এ জার্নি বাই পোড়ামন-২

লিমন আহমেদ: স্মৃতি রেখে দেয়ার জন্য হলেও ‘পোড়ামন-২’ ছবি দেখার এই অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা উচিত মনে করলাম। হয়তো একদিন চোখে পড়বে। মিলিয়ে দেখবো অনেক কিছুই। মন সেদিন আনন্দিতও হতে পারে আবার বেদনাহতও হতে পারে…
আমি মূলত বাপ্পারাজের চরিত্র ও অভিনয় নিয়ে বেশি উৎসাহী ছিলাম এই ছবিতে। কারণ সিয়াম-পূজার অভিনয়ের জয়জয়কার শুনে ও দেখে বিশ্বাসী ছিলাম তারা ভালো করেছেন। এবং হয়েছেও তাই। ‘পোড়ামন-২’র সবচেয়ে বড় সাফল্য সিয়াম-পূজার জুটিটি। এই জুটি টিকে যাবে ও জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে বলে আমার বিশ্বাস। সিয়াম তার চরিত্রে ছিলেন অনবদ্য। অমর নায়ক সালমান শাহের ভক্তের আড়ালে তাকে সালমানীয় স্টাইলে হাজির করার চেষ্টা করেছেন কৌশলী পরিচালক রায়হান রাফি। তার সেই প্রচেষ্টা সফল। অনেক সময়ই মনে হয়েছে সিয়ামের অভিনয়ে সালমান শাহের ফ্লেভার রয়েছে…
আর কৈশোরের শাবনূরের আমেজ দিয়েছেন পূজা। সেই চঞ্চলতা, সেই জেদ, সেই প্রেমিকার চেহারা, পূজার; যা শাবনূরকে দেখে পাওয়া যেতো সালমান-রিয়াজের সঙ্গে। পথচলায় কৌশলী হলে পূজার স্থান হতে পারে চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান অভিনেত্রীদের আর্কাইভে…।
যাক, বাপ্পারাজকে নিয়ে বলি। অনেকদিন পর তাকে সিনেমায় পাওয়া। এখানেও বেশ অনেক স্যাক্রিফাইসিং ক্যারেক্টার আছে তার। বেশ গভীরতা আছে চরিত্রের। তবে মন ভরেনি…।
সিনেমাটিতে আলাদা করে চোখে পড়েছে সাঈদ বাবুর সংলাপ ‘ভাল্লাগছে, খুব ভাল্লাগছে’। তিনি অভিনয়েও ছিলেন দুর্দান্ত। নিজের ভিলেন চরিত্রটি নিয়ে তিনি উৎসাহী ছিলেন, যত্নবান ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভালো অভিনেতার যত্ন নেয়া উচিত। পরিচালককে এই ছবিতে সেই যত্ন নেয়ার জন্য ধন্যবাদ…।
তালুকদার সাহেব চরিত্রে নাদের চৌধুরী, পূজার দাদী চরিত্রে আনোয়ারা ও মায়ের চরিত্রে রেবেকা ছিলেন গড়পড়তা। পূজার বান্ধবী চরিত্রটিকে আরও সুযোগ দেয়া যেতে পারতো। এই ধরনের ছবিতে নায়িকার বান্ধবীদের আরও ভূমিকা থাকে এবং দেখতে ভালো লাগে…..
মন ভরিয়েছেন সিয়ামের সাগরেদ চরিত্রে চিকন আলী । হেসেছি তাকে দেখে…।

শেষবেলায় বলি ছবিটির সবচেয়ে বড় অভিনেতার কথা। তিনি ফজলুর রহমান বাবু। দিনে দিনে বাবু তার নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। একদিন এই দেশের দর্শক বলবে, ‘হয়তো আমাদের অনেক কিছু নেই। কিন্তু আমাদের একজন ফজলুর রহমান বাবু আছেন।’ তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, তিনি তার অভিনয়ের মাঠে বৈচিত্রতা হারাচ্ছেন। আজকাল কোনো নাটক-ছবিতে তার উপস্থিতির কথা শুনলেই মনে ভেসে উঠে অসহায় কোনো মানুষের মুখ। যাকে কাঁদতে কাঁদতে অসহায়ত্বের কাছে হেরে যেতে দেখা যাবে। আমার খুব ভালো লাগতো তালুকদার চরিত্রে বাবুকে দেখতে পারলে। তার উচিত, অভিনয় দেবীর যে বিশেষ অনুগ্রহ তিনি পেয়েছেন তার প্রতি সঠিক বিচার করা। সে যাই হোক, মনপুরা, হালদা, অজ্ঞাতনামার মতোই ‘পোড়ামন-২’ তেও বুকের ভেতর হাহাকার ভরে দিতে পেরেছেন ফজলুর রহমান  বাবু …।
ভালো গল্পের ছবি ভালো হয়। এটা ‘পোড়ামন-২’ ছবির ক্ষেত্রে সত্তর ভাগ মিলেছে। গল্পটি আহামরি কিছু নয়। কিন্তু সুন্দর সংলাপে মন দোলায়। মাঝখানে একটু ঝুলে গেছে মনে হলেও শেষদিকে জমে গেছে…।
উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রে গান একটি বিশেষ অনুসঙ্গ। ‘পোড়ামন-২’ আশি ভাগ সফল এক্ষেত্রে। ছবির গানগুলো সালমান-শাবনূরদের সিনেমার গানের মতো লোকমুখে না বাজলেও মানুষ শুনেছে। যতোক্ষণ শোনা যায়, গানগুলো শুনতে ভালো লাগে। হয়তো সুর-তালের মৌলিকত্বের অভাব গানগুলোকে আলাদা করে অনন্যতা দেয়নি। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গানটির কথাগুলো নতুন করে মনে প্রেম জাগায়। আর গানের কোরিওগ্রাফি নিয়ে না বললে দর্শক হিসেবে দায় থেকে যাবে। এক কথায় অসাধারণ, অনিন্দ্য। আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের নৃত্যশিল্পীদের জন্য দৃষ্টান্ত হওয়া উচিত এইসব কোরিওগ্রাফি…।
‘পোড়ামন-২’ ছবিটি শেষ হবার পর অনুভব করেছি, ছবিটির লোকেশন তৃপ্তি দিয়েছে। ক্যামেরাম্যান শিল্পীর তুলির আচড় দিয়েছেন পুরো ছবির ক্যানভাসে। গাছের ফাঁকে সুর্যের উদয়, তারা ভরা রাত, সবুজ ক্ষেত, গাছ-নদী-মাঠ চোখকে আরাম দিয়েছে। আয়নাবাজি নতুন করে দেখিয়েছিলো ঢাকা শহরকে। আর ‘পোড়ামন-২’ দেখালো চিরচেনা গ্রামকে নান্দনিকতায়…।
ছবির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়াকে ধন্যবাদ সিনেমার ক্রান্তিলগ্নে একটি নিখুঁত দেশীয় প্রযোজনার ছবি দিয়ে দর্শককে বিনোদিত করার চেষ্টার জন্য। চমৎকার একটি টিম নিয়ে মন ভরানো ছবির জন্য…।
এবং রায়হান রাফি। এই ছবির নির্মাতা। জীবনের প্রথম ছবিতেই তিনি জানান দিয়েছেন, অনেকটা পথ তিনি চলবেন বলেই এই পথে পা দিয়েছেন। অনুবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে বসলে হয়তো অনেক ত্রুটিই চোখে পড়বে তার। কিংবা যুক্তির কাঠগড়ায় নানা প্রশ্নেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে ‘পোড়ামন-২’ ও তার নির্মাণের আবেগ। কিন্তু এদেশের বাণিজ্যিক ও ভালো সিনেমার দর্শক হিসেবে রায়হান রাফি স্রেফ বাজিমাত করে দিয়েছেন বলা যায়। তার প্রশংসা বা ভবিষ্যতের সাফল্যের দায় আমি সময়ের হাতে রাখলাম। দর্শক হিসেবে আমি কেবল বলতে পারি ‘জয়তু রায়হান রাফি, জয়তু আপনার ‘পোড়ামন-২’…।

ছবি:গুগল