বঙ্কিম কথা

কথাসাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের যে ছবিটি সচরাচর দেখতে পাই সেটা বেশ রাসভারী এক মানুষের অবয়ব। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন একেবারেই উল্টো মানুষ। তার গম্ভীর মুখের আড়ালে লুক্কায়িত ছিলো হাস্যরসের ধারা।
বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম স্ত্রী গত হবার পর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন বেশ সুন্দরী। একবার বঙ্কিমচন্দ্র স্ত্রীকে নিয়ে ট্রেনে করে বেড়াতে যাচ্ছেন।স্ত্রী‘র মুখ ঘোমটায় খানিকটা ঢাকা। কিছুক্ষণ পরে বঙ্কিমচন্দ্র লক্ষ্য করলেন ওই কামররয় উপস্থিত এক যুবক আড়চোখে তাঁর স্ত্রীকে দেখে যাচ্ছে। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে বঙ্কিমচন্দ্র বেশ মজা পেলেন। একটা সময়ে সেই যুবকের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলেন। এবং যুবকটিকে প্রশ্ন করলেন, ‘কী কাজ করা হয়?’যুবকটি এমন প্রশ্নে একটু ঘাবড়ে গিয়ে উত্তর দিলো, ‘কেরাণীর চাকরি করি।’
উত্তর শুনে বঙ্কিমের পুনরায় প্রশ্ন, ‘কত টাকা মাইনে পাও?’ যুবকটি বললো, ‘বত্রিশ টাকা।’ বঙ্কিমচন্দ্র উত্তর শুনে বললেন, ‘তুমি যে এই মহিলার দিকে বারবার তাকাচ্ছ আমি তার ঘোমটাটা সরিয়ে দিচ্ছি। ভালো করে দেখে নাও। আমি একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট।আমার মাইনে আট‘শ টাকা। এছাড়া বইপত্র লিখে ভালোই রোজগার হয়। সব মিলিয়ে মাসিক আয় হাজার দেড়েক। এইসবই এই মহিলার পায়ে সমর্পণ করেছি। তবু তার মন পাইনি। আর তুমি সেখানে মাত্র বত্রিশ টাকার কেরানী হয়ে এর মন পেতে চাও!
সেই যুবকটি সেদিন ভীষণ লজ্জা পেয়ে পরের স্টেশনে অন্য কম্পার্টমেন্টে চলে যায়।
বঙ্কিমচন্দ্রের এমনই সব রসিকতার অসংখ্য গল্প আছে। এমনি আরেকদিনের গল্প। বঙ্কিমচন্দ্রের কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন আরেক নীলদর্পণ খ্যাত বিশিষ্ট নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র। বয়সের তফাৎ থাকলেও দুজনের মধ্যে ছিলো হাসি ঠাট্টার সম্পর্ক। ঠাট্টা করেই বঙ্কিমচন্দ্র সেদিন দীনবন্ধু মিত্রের জামার পেছনে একটা কাগজে কিছু একটা লিখে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিলেন। সেই লেখা পড়ে সেখানে উপস্থিত সবাই মুখ টিপে হাসছে। ঘটনাটা লক্ষ্য করে দীনবন্ধু প্রথমে অবাক হলেও পরে বুঝতে পারলেন বঙ্কিমচন্দ্র নিশ্চই কিছু একটা ঘটিয়েছেন। একটুও অপ্রতিভ না হয়ে দীনবন্ধু হেসে বঙ্কিমচন্দ্রের ছোট ভাই পূর্ণচন্দ্রকে ডেকে বললেন, ‘আমার পিঠে কী লেখা আছে একটু বলে দাও না ভাই। কারণ হাতির পিঠে মশা বসলে তো আর হাতি দেখতে পায় না। তার কপালটাই মন্দ।’
বঙ্কিমচন্দ্র কথাটা শুনে রসিকতা করতে ছাড়লেন না। তিনি বললেন, ‘দেখতে পায় না বলে তেমন জীবকে লোকে হস্তিমূর্খ বলে।’
আরেকবার এই দীনবন্ধু মিত্রের সঙ্গেই চূড়ান্ত রসিকতা করেছিলেন বঙ্কিম। দীনবন্ধু মিত্র কাজ করতেন ডাক বিভাগের উঁচু পদে। কাজের সূত্রে তাকে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো। একবার তিনি কাজের সূত্রে গেছেন আসামের কাছাড় অঞ্চলে। সেখান থেকে বন্ধু বঙ্কিমচেন্দ্রের জন্য একজোড়া কাপড়ের জুতা কিনে নিয়ে এলেন তিনি। একজন লোকের হাতে জুতার প্যাকেট দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়িতে। সঙ্গে একটা চিরকুটে লিখে দিলেন, ‘কেমন জুতো?’
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেই চিরকুট পড়ে হাসলেন। তারপর উত্তর লিখে আবার পাঠিয়ে দিলেন সেই লোকের হাতেই। সেখানে লেখা ছিলো, ‘তোমার মুখের মতোই।’

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ মনীষীদের রসিকতা।
ছবিঃ গুগল