বেঁচে থাকার গল্প…

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

ঈদ শেষে পরের কয়েক দিন খালি খালি লাগে। রমজান মাসের ঈদ চলে গেলে আরো বেশি বেশি লাগে। এক মাস ধরে অপেক্ষা। এক দিনেই শেষ।

লোক জন ঢাকা ফিরতে থাকে। কাজে ফিরতে থাকে। গ্রামের বাড়ীগুলো ভাঙ্গা হাটের মতো পড়ে থাকে।

জামালপুর শহর

সরিষাবাড়ীর জেলা শহর জামালপুর। ছোট-খাট শহর। এক রাস্তার শহর। খুব জম-জমাট বলা যাবে না। কিন্তু আমার কাছে জম-জমাটই লাগতো। সরিষাবাড়ী থেকে যেতাম। ছোট ছিলাম। বড় শহর তখনো দেখি নি। তাই বড় লাগতো। আব্বার সংগে যেতাম। ঈদের জামা-কাপড় কিনতে।

লোকাল ট্রেন। ঘন্টা খানেক লাগতো। জামালপুর ষ্টেশনে এসে দাড়াতেই গম গম শব্দ এসে আছড়ে পড়তো গাড়ীর কামরাতে। জানালা দিয়ে দেখা যেত ষ্টেশন ভর্তি মানুষ আর মানুষ! হৈ-চৈ..ফেরিওয়ালা..দোকান…। ষ্টেশনে বড় বড় কাপড়ের ব্যানার লাগানো থাকতো। বেশির ভাগ ব্যানার লাল কাপড়ের হতো। নানান কিছু লেখা থাকতো। বিজ্ঞাপন-টিজ্ঞাপন হবে হয়তো।

বাড়ী ফিরে বোনদের চোখ গোল গোল করে বলতাম…’জানো…বড় বড় লাল কাপড়ে লেখা আছে…”ঈদ আসছে..ঈদ!!” বানিয়ে বানিয়ে বলতাম। আমি তখনো পড়তে শিখিনি।

জামালপুর শহরের নাম রাখা হয়েছে পীর শাহ জামালের নামে। সেখানে তার মাজার এখনো আছে। শাহ জামাল ইয়েমেন থেকে এসেছিলেন। তখন এই বাংলায় মোঘল বাদশা আকবরের রাজত্ব চলছিলো। পীর শাহ জামালকে নিয়ে একটা মজার গল্প আছে। সে যখন ইসলাম প্রচারের জন্য বেরিয়ে যাচ্ছিলো তখন তার মা তাকে ইয়েমেনের এক মুঠো মাটি দিয়ে বলেছিলো…”যে দেশে এই মাটির মতো মাটি পাবে সেই খানে বসতি করো।“ শাহ জামাল ঘুরতে ঘুরতে এই জামালপুরে এসে সেই মাটির সন্ধান পেয়েছিলেন। আমার ইয়েমেন যাওয়ার ইচ্ছে আছে। ইয়েমেনের মাটি কি আসলেই জামালপুরের মাটির মতো দেখতে?

জামালপুর শহর

এলাকার নাম পীর-আওলিয়া…আধাত্মিক পুরুষদের নামে শুধু বাংলাদেশেই হয় না। আমি যে কয়েকটি দেশে গেছি সব জায়গায় এই রীতি দেখেছি।

এখন কানাডায় থাকি। সেইন্ট এন্ড্রু…..সেইন্ট জর্জ…। সেইন্ট জর্জ সবচেয়ে বিখ্যাত। তার নামে ষ্টেশন। কলেজ। শহর। খ্রীষ্টান ধর্মালম্বীদের কাছে সেইন্ট জর্জ খুব সম্মানিত সাধু পুরুষ। শুধু কানাডা না, দেশে দেশে তার নাম ছড়িয়ে আছে।

মজার বিষয় হলো আমাদের ইসলাম ধর্মে যে চার জন জীবিত নবীর নাম রয়েছে তাদের দুজনের একজন এই সেইন্ট জর্জ হতে পারেন বলে সন্দেহ করা হয়। যেমন আমরা বলি হযরত ইসা (আ:)। তারা বলে জিসাস ক্রাইস্ট। সেইন্ট জর্জ তেমনি হযরত খিজির (আ:) বা হযরত ইলিয়াস (আ:) হতে পারেন বলে কোন কোন ধর্মবিদ মনে করেন। সবই অনুমান। কোন নিশ্চিত প্রমান নেই।

কানাডার সেইন্ট র্জজ শহর আমার বাসা থেকে মাত্র ১১৭ কি:মি: দূরে। জামালপুরের মতোই ছোট্ট শহর। কিংবা আরো ছোট। টেনেটুনে মাত্র হাজার তিনেক মানুষ বসবাস করে। বলার মতো তেমন কিছু নেই এই মফস্বল শহরে। সেপ্টেম্বর মাসে আপেল উৎসব হয়। পুরো শহর আপেলে আপেলে ভরে যায়। এই যা।

এই বিন্দুর মতো ছোট্ট শহরেই আকাশের মতো এক বিশাল ঘটনা ঘটেছিলো ২০১৫ সালে। শোনাবার ইচ্ছে হয়েছে অনেক দিন। চেষ্টা করেছি অনেক বার। হয় না। যেভাবে বলতে চাই…..হয় না। আজো হবে না জানি। কিন্তু এই গল্প না বললে অন্য গল্পে যেতে পারছি না। ইভান যেতে দিচ্ছে না।

ইভান আর তার মা নিকোল। সেইন্ট জর্জ তাদের শহর। ইভানের জন্ম ২০০৮ সালে। তার বয়স যখন দুই তখন ধরা পড়ে তার ব্রেইন ক্যানসার হয়েছে। চিকিৎসা চলতে থাকে। যা যা করা সম্ভব…সব। ২০১৫ সালের অক্টোবর মাস। ডাক্তারদের সকল প্রচেষ্টা শেষ হয়ে আসছিলো। একদিন নিকোল তার ছেলেকে বুকের কাছে রেখে আস্তে জিজ্ঞেস করলো, “ইভান, তোমার কিছু পেতে ইচ্ছে করছে? কিছু করতে? কিছু খেতে?”

নিকোল ভেবেছিলো…. সাত বছরের ইভান চকলেট চাইবে। খেলনা। বা কোন রেষ্টুরেন্ট। ইভান বললো, “মা, আমি ক্রিসমাসের আনন্দ করতে চাই।“

অক্টোবর মাস। ক্রিসমাস হবে সেই ডিসেম্বর ২৫। ডাক্তার জানালেন ইভানের এতো সময় নেই। সাত বছরের ইভানের আর আট হওয়া হবে না।

এরপরের ঘটনা ইতিহাস! ইভান খবরের বড় বড় শিরোনাম হয়েছিলো।

“The Boy who moved the Christmas” !!

সেইন্ট জর্জ বাসীরা তাদের জীবনে প্রথম বারের মতো অক্টোবরে ক্রিসমাস উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো সেবার। শুধু ইভানের জন্য। সেই খবর ছড়িয়ে গিয়েছিলো। ছাড়িয়ে গিয়েছিলো এলাকা…দেশের সীমানা। কানাডা থেকে ইউ. এস…………ইউ. কে. হয়ে পৃথিবীর ঐ মাথায় অষ্ট্রেলিয়ায়!

২৪শে অক্টোবর, ২০১৫। ছোট্ট সেইন্ট জর্জ শহরের বাড়ীতে বাড়ীতে ফুল আর ক্রিসমাস বাতিতে সাঁজানো হয়েছে। দোকান-পাট সেঁজেছে। ইভান তার হাসপাতালের জানালা দিয়ে দেখেছে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে ১২ ফুট লম্বা ক্রিসমাস ট্রি লাগিয়ে দিয়ে গেছে। একটি ফিল্ম কোম্পানী তাদের স্নো মেশিন ফ্রি পাঠিয়ে দিয়েছে। সেই স্নো মেশিনে অক্টোবরের ১৭ ডিগ্রী তাপমাত্রায় চারিদিকে কৃত্রিম স্নো ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

সেইন্ট জর্জ ভিলেজ

ক্রিসমাস প্যারেড হয়েছে। সাত হাজারের উপর মানুষ হয়েছিলো সেই প্যারেডে। সেইন্ট জর্জ শহরের মোট অধিবাসীদের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি! ইভানকে ভালোবেসে মানুষ এসেছিলো। দুর-দুরান্ত থেকে এসেছিলো।

ইভান বড় হয়ে পুলিশ হতে চেয়েছিলো। স্থানীয় পুলিশ তাকে সেই দিন অনারারী পুলিশ অফিসার হিসাবে সম্মানিত করেছিলো।
ক্রিসমাস প্যারেডে সান্টা ক্লজের কোলে পুলিশের ইউনিফর্ম পড়ে হাজারো মানুষের সংগে ইভান হেসেছে। প্যারেড শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছে।

ইভান আসলেই ডিসেম্বর ২৫ পর্যন্ত যেতে পারেনি। ডিসেম্বর ৬, ২০১৫ তার ছোট্ট জীবনের শেষ দিন হয়ে আছে।

মা নিকোল ইভানের নামে একটা ফাউন্ডেশন করেছে। সেই ফাউন্ডেশন শিশুদের ক্যানসার নিয়ে গবেষনায় অর্থ জোগান দেয়।

মৃত্যুর সংগে মানুষ পারে না। রোগ-শোক-জরা…নিয়তি। অনেক কিছুই অজেয় থেকে গেছে মানুষের। হয়তো থাকবে ভবিষ্যতেও। কিন্তু নিশ্চিত মৃত্যুর সেই রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে প্রিয় মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রতি দিন…প্রতি মুহুর্ত বেঁচে থাকার এই দু:সাহস মানুষ দেশে দেশে দেখিয়েছে। বারবার দেখিয়েছে।
(পরিশেষ: ইভানের গল্পে অনুপ্রানিত হয়ে কোলকাতায় এই বছর নির্মিত হয়েছে ছবি ‘উমা’। সেই ছবির রিলিজে উপস্থিত ছিলেন ইভানের মা নিকোলও। ছবির জন্য অনুপম রায় ‘জাগো উমা’ শিরোনামে একটি গান তৈরি করেছেন। অদ্ভুত সুন্দর সেই গান মানুষের অসীম সামর্থ্যকেই ধারন করেছে।)

ছবি: গুগল