সময় তুমি ভালো রেখো যাপনে…

বচ্চন গিরি

(কলকাতা থেকে): তারপরও অপেক্ষা থাকবে, থাকবে ভালোবাসার গানে প্রিয়জনকে ঘিরে উন্মাদনা| সাদা – আকাশীর কম্বিনেশনের জার্সি পরে পড়ার ঘর থেকে রান্নাঘর, গরম কফির কাপে চুমুক দিয়ে প্রিয় বন্ধুকে ফোন লাগিয়ে বল শর্টের পোস্টমর্টেম করা মেয়েটির মনে উত্তেজনার পারদ চড়তো শেষ পঁনেরো মিনিটে| প্রিয় টিম বাদ পড়ার শোকে চোখে জল যে কলেজ পড়ুয়া মেয়েটির আবার কখনো প্রিয় টিম গোল দিলে প্রবল উত্তেজনায় ঝাঁপিয়ে উঠতো সেই মেয়ে; ঠিক চার বছর পর হয়তো তার চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা থাকবে, অফিস থেকে ফিরে সেই মেয়েটি তার ছোট্ট সন্তানটিকে কোলে বসিয়ে তখন প্রিয় ফুটবল রাজকুমারদের গল্প শোনাবে – শোনাবে বাড়ির লোকের নজর এড়িয়ে রাত জেগে কানে হেডফোন গুঁজে চুপিচুপি মোবাইলে খেলা দেখার গল্প| ঠিক চারবছর, হ্যাঁ ঠিক চারবছর পর আজকের কিশোর ছেলেটা তখন যুবক হবে, কর্মঠ হবে সেও- বিয়ে করে সংসার হবে তার| হয়তো চারবছর পর সে অন্য শহরে আবার রাত জাগবে| তখনকার সময় আজকের ঘটনাগুলো শুধুই গল্প মনে হবে ওদের…!

বহুদূরে ফুটপাতে শুয়ে রাত কাটানো ছেলেটা অনেক কষ্টে দোকানে সারাদিন কাজকরে আশি টাকা জমিয়ে কেনা তার প্রিয় দলের হলুদ জার্সি পরে খেলা দেখছে রাত জেগে শহরের বহুদূরে এক ধাবায় টিভিতে| ঠিক চারবছর পর সেই ছেলেটিকে হয়তো আর দেখা যাবেনা সেখানে, তবু পৃথিবীর কোনও প্রান্তে হয়তো রাতজেগে সেই ছেলেটি আবার প্রার্থনা করবে তার প্রিয় হলুদ জার্সি টিমের জন্য “ঈশ্বর এবার অন্তত জিতিয়ে দাও…..!”

পাড়ার মোড়ে চায়ের ঠেক| আড্ডা প্রবণ বাঙালির রক্তে ফুটবল| গরম চায়ে চুমুক -আজ একটা হেস্তনেস্ত হয়েই যাবে দেখিস| আমার রক্তেও মোহনবাগান| ঘরোয়া ফুটবল প্রায়ই দেখি| ঠিক চারবছর পর, আমারও বয়স বাড়বে, চোখের চশমার পাওয়ার বাড়বে, সদ্য সাংবাদিকতা ছেড়ে বেকার হয়ে পড়া ছেলেটা ঠিক চারবছর পর চাকুরি পেয়ে সাকার হবে| সময় কখন কাকে কোথায় নিয়ে যায় কেউ বলতে পারেনা, আজ আছি -চারবছর পর কোথায় থাকবো জানিনা, ঠিক চারবছর পর এই পাড়ার চায়ের দোকানটার ভবিষ্যৎ ক’জন জানে? হয়তো কেউ না….

এই যে আমরা পথ চলছি প্রতিদিন বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে, ঘটনাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে- এরই নাম হয়তো ‘জীবনযাপন’| সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু বদলে যাচ্ছে প্রতিদিনের চেনা ছবিগুলো সহজভাবে| হয়তো অনেক আধুনিক তোমাদের পৃথিবী| রঙিন আলোর ঝলসানিতে তোমাদের স্বপ্নগুলোও রঙিন, রাতের শহরের বুকে বিলিতি মদের আড্ডা – নাচের আসর জমে, সোস্যাল নেটওয়ার্ক জুড়ে চলে ‘শালা – বোকাচোদা -মাদারচোদ’….! এগুলো খুব আধুনিক আজকাল| ‘ভালোবাসা’ বড়ই সহজলভ্য এই সমাজে, চাইলেই পাওয়া যায়| ব্রেকআপে সবাই বড্ডো বেশি কাতর….! কিন্তু সত্যিই কী তাই? আজকাল রাস্তার ধারে ফুটপাত ধরে হাঁটার সময় চোখে পড়ে ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে বসে আছে একদল প্রেমিক যুগল| পার্কে অথবা প্রকাশ্যে ‘প্রেমানুভূতি’র ছবি সহজেই ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ে| হ্যাঁ সভ্যতার উন্নতি, বীরভূমের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়নের ছাপ ভাঁজে ভাঁজে স্পষ্ট হচ্ছে শহরের আনাচে কানাচে….!
কিন্তু এই আধুনিকতার মাঝে কখনো খোঁজ নিয়ে দেখেছ ‘যন্ত্রনা’ কাকে বলে?

তিনবছর আগে কলেজ কমপ্লিট করা এখনো বেকার, চাকুরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ানো – চোখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট সেই ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করো ‘বেকারত্বের যন্ত্রনা কী?’ উত্তর নিশ্চয়ই পাবে|

এক কথায় বাউন্ডুলে – সারাদিন লেখালেখি, গান আর গিটার বাজাতে ভালোবাসে যে ছেলেটি; ঠিক চারবছর পর পেটের টানে ভালোবাসার গিটার ছেড়ে কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ করে সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়া সেই ছেলেটির কাছে শুনে নিও সময় করে প্রিয় অভ্যাস হারানোর যন্ত্রনার গল্প|

একসময় প্রিয় টিমকে নিয়ে তর্ক হওয়া সেই প্রেমিক – প্রেমিকা, যাদের মধ্যে ফুটবল নিয়ে চলতো জোর ঝামেলা| নীল জামার ছেলেটি আর্জেন্টিনা, মেয়েটি ব্রাজিল ভক্ত| রাত জেগে খেলা দেখা, ফোনের দু-প্রান্তে নিশ্চুপ দুই মানুষ|

“গোল…..তোর টিম খেলো| এই চুপ কর, দেখ এবার দেবে আমাদের রাজকুমার বাঁ পায়ে|” আবার নিশ্চুপ দু’প্রান্ত! ফোনের হিসেব বলছে মিনিট পেরিয়ে ঘন্টা…|

ছেলেটি বেকার, তাই নিজের মেয়েকে একজন বেকারের হাতে তুলে না দিয়ে সরকারি চাকুরিজীবী পাত্রের সঙ্গে জোর করেই বিয়ে দেন মেয়েটির বাবা| তারপর থেকেই দুজনার পথ দুটি দিকে বেঁকে গেছে| ঠিক চারবছর পর তারাও হয়তো বিশ্বকাপ দেখবে একই শহরে অন্য কারো হয়ে, অন্য কারো ঘরে| সেই প্রেমিক যুগলকে চুপিসারে জিজ্ঞেস করো ‘ছেড়ে থাকার যন্ত্রনা কাকে বলে?’

ছেলে চাকুরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, পড়াশোনার প্রচুর চাপ| এদিকে ভদ্র মহিলার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বাতের ব্যথাটাও বেড়েছে তবু ছেলের পড়াশোনায় ক্ষতি হবে তাই ছেলেকে না বলে নিজেই ব্যথা সহ্য করে প্রতিদিন বাজারে যান, রান্নাবান্না করেন, ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালীন রাতগুলোতে জেগে মা – ছেলে খেলা দেখেন| সরকারি চাকুরি পাওয়া সেই ছেলে এখন বিয়ে করে মস্ত ফ্ল্যাটে উঠেছে মায়ের কথা বিন্দুমাত্র না ভেবে| সেই মা হয়তো চারবছর পর আর বিশ্বকাপ দেখবেনা| সেই মা’কে জিজ্ঞেস করো একই শহরে তবু চোখের আড়ালে ‘প্রিয়জন দূরে থাকার যন্ত্রনা কতোটা?’

পরিস্থিতিগুলো এভাবেই স্তরে স্তরে সাজানো থাকে| শুধু যেটুকু না পাওয়া হয়তো তারই নাম ‘যন্ত্রনা’| সবকিছু চাইলেই পাওয়া যায়না এই পৃথিবীতে, আসলে সবকিছুই সৃষ্টি হয় আবার ধ্বংসও হয় নিজের নিজের নিয়মে| ঘড়ির কাঁটায় শুধু আমরা তাকিয়ে থাকি এটা শান্তনা মাত্র; ঠিক চারবছর পর আবার হয়তো অপেক্ষা থাকবে, থাকবে রাতজেগে উন্মাদনা, চিৎকার, চোখে জল…| এভাবেই বদলে যায় সময়গুলো, চলে যায় এক একটা দিন- মহুর্তরা বন্দী থাকে মনে স্মৃতি হয়ে| না বলা কথাগুলো ইতিহাসের পাতায় লিখিত দলিল হয়ে শুধু থেকে যায়….!!

ছবি: গুগল