কতটা পথ পেরোলে বলো প্যারিস যাওয়া যায় পর্ব -এক

শ্যামলী আচার্য

গত ১৭ই মে এই দিনে ব্যস্ততা তুঙ্গে ছিলো।

বাড়ির তিনটি ব্যাগে একটু একটু করে ঢুকছে যাবতীয় প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয়। যাঁরা এর আগেও বেশ কয়েকবার হেঁটেছেন ওই পথে, তাঁদের তিনবেলা মধুঝরা কণ্ঠে ফোন (অন্য সময় কুশল বিনিময়ের প্রয়োজনও বোধ করি না)। বলছি কি, হ্যাঁ ভাই, তুমি যখন গিয়েছিলে, তখন কি তোমাদের ঘাম হয়েছিল? ঘামাচি? ও, হয়নি! যাক বাবা, তাহলে বাড়ি ফিরে মাইসিল পাউডার বের করে ফেলি। লাগবে না। আচ্ছা ওই সময় কি আকাশে মেঘ থাকবে? মানে, মে মাসের উনিশ থেকে পঁচিশ? ওয়েদারের জন্য গোলদারবাবুকে খুঁচিয়ে কোনো লাভ নেই। তার চেয়ে গুগলজেঠু বেটার অপশন। নাহ্‌। বৃষ্টির আশা প্রায় নেই। অতএব, তিনটি ছাতা না নিয়ে একটি। সবেধন নীলমণি। যাতে দুর্যোগমুহূর্তে ওয়ার্স-হাফ (বুঝতেই পারছেন, আমি আমার চেয়ে ‘বেটার’ কাউকেই ভাবি না, তাই…) দাঁত খিঁচিয়ে না বলতে পারেন, ‘তকনি বলেচিলাম’…। নিজের সম্মান নিজের কাছে। দু’টি ছাতা বাদ। রেনকোট নৈব নৈব চ। ঘাড়ে পাউডার-শোভিত হয়েও বেরোনোর প্রয়োজন নেই।
আসলে, মোদ্দা কথা হল, বোঝা কমাও। প্লেনেও সমস্যা, নিজেরও। গত আঠারো বছরে বিভিন্ন প্রান্তে বেরিয়ে বেরিয়ে পোড়-খাওয়া আমরা যে কোন মুহূর্তে ঝোলা কাঁধে পথে নেমে পড়ার বিপুল অভ্যেসবশত এইসব তুচ্ছ লাগেজ-সংক্রান্ত বিষয়ে কখনো ভয় খাই না।

কিন্তুক, এয়া হইল গিয়া বিদেশ।

তা’ও যে-সে নয়। এক্কেরে প্যারিস। ভাবা যায়?

অতএব প্রাথমিক ভাবে বাড়ির পাশের বাংলাদেশ বা ভূটান অথবা আন্দামান ভ্রমণের কোন অভিজ্ঞতাই এখানে কাজে লাগছে না! বরং কলকাতা থেকে সময়ের কাঁটায় সাড়ে তিনঘন্টা পিছিয়ে থাকা ছবি-কবিতার দেশে পৌঁছনোর স্বপ্ন সত্যি হবে, এই না কত!
আমাদের সাতদিনের ছুটিতে প্যারিস, রোম, ফ্লোরেন্স আর ভেনিস বেড়ানোর পরিকল্পনা তন্ময় মুখে মুখে বহুবার করেছে। গত দু’বছরে আলোচনা শুনেছি। কানে আসে। আমি তো নিয়মিত আদা বিক্কিরি করি কেন্দুয়া বাজারে, কাস্পিয়ান সাগরে কোন জাহাজ এসে ভিড়লো, তার খবরে আমার বিশেষ কিছু এসে যায় না। সাধারণ চাকরিতে নিজের হাতখরচ চালাই, ব্যাংকে ও অ্যাকাউন্ট আছে, টাকা নেই। এহেন আমি, সেই কোন ছেলেবেলার ‘দেশ’ পত্রিকায় নিয়মিত গোগ্রাসে গিলতাম ‘ছবির দেশে, কবিতার দেশে’। আমার ফরাসী প্রীতির শুরুয়াত সেখানে। চাট্টি কবি-চিত্রকরের নাম আওড়াতে পারলে কলেজ-ক্যান্টিন কি কফি-হাউজে ছেলেপুলেরা বিস্তর সম্ভ্রম করতো; শ্যামলী বেশ আঁতেল, এই শব্দবন্ধে সেই তারুণ্য বেশ পুলকিত হতো। এইমাত্র। আর কিছু নয়। কবিতা পড়েছি অনুবাদে। ছবি দেখেছি বইয়ের পাতায়। কি বুঝেছি, জানি না, ভালবেসেছি। কিন্তু, মাইরি বলছি, প্যারিস যাব, এই স্বপ্ন জেগে-ঘুমিয়ে সুস্থ বা অসুস্থ কোন অবস্থাতেই দেখিনি। মাক্কালী।
কাঁকন-অভিজিৎ আমাদের বেড়ানো-পার্টনার। তারাও দুম করে প্যারিস চলে গেল। বছর দু’য়েক আগেই। আমাদের টাকাও নেই। স্বপ্নও নেই। উসকে দিল অংশুমান। ভারি ভাল ছেলে। বহুবার বিদেশে গেছে। থেকেছে। এবার স্ত্রী-কন্যাকে সফরে নিয়ে যাবে সে। সংগে যাবে কে? হুলো বেড়ালকে শিকারের গন্ধের গল্প শোনালেই হয়। এক্ষেত্রেও তাই। তন্ময় এক পায়েই রাজি। আর আমরা? বাড়িতে জলের কল থেকে কার্পেটের বুনোট, প্লেটের রঙ থেকে বোতলের ছিপি— জীবনের তুচ্ছতম থেকে অতলান্ত মরণ-বাঁচন সমস্যাতেও আমরা কখনো সহমত হই না, সেই আমরাই বেড়াতে যাবার সামান্যতম আভাস থাকলে alliance গঠন করে থাকি। এটা ভারতবর্ষের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য। এখানে আমাদের এই সহাবস্থানে কেউ প্লিজ কোন উটকো প্রশ্ন করবেন না।
বেড়াতে যাওয়া মানে মনের প্রসারতা, part of education….. আর দাম্পত্য সম্পর্ক! ধুস… সম্পূর্ণ অচল, ছাতা-পড়া একটা কনসেপ্টকে সাজিয়ে-গুছিয়ে পরিবেশন।
যাক গে।
আজকের আলোচনা কিন্তু ‘প্যারিস-প্রস্তুতি’।
অংশুমান তো উসকে দিল। এবার বাজেট। তারপর টাকা ধার। কারণ আজকের সরকারি কর্মী ন্যায্য ডি এ ছাড়া মাইনে পান। তাই, তাঁর খরচ বাড়ে, সঞ্চয় কমে। ভাগ্যিস, ধার নেওয়া যায়। অতএব ধারের আবেদন। তারপর? ছুটি! দেবে কে? হে হে! খুব কঠিন। তার জন্য মানত করতে হয়, নিয়মিত মেহনত। ইদিকে তদ্দিনে প্লেনে যাওয়া-আসার টিকিট, প্যারিস এবং রোমে থাকার জায়গা, ল্যুভর মিউজিয়ামের মধ্যে ঢোকার ছাড়পত্র, আইফেল টাওয়ারের মাথায় চড়ার অনুমতি, ডিজনিল্যাণ্ডের টিকিট—একে একে সব রেডি।
ভিসা? বাবাগো! জঙ্গিরা এত দ্রুত পাসপোর্ট আর ভিসার ব্যবস্থা করে কী করে? এদিকে নিরীহ ছাপোষা মানুষ আমরা, দিন আনি দিন খাই, তাদের নখের ময়লা, চোখের পিঁচুটি, কানের খোল, কবে শেষ উকুন হয়েছিল, কান কটকট করে কিনা, কোন ব্র্যাণ্ডের টুথপেস্ট— ইত্যাকার যাবতীয় প্রশ্ন শেষে একটি ভিসা! হুঃ।

ভিসা পাই। ব্যাগ গোছানো শেষ। ব্যাগে জামা-কাপড় কমিয়ে ভরে নেওয়া হয় চাল-ডাল-বোর্নভিটা-ছাতু-গুঁড়ো মশলা। AIRBNB র আস্তানায় সুদৃশ্য রান্নাঘরে রেঁধে-খেয়ে থাকলে খরচের সাশ্রয়। আর প্রচুর কাজু, ছোলা, বাদাম। এই বাঁদরের খাদ্য সমস্ত ট্যুরে প্রাণে বাঁচিয়েছিল। সে গল্প ক্রমশ।
তন্ময়ের নতুন সানগ্লাস, নতুন জুতো আর নতুন প্যান্ট নিয়ে যাত্রা শুরু। আমি আর গোল্লু ভূ-পর্যটকের ভূমিকায়। আমাদের সংগে একতাড়া টিকিট, কাগজ, জেরক্স, টাকার হিসেব, ইণ্টারনেটে প্রতি মুহূর্তের কি-কেন-কোথায়…।
শনিবার রাত আটটার ফ্লাইট।
শুক্রবার গভীর রাতে উপাসনার ক্লান্ত ফোন। অংশুমান বলছিল, ইউরোপে ফোন চার্জ দেবার জন্য একটা স্পেশাল অ্যাডাপটর লাগে। টু-পিন। সেটা না হলে ফোন বা ক্যামেরা চার্জ দেওয়া যায় না।
ফোনের এই প্রান্ত থেকে তুরন্ত উত্তর। তিনটে আছে। তিনজনের। গোল্লু, শ্যামলী, তন্ময়। হে হে। আমরা কোন কিছুই শেয়ার করি না। টুথব্রাশ থেকে ট্র্যাভেল ব্যাগ। যার যার তার তার।।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ব্রতীনের মেসেজ। “প্যারিস-ভ্রমণ” আমরাই পাচ্ছি তো?
কথা দিই। সে কারণেই গত প্রায় এক মাস ধরে একটি শব্দও লিখিনি কোথাও। সে লেখা জমা পড়েও গেছে অনেকটা। ভিন্ন গোত্রের সে লেখা নিশ্চয়ই ভাগ করে নেব সকলের সংগে। কিন্তু, যে লেখা মনের মধ্যে বুজকুড়ি কাটে, সে গপ্পো উগড়ে দেবার একটি মাত্র জায়গা ফেসবুক।
তাই আজ থেকে……।। ( চলবে)

ছবি: লেখক