ফুটবল- রঙ্গ ভরা বঙ্গে

একবার এক ছোট্ট ছেলে মাঠে গেছে ফুটবল খেলা দেখতে। সঙ্গে তার বাবা। খেলার মাঝখানে হঠাৎ ছেলে জিজ্ঞেস করল :

বাবা, সবাই বলটার পিছনে ছুটছে আর লাথি দিচ্ছে কেন?
ওরা গোল করার চেষ্টা করছে।
বলটা তো গোলই আছে। আর কত গোল করবে?

ছেলের কথা শুনে পিতার বজ্রাহত না হয়ে আর কোনো উপায় তো নেই। ফুটবল এই বঙ্গদেশে আমাদের এক অর্থে বজ্রাহতই করে রেখেছে। আশ্চর্য খেলা এই ফুটবল। একটি চর্মগোলককে লাথি মারতে মারতে প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে প্রবেশ করানোর সাধনায় এবং কৃতিত্বে বিশ্বের বহু খেলোয়াড় কোটি কোটি মানুষের করতালি এবং প্রশংসায় ধন্য হয়েছেন।  ফুটবল খেলার মাঠে সে কী উত্তেজনা, সে কী উৎকন্ঠা, সে কী উদ্বেগ! এই উদ্বেগ আর উত্তেজনার জ্বরে এখন পুড়ছে  আমাদের দেশ। বিশ্বকাপের খেলা চলছে সুদূর  রুশদেশে। আর সেই খেলা নিয়ে নির্ঘুম আমাদের রজনীকাল। চায়ের কাপে ঝড়ের চেয়েও অনেক বেশীকিছু ঘনিয়ে উঠছে, চলছে প্রতিপক্ষ সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ধারালো বাক্যবান নিক্ষেপ, স্বামীস্ত্রী সংসারে দৈনন্দিন ঝগড়াবিবাদে লিপ্ত হচ্ছেন,  প্রিয় ফুটবল দলের সমর্থন করাকে কেন্দ্র করে তামাশা করতে গিয়ে গ্রামে গ্রামে মারামারি বেধে যাচ্ছে, চলছে কিলচড় বিনিময়। প্রিয় দলটির দেশের পতাকা বাসার ছাদে উড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে মানুষ। দেদারসে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন দলের জার্সি।  ফুটবলের এই জ্বরে কম্পমান গোটা দেশ। এই গোল বল বাড়িয়ে তুলেছে গোলমালের মাত্রা। চারদিকে একই শোরগোলফুটবল।

এই ফুটবল খেলা নিয়ে বাংলাদেশে ঘটে চলা বিচিত্র সব কাণ্ডকারখানার গল্প নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন।

বিদেশী বার্তাসংস্থা এএফপি খবর জানিয়েছে, ‘লাতিন আমেরিকান জায়ান্টদের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র নেই, বিশ্বকাপে তাদের জাতীয় দলও অনুপস্থিত। দলটা র‍্যাঙ্কিংয়ে ২১১ টা দলের মধ্যে ১৯৪তম, তারপরও  বিশ্বকাপ জ্বরে কাঁপছে পুরো দেশ।’

পছন্দের দলের পতাকা উড়ানোর প্রতি দেশ মানুষের  মোহ নিয়েও সংবাদ সংস্থা লিখেছে, ‘১৬ কোটি মানুষের এই দেশের শহরগুলো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকায় সয়লাব। দেশটার নাম বাংলাদেশ।’ ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার নিজ দেশের সমর্থকদের পর বাংলাদেশেই তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমর্থক সংখ্যা।রোনালদোর পর্তুগালকে সমর্থন জোগাতে রাশিয়া গেছেন পর্তুগালের একাধিক বাংলাদেশী সমর্থক। সেখানে স্টেডিয়ামে পর্তুগীজদের সঙ্গে গলায় গলা মিলিয়ে তারা গান গাইছেন। সেখানে পর্তুগীজরা বাংলাদেশের নাম শুনতেই গেয়ে ওঠে ‘ ওলে ওলে ও বাংলাদেশ ’

কোনো এক জেলা শহরে এক ভদ্রলোক মুগ্ধ আর্জেন্টিনা দলের নামে। তার মুগ্ধতা এতোটাই যে নিজের চার পাঁচ তলা বাড়ির পুরোটাই তিনি আর্জেন্টিনার জার্সির রঙ নীল আর সাদায় চিত্রিত করে ফেলেছেন। কম যান না ব্রাজিল সমর্থকও। তিনি নিজের বাড়ির রঙ ব্রাজিল দলের সমর্থনে হলুদে পাল্টে ফেলেছেন। সবই ঘটেছে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা নিয়ে।

বাঙালির ফুটবল নিয়ে এই উন্মাদনা আজকের নয়। সেই শৈশবে দেখেছি বাংলাদেশের দুই বড় দল আবাহনী আর মোহামেডানের খেলা নিয়ে নানা সমর্থকদের কাণ্ডকারখানা। দলদু’টিকে সমর্থন করতে গিয়ে ঢাকা স্টেডিয়ামে মানুষের প্রাণও গেছে সংঘর্ষে। তবু চায়ের কাপে বাঙালির ফুটবল ঝড় যেন থামতেই চায় না। কাল্পনিক থার্মোমিটারে চড়তে থাকে উত্তেজনার পারদ। সেদিন একজনকে জিজ্ঞেস করলাম :

– ভাই কোন দলের সাপোর্টার.?
– আরে ধুর, রাখেন আপনার সাপোর্টার। ফুটবল একটা খেলা হইল। হুদাই সময় অপচয়।
– কি আর এমন অপচয়.! মাত্র নব্বই মিনিটের খেলা।
– আরে এটাই তো সমস্যা। একটু জুত করে বসতে না বসতেই খেলা শেষ। এইটা কিছু হইল। টানা পাঁচ ছয় ঘন্টা যদি দেখতেই না পাইলাম তাইলে আর কিসের মজা। 

এই হলো বাঙালির ফুটবল নিয়ে উন্মাদনার মাত্রা। আরেকদিন অফিসে বসে কাজ করছি। হঠাৎ এক পরিচিত ছেলে এসে হাজির। অনেকক্ষণ আড্ডা চললো। বিষয় ওই একটাই ফুটবল। কার কতো পয়েন্ট, কোন দল কার কাছে হেরে গেলে অন্য আরেকটি দল নক আউট পর্বে উঠতে পারবে না, এইসব আলোচনা চললো অনেকক্ষণ। কিন্তু সেই ছেলেটি আর বাসায় ফেরার নাম করে না। সেদিন রাতে আর্জেন্টিনা দলের খেলা। অফিস বন্ধ করার সময় ছেলেটি জানালো, সে রাতে তার বাড়ি ফেরা অনিশ্চিত। কারণ আর্জেন্টিনা সমর্থক তার স্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন তার দল না জিতলে রাতে খাবার বন্ধ, বাড়িতেও নিশিযাপনের অনুমতি মিলবে না। অসহায় স্বামীর অপরাধ সে জার্মানীর সমর্থক। তাই কোনো বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটানোর পরিকল্পনা করছে সে। যদি আর্জেন্টিনা হেরে যায়?

ভীতু স্বামীর এই যাতনার কথা কী কোনোদিন আর্জেন্টিনার ফুটবল যোদ্ধারা জানতে পারবে? পারবে না। যেমন জানতে পারবে না রিয়াদকে তার প্রেমিকা কথা দিয়েছে তার পছন্দের টিম ব্রাজিল বিশ্বকাপ জয় করলে সে চুমু খাবে তাকে। বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সমর্থক না হয়েও রিয়াদ প্রতিদিন প্রার্থনা করছে ব্রাজিলের জন্য। কিন্তু কিশোরগঞ্জের দুটি গ্রামের মানুষ কিন্তু রিয়াদ আর তার প্রেমিকার মতো নয়। ভালোবাসার চুম্বনকে অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রাখেনি তারা। খেলা নিয়ে বাদানুবাদের ফলাফল হচ্ছে লাঠি, বল্লম নিয়ে দুই গ্রামের মানুষের সংঘাতে জড়িয়ে যাওয়া। সেখানে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ‍বাঙালির ফুটবল ফান্ডা কিন্তু এভাবেও চলছে।

বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের হাসির গল্পের এক চরিত্র প্যালা মাঠে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিলো। তাদের পাড়ার ক্লাবের এক খেলোয়াড় আহত হওয়ায় দলের ছেলেরা জোরজবরদস্তি প্যালাকে মাঠে নামিয়ে দিলো। প্যালা ভীষণ আপত্তি জানিয়েছিলো। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি। শেষে প্যালা নিজেদের গোলপোস্টে বল ঢুকিয়ে পাড়ার ক্লাবকে আত্নঘাতী গোলে হারিয়ে দিয়েছিলো। প্যালার কী দোষ! সে তো বলার চেষ্টা করেছিলো সেদিন সে ভুলে নিজের চশমার বদলে তার দাদুর চশমা পড়ে বাইরে এসেছিলো। তাই সে সবকিছু ঘোলা দেখছিলো। ফুটবল নিয়ে এমন সরলতামাখা গল্প এখন লেখা হয় কি না জানা নেই। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিদিন একে অপরকে খেলা নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল আর ট্রোল তো দেখতেই পাচ্ছি। তবে শুধু গালাগালই আছে আর কিছুই নেই এ কথাটা পুরো সঠিক নয়। ফুটবল নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মজার মজার ছড়াও রচিত হচ্ছে। এমনি একটি ছড়া-

কুপ্রেমিক তাই তোর অনাচার

নিশ্চুপ হার মানি

তোকে আমি ব্রাজিল ভেবেছি

তুই দেখি জার্মানি।

শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতাতেই নয় একদল সমর্থক আরেকদলের পতাকা নামিয়ে সেটা লুকিয়ে ফেলার ঘটনাও ঘটছে চারপাশে। এ নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় চলছে হাস্যকর সব ঘটনা। একজন তো এমনি এক ঘটনা্য় ছড়া লিখে ফেলেছেন।

যে পতাকা উড়েছিলো বাড়ির আঙ্গিনা-ছাদে

তা যারা-বা নামিয়েছিলো আঁধার কাল রাতে

আবার তা উড়িয়ে দাও প্রিয় মেসির নামে

যদি-না মেসি আবারও ভুলে কোথাও থামে।

এই বাক্যযুদ্ধও এখন বাঙালির বিশ্বকাপ যুদ্ধের অস্ত্র।

এমন ছড়াই শুধু নয়। আরেকজনের পোস্টে লিখেছেন, ব্রাজিল জিতুক আমি চাই। হারলে আমার বউ আর শশুর খুব কষ্ট পাবে…তারা অ্যাকশনে গিয়ে অনেক রিঅ্যাকশন দেখাবে…আমি থাকবো মহাবিপদে।এমন মধুর বিপদে আমাদের ফুটবল ছাড়া আর কোন কাণ্ড ফেলতে পারে? সংসারের সমীকরণও পাল্টে যাচ্ছে, উল্টে যাচ্ছে বন্ধুত্বের ছকও।কিন্তু তারপরেও ফুটবল রঙ্গ চলছেই।

আরেকটি মজার কাহিনী দিয়ে লেখা শেষ করি। এক মোটা লোক গেছে পরিচিত কাপড়ের দোকানে নিজের জন্য এক বিশেষ দলের জার্সি কিনতে। দোকানী সাইজ জানতে চাইলে সে বললো, ট্রিপল এক্স লার্জ। এমন অদ্ভুত সাইজের কথা শুনে দোকানীর চোখ কপালে। শেষে দোকানী হেসে উত্তরে জানালো, এমন মাপের জার্সি পৃথিবীর কেউ আপনেরে দিতে পারবো না ভাই। আপনে এক কাম করেন বিয়া বাড়ির তেরপল কিন্যা হেইটা কাইটা জার্সিটা বানান।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ সংগ্রহ