নীলকুঠি কান্ড

দীপারুণ ভট্টাচার্য্য

মুর্শিদাবাদ জেলার এই অঞ্চলে নদীটি কেমন যেন নাচতে নাচতে ওদিকে চলে গেছে। একটা আন্তর্জাতিক সীমানার এদিক ওদিক বদলে গেছে নদীর নাম ধাম। কয়েকটা চর ছড়িয়ে আছে এপারে ওপারে। এই গ্রামের নাম কেন যে রাণীতলা, কে জানে।

থানার পাশ দিয়ে যেতে যেতে এক সময় রাস্তা ফুরিয়ে যায়। তখন শুধুই ধানি জমি। জমির আলের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূরে একটা উঁচু ঢিপি। কেউ কেউ বলে নবাব আমলের অনেক নরকঙ্কাল আছে ওই ঢিপির নীচে। সন্ধের পর এদিকে বিশেষ কেউ আসে না। লিটন অবশ্য তার ব্যতিক্রম। গ্রামে তাদের চাষের জমি, মাছের পুকুর, গরু বাছুর সবই আছে। খুব বেশি পড়াশুনা শেখেনি লিটন। কিন্তু নতুন কিছু জানতে তার উৎসাহ সব সময়। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো তার ভয় হীনতা। মন খারাপ হলে সে একা একা এসে বসে থাকে এই ঢিপির উপর। কি দিন কি রাত। গ্রামে বাবুল আর টুটুনই তার বন্ধু। রাত-বিরাতে তারাও দু-এক বার ঢিপিতে বসেছে লিটনের পাল্লায় পড়ে।

এককালে এই অঞ্চলে নীলকর সাহেব ছিল। মাঠের শেষে নদীর পাড়ে নীলকুঠির ভাঙ্গা অংশটা এখনও পড়ে আছে। তার সামনে বিরাট এক পুকুর। লোকে বলে যেসব চাষীরা নীল চাষ করতো না তাদের ধরে নিয়ে ওই পুকুরে ডুবিয়ে মারা হতো। একদিন সব চাষীরা চড়াও হয়ে নীলকর সাহেবকে পিটিয়ে মারে ওই কুঠিতে। সেই থেকে বাড়িটা ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে আছে। পুকুরটাও আছে। কিন্তু কেউ মাছ ধরতে পারেনা সেখানে। রফিকুল একবার জাল নিয়ে নেমেছিল, আর ওঠেনি। অনেকে বলে নীলকুঠি আর পুকুরে নাকি ভূতদের বাস। রাতে সাহেব ভূতের সঙ্গে চাষী ভূতের ঝগড়া বিবাদ হয়। কেউ রাতের বেলা সেখানে যায়না।

ঢিপির উপর থেকে দেখা যায় দূরের নীলকুঠি। লিটন অবশ্য কখনও কিছু দেখেনি বা শোনে ও নি। ভূতে তার বিশ্বাসই নেই। সে বলে, “ভূতের জন্য নয়, লোক মরে ভয়ে, হার্টফেল করে।” বাবুল আর টুটুন সে কথা মানে না। একদিন মিজানের চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে তর্ক শুরু হয়। কথা হয় লিটন যদি সারারাত ওই নীলকুঠি তে থাকতে পারে তবে বাবুল আর টুটুন তাকে পাঁচ হাজার টাকা দেবে। লিটন রাজি হয়। বাড়ি ফেরার পথে মিজান তাকে ডেকে বলে, “জায়গাটা ভালো নয় লিটন, যাসনি। ভূত না থাক সাপখোপ তো আছে। এই সব বাজি বন্ধু বন্ধুতে বিভেদ করে। করিস না এসব।”

অকুতোভয় লিটন সাবধান বাণী শুনতে রাজি নয়। কাজেই এক অমাবশ্যার রাতে তার নীলকুঠিতে থাকা ঠিক হয়। সকালে ভাঙা বাড়ির ভিতরের জঙ্গল সাফ করে দেয় সে। সারারাত মাটিতে বসে থাকাটা ঠিক নয় তাই কিছু বাঁশ আর খড় রেখে দেয় লিটন। একটা ছোট মাচা বেঁধে খড় বিছিয়ে শুয়ে পড়লেই রাত কাবার।

বাবুল আর টুটুন সন্ধের পর খাবার, হ্যারিকেন, টর্চ, মশার ধুপ কিছুটা দড়ি সহ লিটনকে পৌঁছে দিয়ে যায় নীলকুঠিতে। মাটি খোঁড়া বা আত্মরক্ষার জন্য লিটন সঙ্গে এনেছে একটা লোহার সবল। বাবুল আর টুটুন চলে যেতে সে জলন্ত হ্যারিকেনটাকে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে বেঁধে দেয়। জায়গাটা বেশ আলো আলো হয়ে ওঠে। নীলকুঠির বৈঠকখানায় একটি অংশের কড়ি বর্গার ছাদ এখনও আছে। বাকি সবই ভেঙ্গে পড়েছে। ছাদওয়ালা জায়গাটার একদিকের দেওয়ালটা ভাঙ্গা। সেখান থেকে পুকুরটা দেখা যায়। এই জায়গাটাতেই মেঝে খুঁড়ে বাঁশের মাচা বানাতে শুরু করে লিটন। রাতে বৃষ্টি হলে অন্ততঃ মাথাটা বাঁচবে। নীলকুঠির পিছন দিকেই নদী। সেখানে কিছু লঞ্চ চলাচল করে। তারই একটু একটু আলো আসছে কখনও কখনও। এ বাদে কোনো আলো বা শব্দ নেই।

মাচাটা শেষ করতে ঘন্টা দুয়েক লাগে তার। কাজ থাকলে সুন্দর সময় কাটে। বাঁশের মাচায় বসে একটা সিগারেট ধরায় লিটন। খানিক বাদে হাত পা ধুয়ে মুছে রুটি আর আলুপটলের তরকারি দিয়ে খাওয়া শুরু করে। খেতে খেতে হঠাৎ একবার একটা ফিসফিস কথা বলার শব্দ তার কানে আসে। কিন্তু সে পাত্তা দেয় না। খাবার শেষ করে মুখ ধুয়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধারায়। আকাশে চাঁদ নেই তাই ঠাওর হয় না। তবু যেন মনে হয় পুকুরের ওপারে এক জায়গা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। টর্চের আলোয় সে ঠিক বুঝতে পারে না।

ফিরে এসে মাচায় বসে লিটন। রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। ঘুম পায় তার। মাচায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সে। হঠাৎ কুকুর ডাকার আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গে লিটনের। এখানে তো কুকুর থাকার কথা নয়! লোকজন নেই, খাবার পাওয়ার সুযোগ নেই! লিটন উঠে বসে। ভাঙা দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে পুকুরের কিছুটা অংশ দেখা যায়। হঠাৎ একটা নুপুরের শব্দ লিটনের কানে আসে। মনে হয় যেন কেউ ছাদের উপর থেকে দৌড়ে পিছনে নদীর দিকে চলে গেল। নুপুরের শব্দে লিটন প্রথম একটু ভয় পেয়ে যায়! তবে কি নীলকুঠিতে বাইজি নাচ হতো এক কালে! লিটন ঘড়ি দেখে, একটা বেজে গেছে। বাইরে বেশ একটা ঠান্ডা হওয়া চলছে। চাদরটা জড়িয়ে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে লিটন। না আজ রাতে আর ঘুম হচ্ছে না। চুপ চাপ কেটে যায় প্রায় আধা ঘন্টা। হঠাৎ মনে হয় বাড়ির ছাদ থেকে কে যেন ঝাঁপ দিয়ে পড়ল পুকুরে। “এই কে রে, কে রে” বলে চিৎকার করে বাইরে বেরিয়ে আসে লিটন। তার চিৎকারে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। হাতে তার চক চক করছে ধারাল সাবলটা। পুকুরে টর্চ মারে লিটন। কিছুতো নিশ্চই পড়েছে। কিন্তু এতো দূর থেকে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়াটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না লিটন। তাবে কি পুকুরে বড় জাতের কোন মাছ আছে! ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা সে। এদিক ওদিক টর্চের আলো ফেলে লিটন। তেমন কিছু খুঁজে পায় না যাকে সন্দেহ করা যায়। একটা সিগারেট ধরায় এবার। তারপর আবার এসে বসে মাচার উপর। জায়গাটা হঠাৎ কেমন যেন অন্ধকার অন্ধকার মনে হয় তার। হ্যারিকেন এতটা কমে গেল কি ভাবে! কাছে গিয়ে আলো বাড়িয়ে চমকে ওঠে লিটন, তার পায়ের কাছেই একটা মরার খুলি!

ভয়ে প্রায় কাঁপতে কাঁপতে মাচায় এসে বসে লিটন। চাদরটা মুড়ি দেয়। মনে মনে কি যেন বিড়বিড় করতে থাকে সে। এখন মনে হচ্ছে বাজি না ধরলেই ভালো হতো। মনে হয়, দৌড় লাগবে গ্রামের দিকে, ঠিক তখনই পাঁচ হাজার টাকার কথা তার মনে পড়ে। সকালে ফটিকের চায়ের দোকানে দেখা করার কথা। টর্চের আলোয় ঘড়ি দেখে লিটন। তিনটে পাঁচ। আর মাত্র ঘন্টা দেড়েক সময় কাটতে হবে। টর্চ বন্ধ করতে গিয়ে হঠাৎ মাচার কোনার দিকে নজর যায় তার। এক টুকরো সাদা কাপড়। মনে হয় মেয়েদের ওড়না। ভিতরে ভিতরে শুকিয়ে যায় লিটন। উত্তেজনায়, আওয়াজ বেরোয় না তার মুখ দিয়ে। হাত বাড়িয়ে মাচার নিচের বোতলটা হাতে তুলে নেয় সে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। বোতল উঁচু করে গলায় তরল ঢালতেই “ওয়াক” উঠে আসে। বমি করার মতো মুখ থেকে বেরিয়ে তরল ছড়িয়ে যায় ঘরের মধ্যে। আঁশটে এক বিস্বাদ গন্ধ নাকে মুখে লেগে থাকে তার। টর্চের আলোয় বোতলের তরলটিকে সম্পূর্ণ লাল রক্তের মতো লাগে। লিটন হাঁপাতে থাকে। তার গলা দিয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে স্পষ্ট গোঙানির শব্দ। সে গামছা দিয়ে মুখের ভিতরটা মুছতে থাকে।

এমন সময়, আবার ছাদে নুপুরের শব্দ শুরু হয়। ধীরে ধীরে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে সেই শব্দ। লিটন মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে। কোন ভাবেই মাথা নোয়াবে না সে। শেষ তাকে দেখতেই হবে। চিৎকার করে ওঠে লিটন, “সামনে আয় শালা”। মাচা থেকে নেমে হ্যারিকেন বাড়িয়ে দেয় লিটন। প্রাণপনে জ্বলতে থাকে আলোটা। ঘুরে দাঁড়ায় লিটন। স্বজোরে লাথি মারে মড়ার খুলিটা কে। সেটা গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যায় অন্যদিকে। লিটন এখন অকুতোভয়। আবার চিৎকার করে সে, “সামনে আয় শালা”। সবল বাগিয়ে মাচার উপর বসে লিটন।

চিৎকারের পরেই নুপুরের আওয়াজটা থেমে যায়। এরপর কিছুক্ষনের নীরবতা। তারপরেই আবার শব্দ। যেন ঘুঙুর পায়ে কেউ ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভাঙা দেওয়ালের ওপারে কি যেন একটা দেখতে পায় লিটন। সে চিৎকার করে, “আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।” এমন সময় শুরু হয় হাসির আওয়াজ। লিটনের মনে হয় ভাঙা দেয়ালের ওপারে বুঝি নাচছে দুটো সাদা কাপড়ে ঢাকা মূর্তি। সারা শরীর থর থর করে কাঁপতে থাকে লিটনের। দাঁতে দাঁত চেপে প্রায় সমস্ত শক্তি দিয়ে সে সাবলটা ছুঁড়ে দেয় ভাঙা দেয়ালের মধ্যে দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে একটা দমফটা চিৎকার তার কানে আসে। একজন যেন লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে।

ভাঙা নীলকুঠি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসে লিটন। বাইরের জমিতে লুটিয়ে আছে টুটুন। জায়গাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। চিৎকার করে কেঁদে ওঠে বাবুল; “এ তুই কি করলি লিটন”।
মৃতদেহ থেকে রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে পুকুরের দিকে।

ছবি:সোময়েত্রী ভট্টাচার্য্ ও গুগল