শুভ জন্মদিন পল রোবসন

Printবাবলু ভট্টাচার্য : বিংশ শতাব্দীর আমেরিকায় অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক ছিলেন পল রোবসন। কিন্তু তার বিপ্লবী রাজনৈতিক মতাদর্শ, এবং আফ্রিকান আমেরিকানদের প্রতি যেধরনের ব্যবহার করা হতো তা নিয়ে তার সমালোচনার কারণে মার্কিন কর্তৃপক্ষের তিনি বিরাগভাজন হয়েছিলেন। ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্বে তার নাতনি বলেছেন সেই বছরগুলোর কথা যখন পল রোবসন ছিলেন আমেরিকান কর্তৃপক্ষের কালো তালিকায়। তিনি আরো বলেছেন ৫৬ বছর আগে কীভাবে তিনি আবার সাড়া জাগানো এক কনসার্টে ফিরে এসেছিলেন।

৯ই মে ১৯৫৮ সালে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতানুষ্ঠানের জন্য নিউ ইয়র্কের প্রধান প্রেক্ষাগৃহ কার্নেগি হলে মঞ্চে আবার তাঁর উপস্থিতিকে তুমুল হর্ষধ্বনিতে এবং উঠে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিল উপস্থিত বহু দর্শক । সেদিন ৬০বছরের জন্মদিনে পা দিয়েছিলেন পল রোবসন। এর আগের আট বছর কার্নেগি হলে তার গান গাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তার রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে। শুধু কার্নেগি হলই নয়- আমেরিকার কোনো মঞ্চেই তার সঙ্গীত পরিবেশনের অনুমতি ছিল না। পল রোবসনের নাতনি সুজান রোবসন বলেছেন ওই সঙ্গীতানুষ্ঠান রাজনৈতিক দিক দিয়ে ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ।

শীতল যুদ্ধের যুগে পল রোবসন মার্কিন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরাগভাজন হন। মার্কিন গোয়েন্দা দপ্তর এফবিআইয়ের পরিচালক জে.এডগার হুভার সে সময় সোভিয়েত কম্যুনিজম সম্পর্কে আমেরিকার নতুন ধ্যানধারণার একটা রূপরেখা তুলে ধরে বলেন যুক্তরাষ্ট্রে যদি কখনও কোনো পঞ্চম বাহিনী থেকে থাকে তাহলে সেটা হল কম্যুনিস্ট পার্টি – যেটা দুষ্ট ও বিষাক্ত একটা জীবনধারা । আর এই কম্যুনিস্টদের প্রকৃত আনুগত্য – তিনি বলেন- রাশিয়ার প্রতি আমেরিকার প্রতি নয়। হুভারের তালিকায় বেশ কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম ছিল যাদের আনুগত্য রাশিয়ার প্রতি বলে তিনি সন্দেহ করতেন এবং সেই তালিকায় ছিলেন পল রোবসন ।

সুজান রোবসন বলেছেন পল রোবসন বলতেন তার আন্দোলন ছিল কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন। এর জন্য তার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা অসঙ্গত। সুজান বলেন তার পিতামহকে সারা জীবন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। সবগুলো স্কলারশিপ পরীক্ষায় সফল হওয়ার পরেও পল রোবসনকে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দেওয়া হয় নি- কারণ তিনি ছিলেন আফ্রিকান আমেরিকান। তিনি একটা বর্ণবৈষম্যমূলক সমাজে বড় হয়ে উঠেছিলেন ।

১৯৩০এর দশকের একটা বড় সময় তিনি কাটিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। সেই সময় তিনি সারা ইউরোপ ঘুরে বেড়াতেন এবং প্রতি বছর আমেরিকাতেও ফেরত যেতেন সঙ্গীতানুষ্ঠানে অংশ নিতে এবং সেখানে তার যোগাযোগগুলো বজায় রাখতে । তার চেহারা এবং কন্ঠের জন্য গায়ক ও অভিনেতা হিসাবে খ্যাতি ছিল তরুণ পল রোবসনের । যতই তিনি বড় হয়ে ওঠেন, ততই সমাজে বৈষম্যের প্রকট চেহারা তাকে ক্রুদ্ধ করে তোলে। এবং এ বিষয়ে স্পষ্ট কথা বলতে তিনি কখনই ভয় পাননি।15201050315_420cf00f67_b

১৯৩০-এর দশকে তিনি যখন লন্ডনে ছিলেন, তখন তিনি ঔপনিবেশিকতার বন্ধন থেকে মুক্তির সংগ্রামের মূল প্রবক্তা হয়ে ওঠেন । আফ্রিকান আমেরিকানদের তখনকার অবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ গড়ে তুলে মানুষকে একইভাবে দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা হচ্ছে।

১৯৪৭ সালে আমেরিকায় এমনকী তার কেরিয়ার স্থগিত রেখে সমানাধিকার আদায়ের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। এ সময় মার্কিন কর্তৃপক্ষের ধারণা হয় তিনি হয় কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছেন – নয়ত তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছেন। এফবিআই-এর গোয়েন্দারা তার পাসপোর্ট জব্দ করেন।

১৯৫০ সালে তার পাসপোর্ট বাতিল করা হয় এবং ১৯৫০ থেকে ১৯৫৮ – ৮বছর তার আমেরিকার বাইরে বেরনো নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়- কাজেই তিনি দেশের ভেতরে এরকম বন্দী হয়ে যান। কিন্তু সুজান রোবসন বলেছেন পল রোবসন কখনই কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন না। তিনি বলেন আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিন অ্যাচেসন পল রোবসনকে তার রাজনৈতিক বিবৃতি দেওয়া থেকে বিরত করতে একটা আপোষ প্রস্তাবও দেন, যার উত্তরে তিনি বলেছিলেন:

”আমি উদ্ধত আমেরিকার প্রভুসুলভ মনোভাবকে ভয় পাই না- তা যত শক্তিধর রাষ্ট্রই সে হোক্‌ না কেন । আমি আমেরিকান – এটাই সত্য। এটা উপেক্ষা করে যারা নিগ্রো জনগোষ্ঠির ‘আঙ্কল টম’ হয়ে থাকতে চায় তাদের আমি চ্যালেঞ্জ জানাই। এই জঘন্য সামাজিক প্রথাকে আমি আমৃত্যু ঘৃণা করব । আমার ব্যক্তিগত সাফল্য এখানে খুবই তুচ্ছ ব্যাপার । ১৪ মিলিয়ন নিগ্রো জনগোষ্ঠি যেখানে অন্যায়-অবিচারের শিকার হচ্ছে- সেখানে আমার একার সাফল্য দেখিয়ে আমি কী বলব যে আমাদের কোনো সমস্যা নেই? আমরা চাই পূর্ণ স্বাধীনতা। আমাদের অধিকার খর্ব করে –এমন কোনো স্বাধীনতা আমরা চাই না।”

১৯৫৮ সালে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়- রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কারো পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়ার অধিকার সরকারের নেই। প্রশাসনে বরফ গলার এই ইঙ্গিত পেয়ে তার একজন অনুষ্ঠান আয়োজক কার্নেগি হলে পল রোবসনের ওই যুগান্ত সৃষ্টিকারী কনসার্টের ব্যবস্থা করে ফেলে।

এর পাঁচ বছর পর ভগ্নস্বাস্থ্য পল রোবসন সব কিছু থেকে অবসর নেন। তিনি ১৯৬০এর দশকের নাগরিক অধিকার আন্দোলনে অংশ নিতে পারেন নি। কিন্তু যে সময় বিপ্লবী চেতনার জন্ম দিলে শাসকদের রোষানলে পড়তে হতো, সেসময় তিনি আন্দোলনের নির্ভীক প্রবক্তা । তার এই সংগ্রামী জীবনের অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে গিয়েছিল আমেরিকার সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বহু দেশে। পল রোবসন মারা যান ১৯৭৬ সালে।

পল রোবসন ১৮৯৮ সালের আজকের দিনে (৯ এপ্রিল) আমেরিকার নিউ জার্সিতে জন্মগ্রহণ করেন।