লোডশেডিং-এর দিনগুলো

সংঘমিত্রা রায় চৌধুরী দাশগুপ্ত

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আমাদের ছোটবেলায় ঘনঘন লোডশেডিং হতো। বিকেল গড়িয়ে যেই সন্ধ্যে নামতো, বাবা-কাকুদের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় রান্নাঘরে মা-ঠাম্মা-কাকিমাদের নিত্যনতুন জলখাবার বানানোর তড়িঘড়ি পড়ে যেত, আমরা ভাই-বোনেরা যে যার স্বভাব-অনুযায়ী বৈকালিক বাঁদরামি, মাঠ, খেলনাবাটি, পাড়া-বেড়ানো,গপ্পের বই সাঙ্গ করে গা-হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসে সবে ফাঁকির নতুন কোনো মতলব ভাঁজছি,এমন সময় ঝুপ্ করে একদলা নিকশ অন্ধকার লাফিয়ে পড়তো কলকাতা শহরে।একটা সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাসের হাওয়া বয়ে যেত গোটা পাড়ায়।

মফস্বলেও একই গপ্প। আমার মামাবাড়ি ছিল চন্দননগরে।দাদুরা বংশানুক্রমিকভাবে কংগ্রেসি, ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুতে প্রায় অঘোষিত অশৌচ জারি করেছিলেন বাড়িতে, ইষ্টি-গুষ্টি-কমিউনিষ্টির নাম শুনলেই ভুরু-টুরু কুঁচকে যেত, লোডশেডিং হলেই দাদু বা মামারা কেউ না কেউ উচ্চঃস্বরে বলে উঠতেন,” জ্যোতিবাবু চলে গেল!”
তা কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় যেতেনও বটে ‘জ্যোতিবাবু’, সন্ধ্যে হলে কিছুত্তেই ওনাকে ধরে রাখা যেত না। আমাদের বাড়িতে আবার অন্যরকম আবহাওয়া; বাবা কংগ্রেসী আমলে ছাত্র-রাজনীতি, কর্মচারী-সংগঠন করা বামপন্থী, তাঁর কাছে লোডশেডিং মানেই বিদ্যুৎ ঘাটতির হিসেব-নিকেশ। তবে শ্বশুরবাড়িতে গেলে বাবাও ওসব ডিমান্ড- সাপ্লাইয়ের জটিল তত্ত্বে ঢুকতেন না, আর দাদু-মামারাও ওই দু-একদিন সিপিএম জামাইয়ের সম্মানে ‘জ্যোতিবাবু’-র নিষ্ক্রমণের চিৎকৃত ঘোষণা থেকে বিরত থাকতেন।

তখন বাড়িতে বাড়িতে প্রতি হপ্তায় রেশনের কেরোসিন তেল তোলা হতো আর মাসকাবারি বাজারের লিস্টিতে বড়-মেজো-ছোটো বিভিন্ন সাইজের মোমবাতি ছিল চাল-ডাল-তেল-নুনের মতোই আবশ্যিক। আমরাই সম্ভবত শেষ জেনারেশন যারা অন্তত কিছু বছর বাড়িতে হাতপাখার হাওয়া খেতে খেতে হ্যারিকেন আর কেরোসিন-ল্যাম্পের আলোয় পড়াশোনা করতে বাধ্য হয়েছি।এমার্জেন্সি আলো খুব কম বাড়িতেই থাকতো, যাদের থাকতো তাদের বেশ সমীহের চোখে দেখা হতো।

বিরক্তি, ভ্রুকুঞ্চন, টীকাটিপ্পনী, গালিগালাজ… এইসমস্ত স্বাভাবিক আর স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ার বাইরেও আরো কিছু মায়া জড়িয়ে ছিল লোডশেডিং-কে ঘিরে। গুমোট ঘর থেকে খোলা হাওয়ায় একটু ঘুরে আসার অজুহাতে ছেলেছোকরাদের আড্ডা, অন্ধকার গলির প্রান্তে আবছা অন্ধকারকে সাক্ষী রেখে “আমার যা কথা ছিল, হয়ে গেল বলা”… আরো কত কি! আমার নিজেরও কিন্তু, মিথ্যে বলবো না, দিব্যি ফুরফুরে হয়ে যেত মনটা, ওই আলো-পাখার কোরাস অসহযোগ শুরু হলেই। দৃষ্টিশক্তিটা ছোটোবেলা থেকেই বিশেষ সুবিধার না, ফলে মোমবাতি বা হ্যারিকেনের আলোয় বেশিক্ষণ পড়া ছিল বারণ, কোনরকমে পরের দিনের হোম-ওয়ার্কটুকু সেরে একছুট্টে ছাদে। তারা চিনতে শেখা তখন থেকেই, মাঝেমাঝে আশেপাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা রেডিও-র গান, পিসি-কাকিমাদের আড্ডা শুনে একটু একটু পাকামি শেখা… সবকিছুর জন্যই ঋণী থাকবো লোডশেডিং-এর কাছে। ‘যে আঁধার আলোর অধিক”।

লোডশেডিং চলে গেছে আমাদের ছেড়ে। প্রতিদিনের সান্ধ্য বিদায়ের পাট চুকিয়ে পাকাপাকিভাবে চলে গেছেন ‘জ্যোতিবাবু’।কলকাতায় আজকাল সারাবছর দেওয়ালি, বারোমাস ক্রিসমাস। দিনের আলো ফুরোতে না ফুরোতে ঝলমলিয়ে ওঠে কল্লোলিনী। কোনো আবছায়া নেই, নেই কোনো অন্ধকারের আড়াল।সব সোজাসুজি, খোলাখুলি, দুপুরের রোদের মত স্পষ্ট।আমার ছেলে হ্যারিকেন চিনেছে ছবি দেখে,ওর কাছে মোমবাতি মানে জন্মদিনের ফুঁ কিম্বা দীপাবলির রাত।

তবু হঠাৎ একেকদিন কেন যেন মনে হয় আলোর কাছে বিকিয়ে দেওয়া আমার সে আঁধারই বুঝি ভালো ছিল……অন্ধকারের ছদ্মবেশে মায়ার চাদরে জড়িয়ে থাকা সেই আবছায়া সন্ধ্যেগুলো।

ছবি:গুগল