উত্তর সিকিমের ডায়েরি

শ্বেতা চট্টোপাধ্যায়

নাগরিক জীবনের কেজো ব্যস্ততায় জুড়ে থাকার মুহুর্ত থেকে একটু অবকাশ পেলেই আমাদের ভ্রমণ পিপাসা উদ্বেল হয়ে ওঠে..। মানসিক আরামের সাথে সাথে এ যেন আজকাল পুনরায় কাজে মনোযোগ যোগানোর অব্যর্থ ওষুধ হয়ে উঠেছে..।  এই ভাবনা থেকেই আমরা মে মাসের শেষ দিকে পাড়ি দিয়েছিলাম উত্তর বঙ্গের পার্শ্বস্থ এলাকায়..। বরফ ঢাকা পাহাড় আমার বরাবরের পছন্দের ছুটি কাটানোর জায়গা, তাই এবছরও গরমের ছুটি তে গন্তব্য ছিল পাহাড়ী অরগ্যানিক রাজ্য সিকিম..।

শিয়ালদহ থেকে পদাতিক এক্সপ্রেস এ চড়ে পরদিন সক্কাল সক্কাল এন.জে.পি..। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া নিয়ে রাজধানী গ্যাংটক এর উদ্দেশ্য রওনা দিলাম আমরা..। পথ দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টার বেশি, তার সাথে পাহাড়ী পথের ক্রমোচ্চ বাঁকের সবুজ সৌন্দর্য ভালোলাগায় জারিত করছিল আমায়..। দীর্ঘ রাস্তা অতিক্রম করে আমরা পৌঁছেছিলাম রাজধানী গ্যাংটক শহরে..। ঝাঁ চকচকে, প্লাস্টিক মুক্ত এককথায় গোছানো পাহাড় ঘেরা গ্যাংটকের সৌন্দর্য এককথায় অনবদ্য..। শহরের প্রাণ কেন্দ্র এম জি মার্গের রাস্তাঘাট সন্ধের আলোয় ঝকঝক করছিল..। রঙ বেরঙের বাহারী শীতের জিনিসপত্র, শপিং মল, ফুড কোর্ট সহ ভিন্ন স্বাদের রেস্তোরাঁ আর গোছানো নগর পরিকল্পনা চোখে পড়ার মতো..। নানা রকম কেনাকাটা, খাওয়া দাওয়া আর বেড়ানো মিলিয়ে বেশ সুন্দর ভাবেই কেটেছিল সময় টা..।

পরদিন পরিকল্পনা মতো রওনা দিলাম লাচেন এর উদ্দেশ্যে । উত্তর সিকিমের এদিকের পর্যটন কেন্দ্র গুলোতে প্যাকেজ ট্যুর এ যাওয়ারই চল বেশি..। যাওয়ার পথে গাড়িতেই পরিচয় হলো আরো দুটি পরিবারের সঙ্গে, যারাও আমাদৃর আমাদের মতো একই পথের যাত্রী..। গ্যাংটকের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে শুরু হলো আমাদের যাত্রা, পথের দূরত্ব প্রায় একশো কুড়ি কিমি’র মতো..। একটু পর থেকেই শুরু হলো আঁকাবাঁকা পাহাড়ী কোল বেয়ে ক্রমশঃ আরো উঁচুতে ওঠার পথ..। তবে অবাক হচ্ছিলাম এটা ভেবে যে, অত উঁচুতেও তখনও কেন কাঙ্খিত ঠান্ডা পাচ্ছিলাম না ! এভাবে চলতে চলতে একসময় বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে এলো যেন ঝুপ করে..। কেন জানিনা, পাহাড়ের সন্ধে সমতলের থেকে বড্ড অন্যরকম লাগে আমার, কেমন মন খারাপ করা, নিঝুম সবুঝ পাহাড় বেয়ে দিনের শেষটুকু নিভে যাওয়ার দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করেছিলাম আমি..। তারপর রাতের পাহাড় ধরে চলতে চলতে সে এক অন্য অভিজ্ঞতা..। কোনো দিকে মন না দিয়ে এক ভাবে শুধুই সামনের গাড়িকে অনুসরণ করে ঐ সরু বাঁক বেয়ে এগিয়ে চলার সময় ড্রাইভারের হাতেই প্রাণ সঁপে দিয়ে বসে থাকার যে অভিজ্ঞতা, তা যার হয়েছে, একমাত্র সেই জানে..।

রাত প্রায় নটা নাগাদ আমাদের গাড়ি লাচেন পৌঁছল..। দীর্ঘ পথ পেরোনোর ধকলে আমরা প্রায় সকলেই বিধস্ত, কোনোমতেই বিছানাকে আঁকড়ে ধরলাম, কিছুক্ষণ পর থেকে বেশ ভালো রকম ঠান্ডার উপস্থিতি টের পাওয়া গেল, একটু পরে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে গিয়ে হোটেলের ব্যালকনি তে দাঁড়িয়ে দেখলাম, জায়গা টা আসলে চারদিক থেকে পাহাড় ঘেরা..। আর সেই সাথে ঐ অন্ধকারেও চোখে পড়ল হালকা মেঘের আস্তরণ পাহাড়ের বুকটা যত্ন করে মুড়ে রেখছে..। সেই রাতে খাওয়া দাওয়া করে নির্দেশ এলো ভোর বেলা বেরোনোর জন্য প্রস্তুত থাকার কথা, গন্তব্য গুরুদোঅংমার লেক..। যা আমার আসলে এই পুরো বেড়ানোর মধ্যে মূল আকর্ষণ ছিল..।

ভোর বেলা উঠে কাঁপতে কাঁপতে গায়ে প্রচুর শীতের পোষাক চাপিয়ে রওনা হওয়ার আগে হোটেলের ব্যালকনি তে দাঁড়িয়ে বরফ ঢাকা পাহাড় চূড়ো দেখার সৌভাগ্য হলো, সূর্যদেবের আগমন বার্তা পেয়ে আকাশ তখন রাঙা হচ্ছে, এমন দৃশ্য দেখে মন ভালো না হয়ে যায় কোথায়..!?

সেদিনের পথ ও ছিল বেশ দীর্ঘ..। ভোরের আলো জোরালো হওয়ার সাথে সাথে আমাদের গাড়িও আরো উঁচুতে উঠতে শুরু করল, সে বাঁক আরো চড়াই, ঠান্ডাও বেশ বেশি..। পথ বেশ রুক্ষ, চড়াই উত্ডাই, আর পাথুরে, তাই ঝাঁকুনিও ছিল প্রবল, সৈন্য বাহিনী নিয়ন্ত্রণিত এমন পথের ওপর দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না..। মাঝেই একটা জায়গায় কিছুক্ষণের জন্য গাড়ি থেমেছিল প্রাতঃরাশের জন্য..। পাহাড়ী দুর্গম এলাকায় প্রাতঃরাশের উপকরণ ও খুবই সাধারণ, তাই পাউরুটি, জেলি, ওমলেট আর কফি সহযোগে আমাদের খাওয়া শেষ করে গাড়ি আবার চলতে শুরু করল..। এরপর থেকে উচ্চতা জনিত শ্বাসকষ্টের পথের অভিজ্ঞতা..। কোথাও ভীষণ পাথুরে আবার কোথাও সুন্দর মসৃণ আবার কোথাও ভীষণ ধুলোর মিশ্রিত..। কিন্তু, এসবের মাঝেও বরফ ঢাকা দুধ সাদা পাহাড়ের  দৃশ্য ভীষণ মন ভালো করে দিচ্ছিল..। চলন্ত গাড়ি থেকেই মোবাইল ক্যামেরায় বন্দি করার চেষ্টা করেছি প্রচুর..।

দীর্ঘ পথ পেরোনোর পরে অবশেষে পৌঁছনো গেল কাঙ্ক্ষিত গুরুদোঅংমার হ্রদ এ..। সে এক অদ্ভুত স্বর্গীয় শোভা..। আকাশের স্বচ্ছ নীল রঙ আর পাহাড়ের তুষার শুভ্রতার ছায়া জলে তার প্রতিরূপ তৈরি করেছে, হ্রদের আকারের অনেকটা খাঁজ থাকায় জলের রঙ এক এক দিক থেকে এক এক রকম দেখাচ্ছে..। বিস্ময়কর এই সৌন্দর্য সৃষ্টির জন্য মনে মনে কুর্ণিশ জানালাম সৃষ্টিকর্তা কে..। হ্রদে পৌঁছে 17500 ফুট এর বেশি উচ্চতায় পৌঁছনোর কারণে শ্বাসকষ্টের ভয় বেমালুম ভুলে গেছিলাম আমি, কোনো রকম সমস্যা ছাড়াই বেশ অনেকক্ষণ ছিলাম, চারদিকে পাহাড় ঘেরা এই সৌন্দর্যের ছবি এত সহজে বোঝানো বেশ মুশকিল আমার পক্ষে..!

এরপর শুরু হলো ফেরার পালা, একই দীর্ঘ পাথুরে পথ অতিক্রম করে ফেরার সময় বেশ কষ্ট পেতে হয়েছিল আমায়..। মাঝ দুপুর পেরিয়ে হোটেলে পৌঁছে কোনো ক্রমে দুপুরের খাবার খেয়ে পরবর্তী গন্তব্যের জন্য প্রস্তুত হতে বলা হয়েছিল, কারণ ঐ প্যাকেজ ট্যুর এর ওটাই নাকি বৈশিষ্ট্য..। দীর্ঘ পাহাড়ী পথ বেয়ে আমরা সেই রাতে এসে পৌঁছেছিলাম লাচুঅং এ..। রাত্রিবাসের ব্যবস্থা ছিল হোটেলে..।

সারাদিনের ধকল সামনে সেই রাত্তিরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়েছিলাম..। বলা হয়েছিল, পরদিন ইযুমথাঅং ভ্যালি আর জিরো পয়েন্ট যাওয়া হবে..। সেই মতো সক্কাল সক্কাল ঘুম ভাঙতেই হোটেলের জানলা খুলে দেখতেই মনটা ভালো হয়ে গেল..। মুখের সামনেই বিরাট বড় পাহাড় আর বুক চিরে অপরূপ ঝর্ণা প্রবাহিত হয়ে চলেছে অনর্গল..। আরো ওপরে তাকালে দেখা যাচ্ছে জমা বরফ..। ঝকঝকে নীল আকাশে দু চার টুকরো মেঘ..। এই দৃশ্য দেখলে তিনতলার ওপর থেকে পাহাড় কে সঙ্গী করে সক্কাল সেলফি না নেওয়াটা অন্যায়..! তবে পাহাড়ের যে অদ্ভুত ব্যাপার যেটা দেখলাম, তা হলো ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া..। কিছুক্ষণের মধ্যেই একরাশ মেঘের দল এসে গ্রাস করল পাহাড় কে..। কুয়াশার চাদরে এমন ভাবে আবরণ তৈরি হলো যে ওখানে পাহাড়ের অস্তিত্বটাই বোঝা গেল না আর..। এসবের মধ্যেই আমরা তৈরি হয়ে বেরোলাম গন্তব্য স্হলের দিকে..।সেদিনের রাস্তা তুলনামূলক ভাবে বেশ সুন্দর, মসৃন..। পথের দুধারে বিভিন্ন রকম ফুল এবং লাল, সাদা, গোলাপি রঙের  রডোডেনড্রন এর দেখা পাওয়া গেল..। তারই পাশে এক জায়গায় আমাদের গাড়ি দাঁড় করিয়ে প্রাতঃরাশ সেরে চলতে শুরু করলাম আমরা..। ডানদিকে দেখা হলো ইযুমথাঅং এর বিশাল উপত্যকা, যা বছরের এপ্রিল থেকে মে মাসের শুরুর দিকে ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকে..। আমাদের এই সফর মে মাসের শেষ দিকে হওয়ার কারণে ফুলের আধিক্য তুলনায় কম ছিল..। তবুও 11800 ফুট উচ্চতায় ওমন সুন্দর উপত্যকা বিস্ময় বোধের উদ্রেক করেছিল বটে..! আশেপাশের গাছ গুলোর আকার আকৃতি দেখে সহজেই অনুমান করা যাচ্ছিল, শীতকালে বরফ পড়ার কথা..। বাঁদিকে পাহাড়ের মাথায় বরফ আর কনকনে ঠান্ডা আমাদের সেই সময় সঙ্গ দিয়েছিল..। এভাবেই সবুজ গাছ আর ফুলে মোড়া ইযুমথাঅং ভ্যালি পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছে ছিলাম বরফ মোড়া ‘জিরো পয়েন্ট’ এলাকায়..।

গাড়ি থেকে নেমে বেশ কিছুটা হেঁটে পৌঁছনো গেল..। অদ্ভুত সুন্দর জায়গা..। পাহাড়ের ঢালে স্তরে স্তরে বরফ বিছানো..। সেখানে পৌঁছতে গেলে পেরোতে হয় এক স্রোতস্বিনী ছোট্ট নদী, যার জন্য গামবুট থাকা বাধ্যতামূলক ছিল..।  লোকজন প্রচুর উত্সাহ সহকারে সেলফি তুলতে ব্যস্ত..। বেশ কিছুক্ষণ সময় তুষারশুভ্র রাজ্যে কাটিয়ে গাড়ি নিয়ে ফিরে এসেছিলাম লাচুঅং এ হোটেলে..। প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর শোভাতে মোহিত হয়েছিলাম আমরা সবাই..।

প্যাকেজ ট্যুরের নিয়ম অনুযায়ী সেই রাতেই আমরা গ্যাংটক ফিরে এসেছিলাম..। তবে সব ভালোর মধ্যেই তো কিছু না কিছু ‘ভিলেন’ ব্যাপার থাকে, আমাদের এই সফরেও ছিল..। শেষ পর্যন্ত সাঙ্ঘাতিক বৃষ্টি চরম ভাবে আমাদের বিপদে ফেলার চেষ্টা করেছিল..। ভয় পেয়ে কপালের ওপর সবটা ছেড়ে দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা আর মাথায় কিছু আসেনি..।  শুধু মাত্র গাড়ির ড্রাইভারের কৃতিত্বে আর ভগবানের দয়ায় প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরেছিলাম..।

গ্যাংটকের ফেরার পরের দিনের সকাল ছিল একদম ঝকঝকে..। নতুন সূর্যের আলো মেখে আমরা সেদিন নিজেদের মতো বেরিয়ে পড়েছিলাম আশপাশ টা ঘুরে দেখব বলে..। গাড়ি ভাড়া নিয়ে রুমটেক মনাস্ট্রি দেখতে গিয়ে সুন্দর উজ্জ্বল গোলাপ ঝাঁক মন ভরে গেল..। পরিচয় পত্র দেখিয়ে বেশ অনেকটা খাড়াই রাস্তা বেয়ে মনাস্ট্রি উঠে বেশ অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল..। একসাথে প্রচুর লামা মনাস্ট্রি’র সামনের খোলা জায়গায় একসাথে অদ্ভুত রকমের ঘন্টার আওয়াজের সাথে তাল মিলিয়ে নৃত্য পরিবেশন করছে..। চারদিকের মেঘলা পরিবেশ সবুজ পাহাড় আর হাল্কা মেঘেদের ঘুরে বেড়ানো দেখতে দেখতে বেশ কেটেছিল সময় টা..। ফেরার পথে দেখে নিলাম ‘শান্তি ভিউ পয়েন্ট’, যেখান থেকে গোটা গ্যাংটক শহর কে উঁচু থেকে দেখা যায়..। পাহাড়ের ছোট ছোট ঘর বাড়ি গুলো দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল কারা যেন সারা শহর জুড়ে কিছু রঙ বেরঙের কাগজের টুকরো ছড়িয়ে রেখেছে..। পাহাড়ী বাঁক বেয়ে ঐ দৃশ্য দেখতে দেখতে নামার সময়টা ভীষণ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেছিল..।

বিকেলের মৃদু আলোয় বান ঝাঁকরি ঝর্ণা দেখে ছোটবেলায় পড়া সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ঝর্ণা’ কবিতা টার মনে পড়ল.। ভীষণ ছন্দোবদ্ধতায়  ওপর থেকে রাশি রাশি জলধারা নেমে চলেছে স্বচ্ছন্দ গতিতে..। দুরের চারদিক থেকে পাহাড় ঘিরে রয়েছে জায়গা টাকে..। এই দৃশ্য তো যে কোনো সমতলের ইঁট কাঠ কংক্রিটের জীবনের নাগরিকের মন ভোলাবেই..। আমরাও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না..। পড়ন্ত রোদের আলো মেখে সেদিনের সফর ছিল মনে রাখার মতো..। তবে সেই রাতটাই ছিল গ্যাংটক এর থাকার শেষ রাত..।

পরদিন সকালে শেষ মুহূর্তের শপিং সেরে গ্যাংটক থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল..। উদ্দেশ্য কোলকাতার ট্রেন ধরা..। পিছু ফিরে দেখছিলাম ক্রমশঃ মিলিয়ে যাচ্ছে সাজানো শহর..। হাত নেড়ে কথা দিয়ে এসেছিলাম সবুজ পাহাড় কে..। আবার দেখা হবে নিশ্চয়ই..। অপেক্ষার সেই শুরু..।।

ছবি : লেখক