গোপন পত্রিকা…

ডা. গিলবার্ট হ্যাডও ১৮৫৭ সালের মার্চ মাসে বৃটিশ পদানত ভারতে বসে ইংল্যান্ডে তার বোনকে চিঠি লিখছেন, ‘অর্থটা কেউ জানে না। কেউ জানে না কোত্থেকে এর শুরু। কিন্তু ঘটনা ঘটছে। কেউ জানে না এটা কোনো বিশেষ সংস্কৃতি অথবা আচারের অংশ কি না। কিন্তু গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়ছে চাপাতি রুটি। এটাকে ‘চাপাতি বিপ্লব’ বলা যেতে পারে’।
পরে ইতিহাস থেকে জানা যায়, এই চাপাতি রুটির বিপ্লব আসলে ভারতে সিপাহী বিপ্লবের অংশ ছিলো। বিপ্লবী সিপাহীরা গোটা ভারতে তাদের গোপন খবরাখবর চালাচালির জন্য এই বিশেষ ধরণের হাতে তৈরী রুটিকে বেছে নিয়েছিলো। রুটি ছিলো তাদের বার্তা। গ্রাম থেকে গ্রামে, শহর থেকে শহরে এই রুটি নিয়ে রাতের অন্ধকারে ভ্রমণ করতো বার্তাবাহকরা। এক জায়গার সীমানা অতিক্রম করে তারা সেই ‘রুটি- বার্তা’ তুলে দিতো অন্য আরেকজন বাহকের হাতে। সেখানেই তাকে বলে দেয়া হতো আরেকজনের কাছে সেটা পৌঁছে দিতে। সেই রুটিই ছিলো বিপ্লবীদের গোপন সংকেত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বার্তাবাহকরা তাদের মাথার পাগড়ির মধ্যে লুকিয়ে এই রুটি বহন করতো।
এই চাপাতি চালাচালির বিষয়টা বৃটিশ শাসকদের প্রথম নজরে আসে ১৮৫৭ সালেই। কোনো এক গ্রামের এক চৌকিদার একটি চাপাতি নিয়ে হাজির হয় থানার কর্তার কাছে। সেই পুলিশ অফিসার চাপাতি নিয়ে হাজির করে বৃটিশ বড় কর্তার কাছে। কিন্তু সেই চাপাতি ছিঁড়ে টুকরো করেও তারা রহস্যের কোনো সমাধান টানতে পারে না। সেই রহস্যের সমাধান এনে দেয় সিপাহী বিদ্রোহ। ইংরেজ শাসকরা বুঝতেই পারে নাই চাপাতির মাধ্যমে সিপাহীরা দীর্ঘ সময় ধরে খবর চালাচালি করে তৈরী করেছিলো বিদ্রোহের পটভূমি। তবে এই সেই চাপাতি দিয়ে বিদ্রোহী সিপাহীরা ঠিক কী ধরণের বার্তা আদানপ্রদান করতো সে সম্পর্কে কিন্তু আজো নির্দিষ্ট করে কিছু জানা যায় নি।
একসময় পৃথিবীর নানা দেশে বিপ্লব, বিদ্রোহ আর স্বাধীনতা সংগ্রামে এ ধরণের গোপন বার্তাবহনকারী মাধ্যম অথবা পত্রিকা বিখ্যাত হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে সেই পত্রিকা অথবা মাধ্যমটি স্থান করে নেয় ইতিহাসের পাতায়। পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায় ফরাসী বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, নকশাল আন্দোলন, ষাটের দশকে ইউরোপে ছাত্র অভ্যুত্থান, লাতিন আমেরিকায় বিপ্লব-সব জায়গাতেই এ ধরণের পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা ছিলো। গোপন বিপ্লবী সংগঠনগুলোর মুখপত্র হিসেবে এ ধরণের পত্রিকাগুলো হয়ে উঠেছিলো মানুষের কন্ঠস্বর।
জার বিরোধী রাজনীতি করার অপরাধে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনকে গ্রেফতার করে পাঠিয়ে দেয়া হয় সাইবেরিয়ার নির্বাসন ক্যাম্পে। সেই ক্যাম্পে বসে লেনিন ভাবছিলেন রাশিয়া জুড়ে একটি শক্তিশালী মার্কসবাদী পার্টি গড়ে তোলার কথা। লেনিন তখন বুঝতে পারছিলেন একটা পত্রিকা বের করা ছাড়া রুশ দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মার্কসবাদী সংঘ ও সার্কেলগুলোকে এক করা সম্ভব নয়। কিন্তু তখন রুশদেশে এই ধরনের পত্রিকা আইনসংগতভাবে ছাপানো সম্ভব ছিলো না। তাই লেনিন সিদ্ধান্ত নিলেন গোপনে পত্রিকা প্রকাশের। তিনি কথা বললেন রাজনৈতিক সঙ্গী প্লেখানভ, আক্সেলরভ ও ডি জাসুলিচের সঙ্গে। সিদ্ধান্ত হলো প্রকাশ করা হবে ‘ইস্ক্রা’, যার অর্থ স্ফুলিঙ্গ। নির্বাসন থেকে ফিরে লেনিন এই পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তুতি নিতে চলে গেলেন জার্মানির মিউনিখে। পত্রিকা বের করার সমস্ত আয়োজন চলতে থাকলো সংগোপনে।

নকশাল আন্দোলনের আগুন ছড়িয়োছিলো যে পত্রিকা

ইস্ক্রা‘র আত্নপ্রকাশের জন্য লেনিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলেন। প্রথম সংখ্যা প্রকাশের মাস তিনেক আগে তিনি ন্যুরেমবার্গে এক সহযোদ্ধাকে চিঠিতে ইস্ক্রা সম্পর্কে লেখেন, ‘আমাদের সমস্ত জীবন রস ঢালা চাই আসন্ন প্রসব বাচ্চাটির পুষ্টির জন্য।’ অবশেষে লেনিনের অপেক্ষার পালা শেষ হলো। ১৯০০ সালের ডিসেম্বরে জার্মানি থেকে প্রকাশিত হলো ‘ইস্ক্রা’। ইস্ক্রার প্রথম সংখ্যার পাতায় লেখা হয়, ‘স্ফুলিঙ্গ থেকেই আগুন জ্বলবে।’
রাশিয়ার বাইরে থেকে গোপনে সীমান্ত পার হয়ে আসতো ইস্ক্রা। কোটের হাতায় সেলাই করে, কিংবা সুটকেসে গোপন প্রকোষ্ঠ তৈরি করে পত্রিকা বহন করতো ইস্ক্রার এজেন্টরা। ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিক মেহনতি মানুষ ও মার্কসবাদী বিভিন্ন ছোট ছোট গ্রুপের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো সেই গোপন পত্রিকা। লেনিন যেভাবে ভেবেছিলেন, ঠিক সেভাবেই রাশিয়ায় সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভিত তৈরি করে দিলো ইস্ক্রা। লেনিন ইস্ক্রাকে পরিণত করলেন পার্টির ভেতরে সুবিধাবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের অস্ত্রে।
রুশ বিপ্লবের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমনই গোপন গেরিলার মতো আরেকটি পত্রিকার নাম-‘প্রাভদা’। লেনিনের পরামর্শে স্টালিন, অলমিন্সকি ও পলেতাইভ প্রাভদা নামের দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। ‘প্রাভদা’ কথার অর্থ সত্য। ১৯১২ সালের ২২ এপ্রিল বের হলো প্রাভদার প্রথম সংখ্যা। আর আত্নপ্রকাশের পরপরই শ্রমিকদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকলো এই পত্রিকা। অথচ, প্রকাশনার প্রথম বছরেই প্রাভদা ৪১ বার বাজেয়াপ্ত হয়েছে, এর সম্পাদকেরা ৩৬ বার সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, এবং লেখার জন্য তাঁরা জেল জুলুমের শিকার হয়েছে। জার আমলে প্রাভদাকে কমপক্ষে আট বার নাম বদল করতে হয়েছে। কখনো প্রভদা নাম বদলে হয়েছে রাবোচেয়ে প্রাভদা (শ্রমিকদের সত্য), আবার কখনো সেভেরনায়া প্রাভদা (উত্তরের সত্য)। এমনি অনেক নাম পাল্টে প্রাভদা পত্রিকা গোপনে রিাশিয়ার মেহনতী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে বিপ্লবের বার্তা আর রাজনীতির সঠিক পথের নিশানা।
ইংরেজিতে এ ধরণের পত্রিকাকে বলা হয় ‘রেভোলিউশনারী প্রেস’ অথবা আন্ডারগ্রাউন্ড পাবলিকেশন্স। বাংলায় বলা যেতে পারে বিপ্লবী ছাপাখানা অথবা গুপ্ত পত্রিকা। পৃথিবীর দেশে দেশে বিপ্লব অথবা যুদ্ধের সময় চরমপন্থী অথবা সশস্ত্র সংগঠনগুলোর এরকম অসংখ্য পত্রিকা প্রকাশের দৃষ্টান্ত আছে। ওই সংকটকালে এ ধরণের পত্রিকা বিপন্ন মানুষের মনে সাহস যোগায়। তাদেরকে জানিয়ে দেয় সঠিক খবর। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বেশ কয়েকটি পত্রিকা এবং বহু সাংবাদিক দেশের ভেতরে এবং বাইরে থেকে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করেছে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং যুদ্ধ চলার সময় সাহসী সংবাদ পরিবেশনের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লেখার জন্য পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে শহীদ হন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। সে সময় বেশ কয়েকটি পত্রিকা মুক্তাঞ্চল এবং ভারত থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে। এগুলোর অধিকাংশ আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র ছাড়াই প্রকাশিত হয়। পত্রিকাগুলো সাপ্তাহিক, পাক্ষিক বা মাসিক হিসেবেই প্রকাশিত হতো। এসব পত্রিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো স্বাধীন বাংলা, জয় বাংলা, সোনার বাংলা, বাংলার বাণী, বিপ্লবী বাংলা, দ্য নেশন। এসব পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধ এবং যোদ্ধাদের সাফল্যের খবরই বিশেষ ভাবে প্রকাশ করা হতো। সেইসব পত্রিকা মানুষের হারানো মনোবলকে ফিরিয়ে আনতো।
‘রেভোলিউশন দ্য প্যারিস’ পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিলো ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের সময়ে। পত্রিকাটি বেঁচে ছিলো ১৭৯৪ সাল অবধি। সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘রেভোলিউশন দ প্যারিস’ সম্পাদনা করতেন লুইস মারে প্রুদোহোমে নামে এক ব্যক্তি। ইতিহাস বলে, ফরাসী বিপ্লবের নানা ঘটনা নিয়ে তখন এই পত্রিকায় আঁকা ছবি প্রকাশিত হতো। সেসব ছবিই এখনো ফরাসী বিপ্লবের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ফরাসী বিপ্লবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপ্লবীদের নানা ধরণের গোপন বার্তা আর ঘটনার খবর এই পত্রিকাটিতে দ্রুত ছাপা হতো। বাস্তিল দুর্গ আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই এই পত্রিকাতে প্রথম ছাপা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গোপন ছাপাখানা

ফলে ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের হাতে হাতে ঘুরতে থাকে ‘রেভোলিউশন দ্য প্যারিস’।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সন্ত্রাসবাদী, বিপ্লবী গুপ্ত সংগঠনগুলো তাদের বার্তা প্রচারের জন্য প্রকাশ করতো বেশ কয়েকটি পত্রিকা। সেসব কাগজের মধ্যে অনুশীলন সংগঠনটির মুখপত্র ছিলো অনুশীলন পত্রিকা। যুগান্তর নামে বিপ্লবীদের গোপন সংগঠনের ছিলো গুপ্ত প্রকাশনা।
ভারতে নকশাল বাড়ি আন্দোলনে তরুণ বিপ্লবীদের অবশ্য পাঠ্য হয়ে উঠেছিলো ‘দেশব্রতী’ পত্রিকা। পত্রিকাটিতে সেই সময়ে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী শহীদ সরোজ দত্তের ক্ষুরধার লেখনী বিপ্লবের আগুনকে প্রবলভাবে প্রজ্বলিত করেছিলো।
একই ভাবে ষাটের দশকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডে তরুণ চরমপন্থী বিপ্লবীরা প্রকাশ করেছিলো ‘দ্যা ব্ল্যাক ডুয়ার্ফ’ নামে একটি পত্রিকা। বুদ্ধিজীবী ও বিপ্লবী তারিক আলীর সম্পাদনায় পত্রিকাটি ওই সময়ে গোটা ইউরোপে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। ১৯৬৮ সালের মার্চ মাসে লন্ডন শহরে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী ছাত্র অভ্যুত্থানের সময় তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো দুই পৃষ্ঠার পত্রিকাটি। রাজপথে তরুণরা যখন তাদের প্রতিবাদ জানাতে নেমে এসেছে হাজারে হাজারে তখন একদিনে ‘ব্ল্যাক ডুয়ার্ফ’ ছাপা হয়েছিলো ২৫ হাজার কপি। কিন্তু তখন লন্ডন শহরের পত্রিকা হকার সমিতি এর একটি কপিও বহন করতে রাজি হয়নি ভয়ে। পরে পত্রিকা সংশ্লিষ্ট মানুষরা নিজেরাই হাতে হাতে পত্রিকা বিলি করে মানুষের মধ্যে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানী অধিকৃত ইউরোপের ফ্রান্স, বেলজিয়াম, পোলান্ড, নরওয়েসহ আরো কয়েকটি দেশে তো সেখানকার আন্ডারগ্রাউন্ড প্রতিরোধ সংগঠনগুলো নানা ধরণের পত্রিকা আর প্রচারণাপত্র প্রকাশ করে রীতিমত ‘বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধক্ষেত্র’ তৈরী করেছিলো। জার্মানদের নজর এড়িয়ে এসব পত্রিকার পাতায় সশস্ত্র যুদ্ধ, রাজনৈতিক আলোচনা সবকিছুই আলোচিত হতো। সেই সময়ে ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত ‘ডিফেন্সি দে লা ফ্রান্স’ আলোচিত হয়ে উঠেছিলো। এছাড়া ফ্রান্স থেকে ‘রেজিসটান্স’, ‘কমব্যাট’ ও ‘লিবারেশন’ নামে তিনটি পত্রিকা জার্মান দখলদারদের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। বেলজিয়ামের গোপন গেরিলা যোদ্ধাদের প্রধান মুখপত্র ছিলো ‘লে সইয়ার’। নরওয়ে থেকে তখন প্রকাশিত হতো ‘লন্ডন-নাইয়েট’। এই পত্রিকাটি এতোটাই শক্তিশালী ছিলো যে এর লেখা থেকে শুরু করে সরবরাহ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলো ১২‘শ থেকে ১৫‘শ মানুষ।১৯৪২ সালে জার্মানরা নরওয়েতে আইন করেছিলো এ ধরণের গুপ্ত সংগঠনের পত্রিকা পড়ার বিরুদ্ধে। তাদের অভিযানে তখন গ্রেফতার হয়েছিলো তিন থেকে চার হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে ৬২ জনকে জার্মানরা গুলি করে হত্যা করে।

কারিন আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া
ছবিঃ গুগল