সে দলিত ….আছে তার রং পেন্সিল

শিলা চৌধুরী

(ক্যালিম্পং থেকে ): অপরাধ তার জন্ম, অপরাধ সে দলিত, অপরাধ তার দারিদ্রতা অপরাধ সে উচ্চ বর্ণের মানসিক ভিখারীদের জলের কল থেকে খাবার জল নিয়েছে। রয়েছে তার আরো আরো অপরাধ। কুকুর বলতে পারা আস্ফালন কারী উচ্চ বর্ণের নরাধমদের নিজস্ব আদালতে তাই সে মার খেয়ে ওভাবে শুয়ে ডিজিটাল ভারতের ভূমিশয্যায়। তাই তার মা কাঁদে ঘোমটায় মুখ ঢেকে, তাই তার বোনের বিস্ফোরিত জিজ্ঞাসু বাষ্পভরা দৃষ্টিতে লাভাটা শুধু উদগীরনের অপেক্ষায়…!!! না তাকে হয়তো এভাবে ভূমিশয্যায় পড়ে থাকতে হয়নি কিন্তু জীবনটাকে এগিয়ে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে হয়েছে বা হচ্ছে অন্যের ভূমিতে জন খেটে আজোও….সে সোমনাথ রুইদাস. …. উদ্দেশ্যেহীন ভাবে মাঝে মাঝেই এদিক ওদিক চলে যাই…কদিন আগেও কলকাতায় গিয়ে বেরিয়েছিলাম -ফিরতে রাত সাড়ে দশটা বেজে গিয়েছিল…হেঁটে ফিরছিলাম ।নাগের বাজার সাতগাছির অটো ষ্ট্যাণ্ড পাড় করে আবার দু,পা পিছিয়ে গেলাম।কৌতুহল বেশি তো কিছু কিছু বিষয়ে।

সোমদাসের মা

তাই গলা বাড়িয়ে উঁকি মারলাম।রাস্তার বাতি স্তম্ভের নিচে কেউ একজন কাগজে কি যেন করছে তা দেখতে. ..।তাজ্জব বনে গেলাম দেখে..!!! দেখলাম বাইশ তেইশ বছরের একটা ছেলেকে  রাস্তায় ছুটে যাওয়া মানুষের স্কেচ করছে. .। নাহ সামনে কেউ বসে নেই যে টাকার বিনিময়ে নিজের অবয়ব আঁকাচ্ছে।আপন মনেই এঁকে যাচ্ছে. ।কিছু সময় দাঁড়াবার পর তার হুঁস হলো সামনে কেউ দাঁড়িয়ে ।মুচকি হেসে জানতে চাইলাম নাম,বল্লো সুমন দাস ।রাত হয়ে গিয়েছিল, এরপরে বাড়ির সদর দরজা খুলে দেবার মতো  কেউ জেগে থাকবে না..তাই দেরি না করে ওর মোবাইল নাম্বার টা চেয়ে নিয়ে কথা হবে বলে চলে এলাম ।ভুলেই গিয়েছিলাম ওকে ফোন করার কথা পরদিন. .. দুদিন পর মনে হতেই ফোন করলাম. ..অন্য প্রান্ত থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় হ্যালো জবাব. .. দ্বিধায় পরে গেলাম. .কি বলবো. .।বল্লাম তোমার কি কোন সমস্যা ভাই আমি ওমুক…ওই যে তোমার ফোন নাম্বার নিলাম রাত্তিরে … পরিচয় জেনে একটু যেন ভরসা পেলো, গলার আওয়াজ শুনে বুঝলাম ।রাস্তার বাতি স্তম্ভের নিচে বসে ছবি আঁকার কারণ জানতে চাইলাম ! কোন উত্তর না পেয়ে অভয় দিলাম আর শুরু করলো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে – দিদি আমার বাড়ি বীরভূম জেলার ইলামবাজার ঘুড়িষা, একটা অনলাইন সংস্থায় খন্ডকালীন ডাটা এন্ট্রির কাজ করি পড়ার পাশাপাশি । দিদি আমি ক্ষমা চাইছি একটা বিষয়ে, আমার আসল নাম হলো সোমনাথ রুইদাস।ঠিক বলিনি যদি আপনি কিছু মনে করেন তাই। বল্লাম কেন মনে হলো এই কথা ? থেমে বলে আমি তো নিচু জাতের তাই !

বোনের সঙ্গে

বকে দিলাম একটু..আর তাতেই কাজ হলো । বল্লো আমার ঠাকুরদাদা জুতো সেলাই করতেন ।তারপর বাবা সেই পেশায় যায়নি ।বাবা দূর্গাপুর স্টিলপ্ল্যান্টে সামান্য শ্রমিকের কাজ করতেন ।তিন ভাই বোন আমরা।দাদা পড়াশোনা করতে পারেনি বেশি কারন আমি যখন খুব ছোট বাবা তখন মানসিক রোগে মারা যান ।সংসার চলতোই না, শেষে মা একটা মাংসের প্ল্যান্টে খুবই সামান্য মাইনের কাজ শুরু করেন ।ওতে দু’বেলা খাবার কোন ভাবে জুটতো আমাদের ।দিদি আছে আমার।সে ভালো ছাত্রী ছিল । দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর আর মা পড়াতে পারেনি । দিদির বিয়ে হয়ে যায় ।দাদা চতুর্থ শ্রেণীর পর আর পড়তে পারেনি।দিন মজুরের কাজ করে । আমিও পড়ায় ভালো ছিলাম কিন্তু মা খরচ জোগাতে পারছিলেন না।মাকে আশ্বাস দিয়েছি যে আমি আমার পড়ার খরচ নিজেই করে নেবো। কিন্তু কে দেবে কাজ ! সেই তো জুতো সেলাই…।না তা করিনি. ..অন্যের ভূমিতে জন খাটার কাজ শুরু করলাম ।মাটি কাটা,ধান বোনা,ধান কাটা এসব করে করে পড়া চালিয়ে নিতে লাগলাম সেই ছোটবেলা থেকেই ।তার মধ্যেই মন অন্য দিকে কিছু খুঁজে ফিরতো।পড়তে বসেই পেন্সিল হাতে নিয়ে বইয়ে কবিতা, ছড়ার সঙ্গে যে ছবি আঁকা থাকতো তা হিজিবিজি করে আঁকার চেষ্টা করতাম ।একদিন আমার বিদ্যালয়ের শিক্ষক খাতায় সেটা দেখতে পেলেন ।খুব প্রশংসা করলেন দেখে।তারপর অনেক দিন… আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ।বোলপুর থেকে বিদ্যালয়ে আঁকার শিক্ষক এলেন।তিনিই অল্প ক’দিন আমাকে আঁকা শিখিয়েছেন…। ব্যাস ওইটুকুই…।হাল ছাড়িনি…. একা একা রং পেন্সিল নিয়ে যা মনে হয় তাই এঁকে যাই।পাশাপাশি স্নাতক স্তরে পাশ করে আমি বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্যে শিক্ষকতা প্রশিক্ষণে রয়েছি। তবুও ” ওই মুচি কোথায় যাচ্ছিস ” ডাক থেকে আজোও বেরুতে পারিনি… নিরুত্তর থাকি প্রতিবারই তার ওই জবাবে. . তাই সে ভয়ে, লজ্জায়, অপমানে সোমনাথ রুইদাস থেকে সুমন দাস হয়ে যায় সভ্য এই দুনিয়ায় …

ছবি: লেখক