ম্যাচ ফিক্সিং…

সুরজিত চ্যাটার্জি, গায়ক ও মিউজিশিয়ান

গোপাল বাঁরুজ্জে আর নিতাই পাল।
গোপাল বাঁরুজ্জে রোগা এবং চওড়া, মনে হয় যেন ইস্ত্রিওয়ালা রিতেশ দুবেলা ইস্ত্রি করে যায় দুদিক থেকে। আর ওদিকে নিতাই পাল বেশ গোলগাল চেহারা, মাথা জুড়ে টাক।
নিতাই পাল, নিত্য , পাড়ায় ডেভিডের সেলুনে মাথা মালিশ করেন বলে পাড়ার লোকে নাম দিয়ে দিয়েছে নিত্য পাল। পাড়ার লোকে আরও একটা কথা বলে, চুপি চুপি বলছি কাউকে বোল না যেন, বলে ‘নিত্যর মাথায় বৃত্ত’।
যাকগে যা, চলো গল্পের সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠি।
দুই বাড়ি পাশাপাশি, দুই বাড়ির এক রঙ, দুই বাড়িতেই বোগেনভেলিয়া গাছ, মহা মুশকিল, তাহলে আলাদা কি ?
আরে একদমই আলাদা নয় কারণ দুই বাড়িরই মালিক নিত্য পাল।
অর্থাৎ গোপাল বাঁরুজ্জে হয়ে গেল নিত্য পালের ভাড়াটে।
এইখানেই এবার ঝামেলা শুরু। বাড়িওয়ালা ভাড়াটের ঝামেলা কি নিয়ে হয় বলতো? ওই একটাই উত্তর, ভাড়াটে বাড়ি ছাড়ছেনা।
নিত্য পাল নানারকম ঝামেলা করেন যাতে গোপাল বাঁরুজ্জে বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দেয় আর গোপাল বাঁরুজ্জে দাঁত কামড়ে পড়ে আছেন একদম।
পাড়ার লোকে বলে ‘নিত্য দিনের নিত্যি গোপাল কেলেঙ্কারি’।
প্রায় মাস ছয়েক হল বাঁরুজ্জেদের বাড়ির জলের লাইন কেটে দিয়েছে নিত্য পাল, কারণ নতুন ডেভেলপমেন্ট, নিত্য পালের প্রমোটার রেডি। দুটো বাড়িই ভেঙে একদম ফার্স্ট ক্লাস বিল্ডিং হবে এবং দারুন একটা ফ্ল্যাট। মোটা টাকাও পাওয়া যাবে।
নিত্য পালের স্ত্রী উমা বৌদির বহুদিনের ইচ্ছে এই পুরনো ভূতুড়ে বাড়ি ছেড়ে বেশ গোছান ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকবে, গেটে দারোয়ান থাকবে, লিফট হবে, জেনারেটর হবে।
– আর কি করে হবে, ওই পোড়ারমুখোটা যদি বাড়ি না ছাড়ে?
নিত্য পাল জামার শেষ বোতাম লাগিয়ে বলে
– শেষ খেলা খেলবো আমি, সবকটাকে যদি পাড়াছাড়া না করেছি তবে আমার নাম …
– থামো, শুধু বড় বড় কথা, কিচ্ছু করার মুরোদ নেই তোমার।
নিত্য পাল ঘুষি পাকিয়ে নিজেকে আয়নায় একবার দেখে নেয় কিন্তু ওদিকে উমা বৌদি কান্না জুড়ে দিয়েছেন। সেই ব্ল্যাক্ মেলিং কান্না।
– আমি জানি আমার এই পোড়ো বাড়িতেই মরতে হবে, মন্দিরাদের কি সুন্দর সব হয়ে গেল, সব ঘরে এসি লেগে গেল বলে হায় হায় করে কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল উমা।
নিত্য পাল চেঁচিয়ে বলে
– আরে মহা মুশকিল, বোঝনা কেন, কোর্টে গেলে ২৫ বছরের ধাক্কা হয়ে যেতে পারে। 
তারপর প্রানের মেয়ে নবনীতাকে ডেকে বলে
– নবো মা এক গ্লাস জল দে নয়তো আমি এক্ষুনি পাগল হয়ে যাব।
নবনীতা ফার্স্ট ইয়ার জিওগ্রাফির ছাত্রী, বাড়ির এই অশান্তিতে তার কোন তাপ উত্তাপ নেই। সব পাহাড় আর নদীর নাম, উচ্চতা, গভীরতা মুখস্থ রাখতেই একদম হাঁসফাঁস অবস্থা।
ওদিকে বাঁরুজ্জেড় স্ত্রী রেখা বৌদিও কম যায়না। পাড়ার মহিলা সমিতির সেক্রেটারি। ইয়া বড় চশমা পড়ে বাড়িতে গটগট করে ঢুকে বাঁরুজ্জেকে প্রায়শই বলে
– একটু ঠাণ্ডা জল দাও দেখি।
– ঠাণ্ডা জল কোথায় পাব ?
– কেন? ফ্রিজে ?
– কারেন্ট নেই যে
– তা ইলেকট্রিক লাইনটাও কেটে দিল নাকি?
– না না লোডশেডিং
– যাক, কিন্তু কেটে দিলেই বা কি হত, তুমি তো হাঁ করে তাকিয়ে দেখতে। আমায় যখন বিয়ে করলে তখন তো বলোনি যে রেখা একটা বাড়ি কিনে দেওয়া তো দূরের কথা, তোমায় আমি ঠাণ্ডা জলও খাওয়াতে পারব না ?
– ওই দেখো আবার সেই এক কথা, আরে আমি কি ইচ্ছে করে এই অবস্থা করেছি নাকি? এই পাড়ায় বাড়ি ছাড়ার এখন পাক্কা কুড়ি লাখ টাকা লেখা আছে, আমায় দিক আমি ছেড়ে দেব। ব্যাটা আড়াই লাখ টাকায় সেটল্ করতে চাইছে, মামাবাড়ি নাকি ?
এবার রেখার কান্না, আবার সেই কান্না, এইসব মেয়েরা একইভাবে কাঁদে কেন কে জানে,
-আমার জীবন তো শেষ হয়ে গেল। হ্যারিকেন জ্বালিয়ে থাকতে হবে বাকি জীবন। খাবার জলও পাব না।
পাশের ঘর থেকে মাউথ অরগ্যানের শব্দ ভেসে আসে কি যেন একটা গান, হ্যাঁ ‘তুমি চায়ের কাপ হাতে, ব্যালকনিতে, আমায়ে নিয়ে ছেলেখেলা কর আবার’, কি অসহ্য গান সব, কোথা থেকে কোথায়ে নেমে এল বাংলা গান, সত্যি।
রেখা আরও চেঁচিয়ে ওঠে।
– আর এই এক ছেলে হয়েছে, পড়াশুনা নেই সারাদিন ব্যান্ডের যতসব বাজে গান। বাবার কোনরকমে একটা অন্ধকার থাকার যায়গা আছে, ছেলে থাকবে ফুটপাথে।
বাঁরুজ্জের ছেলে ভানু। আশুতোষ কলেজে পড়ে, ওই মোটামুটি পড়াশুনায়, যাকে বলা হয় অ্যাভরেজ্। কিন্তু খেলাধুলায় বেশ ভাল। মাঝেমাঝে কোন ট্রফি জিতে নিত্য পালের বাড়ির সামনে দিয়ে বীরদর্পে বাড়ি ফেরে। নবনীতা কখনো সখনো পর্দা সরিয়ে দেখে।
বাংলা ব্যান্ডের ভক্ত ভানু। একটা মাউথ অরগ্যান আছে তাতে বেশ বাজায় ব্যান্ডের গানগুলো… বাঁরুজ্জের তো বেশ ভালই লাগে… রেখা একদম পছন্দ করে না “সব বাজে গান, ওরম তাকিয়ো না আমি ক্যাবলা হয়ে যাই, ছি ছি, এইসব গানের ভাষা?”
দিন যখন কাটে, তখন রাতও আসবে, রাতের পরে আবার ভোর। ভোর হলে একটা কমন্ দৃশ্য রোজ পাওয়া যাবেই যাবে।
প্রায় বুকের কাছে গামছা বেঁধে দাঁতের ব্রাশ ঘষতে ঘষতে বাঁরুজ্জে পায়চারী করছে বারান্দায়, সারা মুখে টুথপেস্ট। আর থুতু ফেলার আওয়াজ সারা পাড়াকে শুনিয়েই বাঁরুজ্জের পরিতৃপ্তি। শুধু তাই নয়, ওই থুতু ফেলার মধ্যে নিত্য পালকে গালাগালির আওয়াজ পাওয়া যায়। অনেক সময় থুতুর উত্তরে উমা বৌদি জোরে জোরে গামছা ঝাড়েন।
গোপাল বাঁরুজ্জের বাড়িতে জল নেই তাই আমাদের এই গল্পে আরেকটা চরিত্র ঢুকে পড়ল। বাকু। কাঁধে বাঁক নিয়ে রোজ সকালে পাড়াতে জলের লাইন কাটা বাড়িগুলোতে জল দেয়। মাঝে মাঝে ভাবি এরকম নাম বাবা মা কি ভাবে ঠিক করে, তারা কি জন্মকালেই জানত যে তাদের বাকু নামের এই সন্তান কাঁধে বাঁক নিয়ে নিজেকে মেলে ধরবে? যাকগে সে কথা গল্পে ফিরি।
বাড়িওয়ালা ভাড়াটের জলের লাইন কাটলেই বাকুর খুব ফুর্তি। রোগা দড়ি পাকানো চেহারা বাকুর, কে বলবে যে ওই বডিতে দু কাঁধে জল নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চার পাঁচ তলা উঠে যায় বাকু তরতর করে।
ওদিকে গোপাল বাঁরুজ্জে উত্তেজিত হয়ে জোরে জোরে নিত্য পালের উদ্দেশ্যে তার টুথপেস্ট মাখা প্রতিবাদ করেই চলেছেন আর দাঁতে ব্রাশ ঘষার ভেলোসিটিু বেড়ে গেছে।
-এই হতচ্ছাড়া বাকু আসছে না কেন এখনও? খুব ত্যাঁদড় হয়েছে ব্যাটা, আর ইদানিং মুখে মুখে বেশ তর্কও করছে।
কাছেপিঠে প্রায় খান দশেক জলের লাইন কাটা ফ্যামিলি আছে। তাতে চলে যায় বাকুর। কিন্তু মুশকিল একটাই, ওই জলের লাইন কাটা লোকগুলোর মেজাজ সবসময় তিরিক্ষি হয়ে হয়ে থাকে। তবে বাকুও ছেড়ে কথা বলে না। বাকু ভালো করে জানে বাকুকে ছাড়া ওরা চোখে অন্ধকার দেখে। তাই বাকু ব্যাবসা করে যাকে বলে রেলায়।
অবশেষে বাঁরুজ্জেদের বাড়িতে বাকু জল নিয়ে হাজির হয় আর তার পরেই শুরু হয় বাঁরুজ্জে আর বাকুর পলাশীর যুদ্ধ।
বাঁরুজ্জে এক মুখ পেস্ট নিয়ে বলে
– ইয়ার্কি পেয়েছিস না? আমি মুখে টুথপেস্ট নিয়ে অফিস যাব?
বাকু বাঁরুজ্জের মুখের উড়ে আসা টুথপেস্টের ছিটে পাশ কাটিয়ে উত্তর দেয়
– একদিন একটু টাইম কলে ধুয়ে নিলেই তো হয়
– টাইম কলে ধোয়ার জন্য আমি তোকে টাকা দিচ্ছি আহাম্মক?
– খিস্তি করবেন না, যা টাকা দেন তাতে কেউ এক মগও জল দেবে না।
– চার ভারী জল দিবি তার ৪০ টাকা রোজ? ওই টাকায় আমি মিনারেল ওয়াটারে চান করতে পারি।
– হ্যাঁ, তো করে নেবেন কাল থেকে। এই আজ শেষ দিলাম জল।
– ভয় দেখাচ্ছিস কাকে? এলাকায় আর কোনো ভারী নেই নাকি?
সত্যি নেই, একে তো ব্যাকডেটেড প্রফেশন, তার ওপরে রোজ রোজএই সব খচে থাকা পাবলিক সামলানোর হ্যাপা কে নেবে?
বাকুও ছাড়ার পাত্র নয়।
– বললাম তো যে আছে তার থেকে নিয়ে নেবেন কাল থেকে।
– ওই ভদ্রলোকের মতন কথা বলবি।
– আমায় ওপরওয়ালা ছোটলোক করে পাঠিয়েছে কাকু, ভরপুর ছোটলোক। আপনি ভদ্রলোক তো? তাই তুই তোকারি করেন।
– আরে এই বাকু তুই আমায় ছোটলোক বলছিস… অতি বার বেড়ো না। তোর পাড়ায় থাকা আমি যখন তখন বন্ধ করে দেব।
এরপরে নিউক্লিয়ার বম্ব চার্জ করে বাকু
– আগে নিজে কোথায় থাকবেন ঠিক করুন গে, তারপর আমার থাকার কথা ভাববেন।
ব্যাস কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে … এক হাতে গামছা সামলে অন্য হাতে তুলে বাঁরুজ্জে বলে
– এক চড়ে তোর মুণ্ডু ঘুড়িয়ে দেব। ছোট মুখে বড় বড় কথা?
বলতে বলতেই পাশের বাড়ির ঘোষদা জানলা দিয়ে মুখ বাড়ায়
– আরে পাগল করে দেবে তো এরা সকাল সকাল।
বাড়িওয়ালা নিত্য পাল নতুন উদ্যমে
– কবে থেকেই তো বলছি, দুটোকেই পাড়া থেকে বার করে দিতে। এটা ভদ্রলোকের পাড়া।
কিন্তু আসল খেলা এবার শুরু হয়।
বাঁরুজ্জের স্ত্রী রেখা বৌদি ব্যাট ঘোরাতে ঘোরাতে মাঠে নামেন
– হ্যাঁ, দে না, দিয়ে দেখনা একবার, তোর আগামী চোদ্দ পুরুষো পারবেনা… রেন্ট কন্ট্রোলে ভাড়া দিচ্ছি গুনে গুনে প্রত্যেক মাসে।
নিত্য পালের স্ত্রী উমা বৌদি একটা ইওরকার দেন
– সামনের মাসে ইলেকট্রিকের লাইনও কেটে দেব, অন্ধকারে বসে টিভি সিরিয়াল দেখিস।
রেখা বৌদি স্টেপ আউট করে লং অনের ওপর দিয়ে ছয় মারেন
– মোমবাতি নিয়ে থাকব আরও একশ বছর রে, তোর ভূতও নড়াতে পারবে না।
উমা বৌদি ছুটে এসে বাউন্সার দেন
– হ্যাঁ থাকিস থাকিস… তাহলেই বুঝবি কত ধানে কত চাল
এরপর দুই বৌদির ঝগড়া চলতে থাকে কিন্তু সত্যি বলছি, কে যে কি বলতে চাইছে কিছুই পরিস্কার করে বোঝা যায় না।
খেলা শিফট হয়ে যায় দুই বউয়ের মধ্যে। নিত্য পাল আর বাঁরুজ্জে সাইড লাইনে লাফান আর নিজ নিজ স্ত্রী কে মাঝে মাঝে বলেন
‘একদম ঠিক বলেছ’
বাকু যে কখন মাঠ ছেড়ে হাওয়া দিয়েছে, কেউ খেয়ালই করেনি।
এখন অবধি দুই বৌয়ের ঝগড়া হাতাহাতিতে পৌঁছায়নি। তবে যে কোনদিনই পৌছাতে পারে। সেই খেলা দেখবে বলে বসে আছে পাড়ার সমস্ত দর্শকেরা।
ভানু শুধু বসে থাকে নিত্য পালের মেয়ে নবনীতার জন্য … যখন দুই পরিবার ঝগড়ায় ব্যাস্ত, তখন ভানু ছাদে ট্যাঙ্কের ওপর উঠে হাত নাড়ে আর নবনীতাজানলায় এসে চোখ নামিয়ে হাসি হাসি মুখে দাড়িয়ে থাকে।
নবনীতার গায়ের রঙটা একটু শ্যামলা তবে চোখ দুটোর জাস্ট কোন কথা হবে না।
কিন্তু কি মুশকিল, নবনীতা কিছুতেই চোখ তুলবে না। চোখ নামিয়ে কেন থাকে কে জানে।
ছাদের ট্যাঙ্ক থেকে ভানু দূরবীন দিয়ে নবনীতার চোখ দেখার চেষ্টা করে। সস্তার দূরবীন, তাও যতটা হয়। দূরবীনের কল্যাণে কিছুটা কাছে এগিয়ে আসে নবনীতা, আবার মনে হয় কি সুন্দর দেখতে নবনীতাকে। কি একটা যেন আছে, বিশেষ করে ঘাড়ের দিকটা পায়রার মতন। মাথার চুলগুলো টেনে ব্যাকব্রাশ করে বাঁধা। মাঝে মাঝে একটু খুলে রাখলেই পারে।
ভানু সারাদিন নবনীতার কথাই ভাবে। ঘরের ভেতর মা বাবা নবনীতার মা বাবার শ্রাদ্ধ করে সারাক্ষণ, ভানুরকানেই যায়না। নবনীতা রাজি হলে নবনীতাকে নিয়ে ফাগুনী পূর্ণিমার রাতে পালিয়ে যাবে কোন একদিন।
না পালালে এ প্রেম কোনদিনই নদীর ওপারে পৌঁছাবে না।
আহা নবনীতাকে নিয়ে পালাচ্ছে ভানু, অটোতে, বাসে, নৌকায়, ট্রেনে, জাহাজে, শুধু স্বপ্ন স্বপ্নস্বপ্ন, ‘এক চড়ে তোর মুণ্ডু ঘুড়িয়ে দেব’, স্বপ্ন ভেঙে ভাঙচুর।
কথাটা বাকুর উদ্দেশ্যে ছিল। ঝগড়া এবার ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছেছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।
– নবনীতা, প্লিস, মাটিতে কি দেখো? আরশোলা?
যতক্ষণ ঝগড়া চলে ততক্ষণ আনন্দ। ঝগড়া শেষ হলেই, নবনীতার মা ঘরে ঢুকবে আর ঠিক সেই সময় একবারের মতন চোখটা তুলে ভানুর দিকে চেয়ে ঘরের ভেতর চলে যাবে।
আরে মুখটা আরেকটু আগে তুললে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয় কে জানে। কিন্তু সত্যি বলতে নবনীতার ওই একবার তাকানোটাই ভানুর সারাদিনের অক্সিজেন। ভানুর গীটার বাজাতে ইচ্ছে করে, গান গাইতে ইচ্ছে করে, কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। আরও কত কি।
কিন্তু বাকুটা আজকাল খুব সেয়ানা হয়ে গেছে, আগে দশ টাকা করে নিত ভানুর থেকে, আজকাল ব্যাটা ২০ টাকা চাইছে।
– এরকম করিস না বাকু, টিউশনির পয়সা, একদম ডবল করে দিলে কি করে চলবে বলতো?
– সে তুমি দেখে নাও ভানুদা, আমার আবার ভয় করে কোনদিন না মুখ ফস্কে সব বলে দিই তোমার বাবাকে।
– ওই দেখো আবার রেগে যায়, আরে আমার কথাটা একটু ভাববি না ?
– না, ভাববো না, আমারটা কে ভাবছে, ওই যে রোজ বলে এক চড়ে মুণ্ডু ঘুড়িয়ে দেবে, যদি সত্যি একদিন দেয় তখন মুণ্ডু সোজা করার দায়িত্ব কে নেবে? তুমি?
– আরে ও তো বাবা এমনি বলে। বাবার গায়ে অতো জোর আছে নাকি?
– অতশত জানিনা, এ কাজে আমার লাইফ রিস্ক আছে তাই কুড়ি টাকা কিছুই নয়। এ ছাড়া মাঝে মাঝে যে ফাউ কাজ করে বাকু, নবনীতাকে ভানুর চিরকুট দেওয়া ‘কাল ঝগড়া হবে সকাল সাতটা নাগাদ, প্লিস সাড়ে সাতটায় জানলায় চলে এসো, প্লিস প্লিস।’
কুড়ি টাকা করে সপ্তাহে তিনদিন ষাট টাকা, মানে মাস গেলে দুশো চল্লিশ টাকা। টিউশনে প্রায় চারশ টাকা পায় মাসে। নবনীতার জন্য প্রাণ দিতে পারে ভানু, দুশো চল্লিশ টাকা আর কি।

সত্যানুসন্ধানীর মত ভোরের আলো আজ আবার পা টিপে টিপে পাড়ার গলিতে ঢুকে পড়েছে। বাঁরুজ্জে এক মুখ টুথপেস্ট নিয়ে ছাদে বারান্দায় অপেক্ষা করছে, বাকু কাঁধে বাঁক নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। ভানু পায়রা ডিঙিয়ে চুপি চুপি ছাদে উঠে, দূরবীন নিয়ে ট্যাঙ্কে বসে।
নবনীতা জানলায় আসবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই।

অলঙ্করণ: গুগল ছবি