শ্রাবণ সন্ধ্যাগুলো কতই না ভেজায় আমায়!

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

আজ এই ভরা আষাঢ়ে শ্রাবণধারা ঝরছে। খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো খিচুড়ি রাঁধি, যেমন ইচ্ছা তেমন কাজ।চাল ডাল ধুয়ে যেমন তেমন চড়িয়ে দিলাম! গোস্ত রাঁধা আছে একগাদা,সালাদ কাটলেই হবে,ভাবতেই দেখি ঝমঝম বৃষ্টি! বাঘমামা (আমার হাজব্যান্ড) কিছু না জেনেই ঘর থেকে চেঁচাচ্ছেন, এইইইইই— (এহ,যেন আমার কোন নাম নাই) ভাত চড়াইয়ো না,খিচুড়ি রাঁধো! আমি বলি, তুমি বলার আগেই আমি খিচুড়ি বসিয়েছি। সাংসারিক কাজে মেতে আছি,কিন্তু মন আমার অন্য জায়গায়।কদিন আগেই কন্যা আর জামাতার সঙ্গে গেছিলাম কক্সবাজার। পয়লা গেছি মারমেইড ইকো বীচে।সেখান থেকে ইনানী বীচ।যাওয়ার সময়ই বৃষ্টি হচ্ছিলো।খুব মজা লাগছিলো। কিন্তু সঙ্গে দুইটা নাতীনাতনী।তাদের যদি ঠাণ্ডা লাগে? তাদের বাবা-মা ড্যামকেয়ার এবং জলজ পোকার মত,কিছুতেই তারা নিজেদের পানি থেকে দূরে রাখতে পারেনা।দুইদিন পর পর খালি সাগর আর সাগর।তো সৈকতে গিয়ে বসলাম। আঁধার ঘিরে ঘন হয়ে এসেছে।যেন দুনিয়ার অভিমান আকাশের গালে! টোকা দিলেই গলে যাবে।বাচ্চাগুলো বালু দিয়ে মাখামাখি করে একাকার। আর তাদের বাবা-মা সমুদ্রে ভাসছে।আমি একলা হয়ে গেছি।গুনগুনিয়ে গান গাইছি।ঘন ঘোর বরিষণ মেঘ ডমরু বাজে,শ্রাবণ রজনী আঁধার! নাতনী জুওয়াওরিয়ার বালুতে খেলার অদ্ভুত সুন্দর খেলনার লোভে একটা পথশিশু এসে একত্রে খেলছে।আমার গান শুনে সেই পথশিশু বলে খালাম্মা, আপনার গান এতো সুন্দর, আপনি জোরে গাইলে এখানে যারা এই যে চেয়ারে বসে আছে সাগরের সামনে সবাই অনেক পয়সা দিবো। কিন্তু মধু খই খই বিষ খাবাইলা গাইতে হবে।এই গান যে গায় তাকেই সবাই পয়সা দেয়! আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝিনা! কথা ঘোরানোর জন্য নাম ঠিকানা শুধাই কিন্তু আমার নিজের ভাবনাই ঘুরে যায়! ছোটবেলায় চলে যাই।এই হয়েছে এক অভ্যাস! যেখানেই ভাবনা, সেখানেই শৈশব! বর্ষা কাল,থৈথৈ পানি।ওস্তাদজীর বাসা মোহাম্মাদপুর।সেখান থেকে গান শিখে বিকেলবেলা বাসে এসে মালিবাগে নেমে রিকশায় মাদারটেক।কিন্তু আব্বা বাসাবো ভাংগা বিল্ডিং এর কাছে এসেই নৌকা নিলেন। গন মানুষ পারাপারের নৌকার আঞ্চলিক নাম “গুদারা” জনপ্রতি চার আনা ভাড়া।টলটলে পানি।ছলাৎছলাৎ বৈঠা পানি কেটে কেটে চলছে দারুণ ভঙ্গিতে।কি অপূর্ব টলটলে পানি,নীচের শ্যাওলার দোলাচল স্পষ্টই দেখা যায়।নৌকার কিনারে বসে ঝুঁকে নিজের প্রতিবিম্ব চাক্ষুষ করায় ব্যাস্ত আমি।হঠাৎ নিজের ছায়ায় চমকে চমকে কিছুর ছটা! না তাকিয়েই বুঝলাম বৃষ্টি! অঝোর ধারায় বৃষ্টি! হঠাৎ গানের খাতায় চোখ গেলো। হাতের কাছেই ছিল সেটা।খাতাটাকে বুকে জড়িয়ে নিলাম।কিন্তু বৃষ্টি বেড়েই চলছে।বড় বড় ফোটা গায়ে বিঁধে যাচ্ছে।সব কিছু এড়িয়ে গিয়ে গানের খাতায় নজর দিলাম। জীবন ভেসে যাবে যাক,গানের খাতা বাঁচাতেই হবে।আমি একদম উপুড় হয়ে খাতাটাকে পেটের ভেতর নিচ্ছিলাম।চুল বেয়ে বেয়ে পানির তোড় মুকে ঢুকে যাচ্ছিল।পুরো এলাকার পানির উপরটা কালো টলটলে রূপ বদলে রুপালী হয়ে উঠেছে।বৃষ্টির তোরে আর কারো কথা শোনা যাচ্ছেনা এমনকি নৌকার মাঝিকেও দেখা যাচ্ছেনা। গুদারা কোন দিকে যাচ্ছে তাও জানিনা।ভয় পাচ্ছিনা মোটেও।কারণ সাঁতার জানি দারুন।কিন্তু গানের খাতা? তাকে বাঁচিয়ে সাঁতরে কূলে ওঠা কঠিন,আর শুনেছি পানির নীচে কি যেন পা টেনে অতলে নিয়ে যায়,এরকম ভাবনার মাঝেই আব্বা হাত ধরে বললেন,মাগো ভয় পাচ্ছোনাতো?লজ্জা পেয়ে বলি নাহ আব্বা ভয় পাবো কেন?আব্বা বলেন আমার গাঁ ঘেঁষে বসো।ঠাণ্ডা কম লাগবে, আরে তাইতো! এতক্ষণ বুঝিইনি,ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে কাঁপছি।কিন্তু অনুভব করছি গানের খাতা শুকনাই আছে।আলহামদুলিল্লাহ!!! সৈকতে বসা অবস্থাতেই বিশাল বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামলো। নাতী আমমার বিন ইয়াহইয়া কে কোলে তুলে নিলাম।জুওয়াইরিয়াও নিজে থেকে বালুর খেলনা ফেলে রেখে এসে আমার কোলে গুঁজে দিলো নিজেকে।এ যেন সেই গানের খাতা,যাকে আমি শুকনো রেখেছিলাম,বা রাখতে পেরেছিলাম।মনে মনে ওদের বাবা-মাকে বেয়াক্কেলে বলে বকে দিচ্ছিলাম আর বাচ্চা দুটোকে একটা টাওয়েলে জড়িয়ে নিলাম।মাথার উপরকার সাগর সৈকতের রাবার ক্লথের ছাতা কখন বাতাসে সরে গেছে! বাচ্চাদের বাবা-মা এসে আমাদের তিনজনকে উদ্ধার করে ছোটটাকে ব্যাগে আনা বিশাল এক টাওয়েলে পেঁচিয়ে নিলো। আমরা ভিজতেই থাকলাম। কি এক অদ্ভুত নেশা ধরা বৃষ্টি! কোথা থেকে আমাকে কোথায় নিয়ে গেছিলো! হঠাৎ নাকে পোড়া গন্ধ আর চিৎকার। এইইইইইই( আমার কি আসলেই কোন নাম নেই? নামহীন অবস্থাতেই আব্বা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন?) কি পোড়ে কি পোড়ে,আমি চমকে উঠে দেখি আমার খিচুড়ি পোড়া ধরেছে। আল্লাহ! একজীবনে এতকিছু পোড়া লাগে কেন? বৃষ্টির এতো শক্তি,সব পোড়া গুলো কেন সে ধুয়েমুছে ছাফ করে দেয়না!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে