই পারিনা, সংসারের মায়া কাজল আঁকা যে আমাদের চোখে!!!…. স্বামী সন্তানের, ভালোবাসা পাওয়ার কাঙাল আমরা….এতটাই যে, অপমান, অবিশ্বাস, অত্যাচারের পাহাড় পেরোতে পেরোতেও ভালোবাসা নামক “উইল ও দ্য উইস্প” ছুটিয়ে নিয়ে চলে আমাদের…রক্তাক্ত শরীর মন নিয়ে, মায়া রাক্ষসের পিছনে ছুটি, প্রেম নামক বিশুদ্ধ আবেগের স্বাদ ও গন্ধ লুটেপুটে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়, গুঁড়িয়ে দেয় বেঁচে থাকা,তবু ক্লান্ত হাতে নিজেকে জোড়া লাগাতে লাগাতে, কীসের আশায় যে আমরা ছুটি???…. সাহস করে বলতে পারিনা,”আলবিদা”… নতুন করে শুরু করার কথা, নিজের জন্যে, শুধুমাত্র নিজের জন্যে বেঁচে থাকার কথা ভাবতেও পারিনা…..ঘুমন্ত প্রিয়জনের মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে দেখি সারি সারি মায়া পিঁপড়ের ওঠানামা…

আমাদের শেখানো হয় ত্যাগ হল ভালোবাসা….আমরা শিখিনা,ভালোবাসায় একতরফা দুঃখ নেই,স্যাক্রিফাইস নেই,বিনিময় নেই….যদি তা থেকে থাকে তবে তা ভালোবাসা নয়, এক্সপ্লয়টেশন!!!….শোষণ!!!…..ব্ল্যাকমেল, অসম্মান করা, একপেশে অভিযোগ, আগলে রাখার চেষ্টা ভালোবাসা নয়……হতে পারেনা!!!….এক আকাশ মুক্তি হল ভালোবাসা…. শিকড়ের গভীরে অদম্য ,অমোঘ, অপ্রতিরোধ্য টান ভালোবাসা… হাসিমুখে,সসম্মানে বেঁচে থাকার নাম ভালোবাসা…
চোখে চোখ রাখলে বুকের ভিতর চলকে ওঠা রক্তস্রোত ভালোবাসা…
একবুক তৃষ্ণা নিয়েও না ছুঁয়ে,হাসিমুখে সমান্তরাল হেঁটে আসার নাম ভালোবাসা, …জ্যৈষ্ঠের নির্জন ভরদুপুরে , দেওয়ালে নোনা ধরা ঘরে, সকল দৃষ্টি পেরিয়ে,জরাজীর্ণ কাঠের টেবিলে হাত রাখা প্রিয় মানুষের বুড়ো আঙ্গুলের নীচে আবছা কালো তিলে নির্নিমেষ চেয়ে থাকা ভালোবাসা….কবে যে আমরা ছেড়ে আসতে, ফেলে চলে আসতে শিখবো!!!….

কবে যে আমরা,
“বড় আশা,বড় তৃষা,বড় আকিঞ্চন তোমারি লাগি
বড় সুখে, বড় দুখে,বড় অনুরাগে রয়েছি জাগি”

ছেড়ে গেয়ে উঠব,
“আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই
বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে” কে জানে??

হয়তো কোনদিন পারব না,হয়তো….

ছবি: অনিরুদ্ধ দাস ও গুগল