বিকাশ’দা : সে ছিল একদিন আমাদের!

স্নিগ্ধা চক্রবর্তী

 (পশ্চিমবঙ্গ থেকে): আসামের এক কোনায় জাটিঙ্গা নদীর পাড়ে আর বরাকের কোলে বড়খলা গ্রামে আমদের বাড়ী ছিল। আমার জন্ম, স্কুল সবটাই ওখানে। তখন সবে পাঠশালা স্কুলে পড়ি। বাড়ীর এক পাশেই পাঠশালা স্কুল। আমাদের বাড়ীর জানালাটা ছিল খুব মোক্ষম জায়গায়। জানালা দিয়ে সব দেখা যেত। রাস্তা দিয়ে কেউ গেলেই আমাদের কত কথা বলা হয়ে যেতো। বন্ধুরা স্কুলে যাবার সময় আমরা জানা

স্কুলের গেট

লা দিয়ে দেখে তার পর বেরোতাম।মা জানালা দিয়েই দেখতে পেতেন আমরা স্কুলে মার খাচ্ছি কি না। সারাক্ষন ভয়ে থাকতাম। স্কুলে ইনজেকশন দিতে আসলে তো আর কথাই ছিল না। মা জানালা দিয়েই বলতেন, ঠিক করে দিতে। এমনি কত গল্প ওই জানালাকে নিয়ে আছে। ছোটবেলা থেকেই আমার স্বভাব-ই ছিল সবার সঙ্গে কথা বলা, মিশে যাওয়া, ঠাট্টা ইয়ার্কি মারা। লজ্জা বলে কোন বিষয় আমি জানতাম না।

আমাদের গ্রামে একটা হাইস্কুল ছিল আর যেহেতু আমাদের গ্রাম খুবই ছোট, তাই আমাদের গ্রামে হাই স্কুলের টিচাররা বাইরে থেকে আসতেন। একটা তিন রুমের বোর্ডিং ছিল। এরকম-ই কোন সময়ে সালটা  মনে নেই, সেই বোর্ডিং-এ তিন জন টিচার এলেন বাইরে থেকে।মনে হয় আমাদের একমাত্র শহর শিলচর থেকেই এসেছিলেন- এখন আর মনে করতে পারছি না। একজন অঙ্কের, একজন মনে হয় বিজ্ঞান আর আরেক জন মনে হয় হিন্দির টিচার ছিলেন।

আমাদের বাজারে ঢোকার আগেই বাস স্ট্যান্ডে তখন একটি মাত্র চা-মিষ্টির দোকান ছিলো। তারা রোজ বিকালে  ওখানে যেতেন চা খেতে। আমাদের বাড়ীর সামনে দিয়েই সেই মেইন রাস্তাটা  চলে গেছে। তারা যখন ওই দোকানে যেতেন, তখন আমি আর আমার মেজদি রাস্তায় হাটতাম। আমি ছোট ছিলাম তাই তারা আমাকে আদর করতেন। আর আমার তো কোন লজ্জা-র বালাই নেই, আমি ও তাদের সঙ্গে মিলে গেলাম। এমনি করেই ওই তিন জনের মধ্যে একজনকে বিকাশদা বলে ডাকতে শুরু করলাম।অন্যদেরও দাদা বলে আপন করে নিলাম।  তারাও  আমাকে মাঝে মাঝে রসগোল্লা এনে দিতেন খাবার জন্য। কখনো বা ওই দোকানে নিয়ে  যেতেন, ওখানে মিস্টি-বিস্কুট খেয়ে বাড়ি চলে আসতাম।  বাড়িতে আমার মা তখনো বেঁচে ছিলেন। মা আর বড়দি  আমাকে খুব বকাবকি করতো। বলতো, উনাদের সঙ্গে তোর কোন আলাপ পরিচয় নেই আর তাদের সঙ্গেই তুই ঠাট্টা করিস? আবার তাদের সঙ্গে গিয়ে দোকানে মিষ্টিও খেয়ে আসিস!

আমাদের বাড়ি

সত্যি বলতে কী, আমি ভাবতাম তাতে কি হয়েছে! আমার তো তাদের সঙ্গে রোজই রাস্তায় আলাপ হয়। আমি তো তাদেরকে ততোদিনে খুব ভাল করেই চিনে গেছি। এই করতে করতে তাদের কে একদিন আমি বাড়ি নিয়ে এলাম। বাড়ির লোকেদের তাদের সঙ্গে পরচয় করিয়ে দিলাম। মনে রাখতে হবে আমার বয়েস তখন মাত্র ৬-৭ বছর হবে। তার পর ধীরে ধীরে তারা আমাদের বাড়িতে নিত্য যাওয়া আসা শুরু করলেন।তারপর যা হতো আমাদের ছোটবেলায় … আমরা তাদের তিনজন কেই একসময় ভাইফোঁটা দিলাম। তারা হয়ে গেলেন আমাদের পরিবারের লোক। তারপরেও আমার ওদের সঙ্গে বিশেষ করে বিকাশদা‘র সঙ্গে কিন্তু ওই জানালা দিয়ে রোজ কথা-ঠাট্টা হতেই থাকে। এই যেমন, উনি কোন একদিন আমার সঙ্গে রাস্তায় কথা বলেননি, তাতেই আমার যত্ত অভিমান। আমি উনাকে জানালা দিয়ে বলতাম আড়ি…আড়ি আর উনি বলতেন কচু…কচু। কী অদ্ভুত ভাবে এই সম্পর্কটা এভাবেই দীর্ঘায়িত হতে থাকলো।

ধীরে ধীরে আমি পাঠশালা স্কুল শেষ করে ক্লাস ফোরে ভর্তি হবো হাইস্কুলে। সেখানেই বিকাশদা টিচার। আর আমাদের এরকম নিয়ম ছিল যে, যে আগে ভর্তি হবে তার রোল নম্বর আগে হবে। আর আমার খুব ইচ্ছা যে আমি ফার্স্ট হব ।এই তো সুযোগ – বিকাশদা আছেন। আমার আবদার যে আমি কবে ভর্তি হবো সেই সব জানি না… মানে ওগুলো তো দিদি…বাবা করবে। কিন্ত আমার রোল নম্বর এক হওয়া চাই। ব্যস, বিকাশ দা কে ধরে আমার বায়না হলো আমাকে এক নম্বর করে দিতে হবে। গ্রামের স্কুল। সবাই সবাই কে চেনে আর অত নিয়ম টিয়ম ছিল না। বিকাশদা ও বেশ আমার নামটা ক্লাস ফোরে‘র রেজিস্টারে এক নম্বরে লিখে রাখলেন।(ওই একবার  জীবনে আমি প্রথম হয়েছিলাম, তার পর আর আমি কোনদিন প্রথম হই নি) স্কুলের সবাই মোটামুটি জানে আমার আর আমাদের বাড়ীর সঙ্গে বিকাশদার সম্পর্কের কথা।

এখন স্বুলের নতুন এবং পুরাতন বিল্ডিং

স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম। বিকাশ’দা উচু ক্লাসে পড়াতেন। বিকাশ’দা বাড়িতে এসে রোজ ই বলতেন, ‘এখন কি করবে,এই স্কুলে তো আমাকে স্যার বলতে হবে।’ সত্যিই তো, স্কুলেতো আর বিকাশ’দা বলা চলবে না। আর আমার জেদ ছিল যে আমি কোন অবস্থাতেই স্যার ডাকছিনা  উনাকে। এই নিয়ে রোজ আমাকে ক্ষ্যাপাতেন।  এমনি করেই চলছিলো।  কিন্তু একদিন আমাদের স্কুলে বার্ষিক খেলা চলছে, কোন কারনে, সেদিন ক্লাস টিচার সকালে রোল কল করেননি। হঠাৎ দেখি বিকাশ’দা রেজিস্টার নিয়ে হাজির আর মুচকি মুচকি হাসছেন। এখন আমিই বা কি করি? উনি যখন রোল কল করলেন আমাকে আমতা আমতা করে হলেও বলতে হল প্রেজেন্ট স্যার!  ব্যস, আমি তো হেরে যাবার লজ্জায় শেষ। জেদ তো বজায় থাকলো না।  সেদিন বিকাশ’দারা তিন জনই বিকালে আমাদের বাড়ি এসেছেন যথারীতি। আর এসেই হাঁক ছাড়লেন “কই, স্যার কই”। আর কে পায় আমাকে… স্যার বলার লজ্জায় পেয়ে বসলো। ওটা শুধু লজ্জা না, কি হেরে যাওয়ার লজ্জা জানি না আজো। এর পর বিকাশ দা আমাকে দেখলেই স্যার বলে খ্যাপাতেন আর আমি ও লজ্জায় কুঁকড়ে যেতাম। এই করে দিন যেতে লাগল। বিকাশ দা আসতেন।গ্রামে তাবু খাটিয়ে যাত্রা হতো। আমাদেরকে নিয়ে গ্রাম যাত্রা দেখাতেন বিকাশ’দা।এবার আমিও বড় হয়ে উঠতে লাগলাম।

আমাদের মা মারা গেলেন। আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। জীবনটা একটু এলোমেলো হয়ে গেলো।তখনও বিকাশ’দারা ছিলেন আর সেই সম্পর্কও আছে – তারা আমাদের পরিবারেরই তো সদস্য! ইতিমধ্যে বিকাশ’দা গ্রামেরই  আমাদের আরেক প্রতিবেশী দিদিকে বিয়ে করবেন বলে ঠিক করলেন। আসলে তখন তো এত প্রেম-ট্রেম বুঝতাম না।বিকাশ’দা নিজে এসেই জানালেন তার বিয়ের খবর। আবার ওই দিদির পরিবারের সঙ্গে আমাদের খুব ঘনিষ্টতা। আমার বাবা‘র যখন নিজের বাড়ি ছিল না, তখন ওদের বাড়ীতে থাকতেন।

বড়খলা পুরাতন বাজার

যাই হোক বিকাশ’দা বিয়ে করলেন। বিয়ে করে তো আর বোর্ডিং এ থাকা যায় না, তাই আমাদের বাড়িতেই একটা ঘর ও রান্নাঘর নিয়ে ভাড়া ওঠলেন। আমরা ভাই ফোঁটা আসলে বিকাশদা‘কে চিরাচরিত ভাবে আসতে বলি। কিন্তু বিকাশ’দা আর আগের মত মিশতে পারেন না। তার ব্যক্তিগত জীবন শুরু হলো আর আমারও বিকাশ’দার সঙ্গে সেই ছোট্টবেলার মধুর সম্পর্কের ইতি টানতে শুরু হলো। কথা-না বলার সম্পর্ক তৈরী হলো। কিছুদিন পর তারা তাদের জায়গায় বাড়ি করে চলে গেলেন। তারপর গেলেন শিলচর শহরে। কবে যে বিকাশ’দাকে শেষ দেখেছি আজ আর মনে নেই।  আমার কর্ম আর ব্যক্তিগত জীবনের দৌড়ের যাঁতাকলে পড়ে এইসব স্মৃতি হারিয়ে যেতে থাকলো। প্রায় ৪৫ বছর পর হঠাৎ সেদিন আমার বড়’দি শিলচর থেকে ফোনে বলল যে বিকাশ’দা মারা গেছেন। আর আমি সেই দিন আবার সেই ৪৫-৪৬ বছর আগে ফিরে চলে গেলাম।কিছু বুঝে উঠতে পাররাম না শুধু বুঝতে পারলাম, আসলে স্মৃতি হারিয়ে যায় ক্ষনিকের জন্য, কিন্তু মুছে যায় না। মনে হচ্ছিলো সে-ও ছিলো এক দিন আমাদের!

ছবি: লেখক