আমার ঈদ…

আশিক বিশ্বাস

ছোটবেলা থেকে আমার ঈদ পছন্দ। দিনটাই আনন্দের। আরো বেশী তার আগের কয়েকদিন। বাজারঘাট, জামা-কাপড় কেনা। নিউ মার্কেটে, এলিফ্যান্ট রোডে শপিং করতে করতে ইফতারের সময় হয়ে যাওয়াতে অপ্রত্যাশিত ফান্টা খাওয়া। জুতা টাইট হচ্ছে, পায়ে ফোসকা পড়ে যাচ্ছে, তবু বলছি অসুবিধা হচ্ছে না, শেষে যদি কিনে না দেয়! ঈদের আগের দুইদিনের উত্তেজনা বলার মত না। চাঁদ দেখা গেছে কি যায়নি। কে দেখেছে?? পিচ্চি বাবু? ধুর! তাহলে সত্যি না। চাঁদ দেখার একটা কমিটি ছিলো সে সময়, জানি না এখনও আছে কিনা। তারা যদি আমার “নিজেস্ব গণনায়” ঈদের ঘোষণা দেরী করে দিতো, তো সাংঘাতিক মেজাজ খারাপ হতো। মনে হতো শুধু আমাকে যন্ত্রণা দেয়ার জন্যই ঈদ পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে।

ছোটবেলায় ঈদের দিন সকালে উঠতে কষ্ট হতো না। দু’টা জামাত হবে। প্রথমটা ধরা চাই, তাহলে সারাদিন বেশী সময় পাওয়া যাবে। নামাজ পড়েই আব্বার কবর জিয়ারত করতে যাওয়া হতো বনানীতে। এরপর বাসায় ফিরে নাস্তা। সেমাই, সুজি আর ডিমের হালুয়া বানানো হতো, সাথে জর্দা, যা আমার সবচেয়ে প্রিয়। দুপুরে আমরা পাড়া ঘুরতাম। এর, ওর বাসায় খাওয়া। তখন আসলেই বিশ্বাস করতাম যত ঝগড়াই হোক, ঈদের দিনে সে সব ভুলে যাওয়া যায়। ছেলেবেলার বিশ্বাস নিয়ে সারা জীবন চলতে পারলে ভালো হতো। যাক গে, রাতে আমাদের বাসায় সবাই আসতো। একসাথে খাওয়া হতো… পোলাও, মুরগীর কোরমা, ঝাল গোস্ত মেন্যুতে থাকতোই। সঙ্গে সালাদ আর কাবাব।

ঈদের সাথে টাকা সম্পর্কিত তিনটা শব্দ আসতোই… ফিতরা, যাকাত আর ঈদি। প্রথম দুটোর মধ্যে কোনটা কোন ঈদের জন্য প্রযোজ্য তা মনে থাকতো না, কিন্তু তৃতীয়টি ভোলার কোনোই কারণ ছিলো না। নিচে পাঁচ, ওপরে পঞ্চাশ। পঞ্চাশের নোট যদি কেউ ঈদি পেত তো সেটা ছিলো লটারী জেতার মত ব্যাপার। বন্ধু মহলে তার সম্নান বেড়ে যেত, ভাবটা যেন হজ্ব করে আসছে।

“ফটিকের” বয়সে এসে ঈদ নিয়ে ঔদাসীন্য দেখানোটা স্মার্টনেসের অংশ ছিলো। ঈদ আবার কি, বিশ্বজগৎে চিন্তা-ভাবনার অনেক বিষয় আছে। ওই বয়সে এই গম্ভীর ভাব ধরে থাকার অভিনয় করতে বেশ কষ্ট হতো। সে সময় ঈদের অনুষ্ঠানে সেলিব্রেটিরা “ঈদের দিন কি করলেন” প্রশ্নের উত্তরে প্রায় বলতো সারাদিন ঘুমিয়েছে। কি বিরক্তিকর কথা। ঈদের দিন তোরা ঘুমাবি কেন? আরো পরে, মধ্য কৈশোরে, ঈদের আমেজ ছিলো অন্যরকম। তখন গার্লফ্রেন্ড হয়েছে। সেই মেয়ের সাথে কাকভোরে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা, ওর দেয়া পাঞ্জাবী কোনো বন্ধুর মা দিয়েছে বলে চালিয়ে দেবো, সেই বন্ধুকে পড়িয়ে পিটিয়ে তৈরী করা, সে সব ছিলো বিরাট কাজ।

আমি কানাডা আসার পর প্রথম ঈদে কাজ করেছিলাম। তখন একটা কাপড়ের দোকানে কাজ করতাম। অনেক মন খারাপ হয়েছিল সেদিন। মন ভালো করার জন্য ঐ দোকান থেকেই একটা সার্ট কিনে নিজেকে গিফট করেছিলাম। কাজ হয়নি। তারপর থেকে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যত খারাপ অবস্থাই হোক, ঈদের দিন কাজ করবো না। নিজেকে দেয়া সেই প্রতিশ্রুতি সব সময় না হলেও বেশীরভাগ সময় রাখতে পেরেছি। ছেলেবেলার ঈদের দিনের আনন্দটা আমি এখনো পাই। প্রতিবারই শায়ানকে জিজ্ঞাসা করি ঈদ করবে কিনা। ও রাজী হলে মহা উৎসাহে দুজনের পায়জামা-পাঞ্জাবী রেডি করি, নামাজ কখন আর কোন মসজিদে তার খবর নেই, রান্না-বান্না করি, বন্ধু-বান্ধব বাসায় আসতে বলি। ভালো লাগে।

গতকাল, তেরই জুন ছিলো আমার বাবার মৃত্যুদিন। ওঁনাকে ছাড়া ঈদ করছি সেই ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় থেকে। অভ্যাস হয়ে গেছে। এবারের ঈদ মাকে ছাড়া, জীবনে প্রথম। বহু বছর তাঁর সাথে ঈদ করা না হলেও ঈদের দিন কোনো না কোনো এক সময় ফোনে কথা হতোই। এবারে আর তা হবার নয়। নামাজ-রোজা না করে ঈদ নিয়ে মাতামাতি করছি বলে শাসন করার শেষ মানুষটি চলে গেছে…..

কাল ঈদ, মতান্তরে পরশু। যেদিনই বা দুদিনই হোক, সবার জন্য রইলো আমিন জুয়েলার্সের বিজ্ঞাপণ মার্কা প্রানঢালা ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা। সবার ঈদ ভালো কাটুক বন্ধু-বান্ধব, পরিবার আর প্রিয়জনের সঙ্গে। জর্দা খেতে কেউ ভুলো না।

ঈদ মোবারক!!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে