পৃথিবী! আর কত অনাচার ফলাবে!

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কোন এক ঈদের চাঁনরাতের গল্প।ঈদের বাজার হয়ে গেছে।হয়তো ফিনিশিং টাচ বাকী। সন্ধ্যায় আমার জীবনসংগী বাজারে গেছেন। আমি বিছানার চাদর থেকে শোকেস এর ধুলা সামলে রান্নার বাটাকোটায় ব্যস্ত।বাচ্চারা তাদের জামাজুতা নিজ আয়ত্তে নিয়ে ঘরময় ঘোরাঘুরি করছে।পরিচারিকা জরিনা মিহি করে মেহেদী পাতা বেটে রেখেছে সামান্য খয়ের মিশিয়ে।ছোট বাটিতে জাফরান ভিজিয়েছি দুধে।শাশুড়ি মা বাদাম কিসমিস খোরমা মোরব্বা বের করে রেডি করছেন। তাঁর হাতের ফিরনী পায়েস লাচ্ছাসেমাই, দুধ সেমাই প্রায় স্বর্গীয়। কি এক অনিন্দ্য আনন্দ আমার ঘরে, যেন ঈদের বাঁকা চাঁদ আমার ঘরে নেমে এসেছে। কিন্তু হঠাৎ বাঘমামা ( আমার জীবনসংগী সুরকার মইনুল ইসলাম খান) এমন ভাবে ঘরে ফিরলেন যে আমরা সবাই চমকে উঠলাম! রীতিমত বিপন্ন অবয়ব তাঁর, চোয়াল ঝুলে পড়েছে।ঘরে না ঢুকে ড্রইংরুম এ হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়লেন। আমাদের জিজ্ঞাসু চোখ তাকে ঘিরে।হাতে কোন বাজার নেই, আমার পুদিনা পাতা, বিট লবন, সাদা দৈ? শাশুড়ি চোখের ইশারায় শান্ত হতে বললেন।অনেকক্ষণ পর তিনি মুখ খুললেন।বাজারের দোকানে বাকী সব দ্রব্যাদি কিনবেন, এগুচ্ছিলেন, হঠাৎ এক জুতার দোকানে ভিড় দেখে এগিয়ে গেলেন।দেখেন এক চোর (!) জুতা চুরি করেছে।প্রচণ্ড মার খাচ্ছে।অনেকে মারছে আবার অনেকে থামাচ্ছে। উনি একটু উদ্যোগী হয়ে থামালেন, চোর ধাতস্থ হলে জিজ্ঞেস করলেন কেন সে জুতা চুরি করেছে, সে জবাব দিলো, সে আসলে চোর নয়, তার খুব ইচ্ছা তার বাবার জন্য একজোড়া রাবারের জুতা কিনবে, বাবা কাদায় চলাফেরা করতে করতে পায়ে ঘা হয়েছে। ডাক্তার বলেছে পায়ে পানি না লাগাতে।এই গল্প করছে আর কাঁদছে।কেউ কেউ এই গল্প বানানো বলে ব্যক্ত করে আবার মারা শুরু করলো।বাঘমামা ভাবলেন একজোড়া জুতা চোরকে কিনে দেবেন। দোকানী কিছুতেই তা করতে দেবেনা।সে এবং উপস্থিত ক’জনা নানান বাহাস শুরু করলো এবং সবার অলক্ষে চোর উধাও।বাঘমামাকে সবাই বলতে শুরু করলো মিয়াভাই, এগুলেই আসল চোর, তাই ফাঁক পেয়ে পালিয়েছে।আপনার জন্যই চোরটাকে আসল মারা মারতে পারলাম না।আর উনি ভাবছেন একজোড়া রাবারের জুতা? বাবার পায়ের ঘা! ছেলের অপারগতা! এই দুনিয়াতে কে চোর কে ডাকাত কে জানে! যারা একজোড়া রাবারের জুতা চুরি করে মার খেয়ে মরে আর যারা ব্যাংক লুঠ করে দালানকোঠা বানিয়ে নামের পদবী পরিবর্তন করে বড় সাহেব হয় তারা দুজনই তো একই আল্লাহর সৃষ্টি মানুষ! এতো তফাৎ! এতো তফাৎ! বাঘমামা সারা বাজার সেই চোর নামের যুবক কে তন্নতন্ন খুঁজে বিফল মনোরথ হয়ে বাড়ি আসলেন। এবং এই দুঃখ আমাদের সবার মাঝে সংক্রমিত হয়ে নিমেষেই দুঃখবাড়ি হয়ে গেলো। সেবার আর সত্যিসত্যি আমার ঘরে ঈদই হলো না।

ছবি: শাহানা হুদার  ফেইসবুক থেকে