সেই শহরের প্রতিবেশী

ইরাজ আহমেদ

সেই শহরের অনেক গল্প জমা হয়ে থাকে মনের মধ্যে। স্মৃতির তোরঙ্গ খুললেই তারা ছড়িয়ে পড়ে কাপড়ের ভাঁজে গুঁজে রাখা ন্যাপথলিনের মতো। আমাদের ছিলো ছোট মধ্যবিত্ত পাড়া। গায়ে-গা লাগা ঘরবাড়ি। সেইসব পাড়ায় একদা খুব আপন ছিলো পাশের বাড়ি।পাশের বাড়ির চরিত্রও ছিলো বিচিত্র। একতলা অথবা দোতলা বাড়ির পাশের দরজা। জানালার পর্দা হাওয়ায় উড়ে গেলেই কত গল্প, কত অভিমান, কত ঝগড়া আর ভালোবাসা।
সেই সত্তর আর আশির দশকে একরকম জড়াজড়ি করেই থাকতাম আমরা কিছু মানুষ। তখন বাড়িতে হুট করে অতিথি এসে হাজির হলে পাশির বাড়িতে পাঠানো হতো এক কাপ চিনির জন্য। সেই চিনি কখনো বদলে যেতো একমুঠো ডাল অথবা দুই পট চালে। অসময়ের অতিথির জন্য তৈরী খাবারের কিছু অংশ আবার যত্নে রেখে দেয়া হতো পাশের বাড়ির জন্য। এই ধার নেয়া চাল, চিনি অথবা ডাল আবার শোধও করা হতো। অনেক সময় প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে সেসব ফিরিয়েও দেয়া হতো। এই ধার নেয়ার তালিকায় টাকা থেকে শুরু করে পরনের জামাকাপড়ও থাকতো। কতদিন এক বন্ধু বাইরে যাবার সময় পাশের বাড়ির বন্ধুর শার্ট গায়ে চাপিয়ে চলে গেছে। দুপুরবেলা রান্নার সুঘ্রাণ পেয়ে ঢুকে পড়ে ভাত খেয়েছি পাশের বাড়িতে।আবার বহু দুপুর অথবা রাতে ছোট্ট এক বাটি তরকারী চলে আসতো পাশের বাড়ি থেকে।
সিদ্ধেশ্বরীতে আমাদের পাশের বাড়িতে ছিলো একটি হিন্দু পরিবার। তাদের তিন ছেলেই ছিলো আমার বন্ধু। ছোট ছেলে বয়সে আমার চেয়ে একটু ছোট আর বাকী দুজন বড়। কিন্তু আশিষ, মনিশ অথবা তাপসের সঙ্গে নিত্যদিনের আড্ডা আর মাঠে গিয়ে খেলায় ব্যাঘাত ঘটতো না। তাপসের সঙ্গে মুখোমুখি দুই বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে গল্প চলতেই থাকতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমরা হয়তো কারো বাসাতেই ঢুকতাম না।তাপসের মা ছিলেন বিশিষ্ট নজরুলগীতি গায়িকা অঞ্জলী রায়। তাদের বসবার ঘরে কতদিন যে আমাদের বন্ধুদের জমজমাট আড্ডা তিনি সহ্য করেছেন।
আমাদের বাড়ির বাড়িওয়ালা ছিলেন সম্পর্কে আমাদের একটু দূরের আত্নীয়।থাকতেন ঠিক পেছনের বাড়িটাতেই। দুই বাসার মাঝখানে কোনো দেয়াল ছিলো না। ওই বাড়ির পেছনের দরজা খুললেই আমাদের উঠান। প্রতি সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে ফিরোজ ভাই রাতের খাবার খেতেন আমাদের বসবার ঘরে টিভি দেখতে দেখতে। মনে আছে এমন কোনো সন্ধ্যা দেখিনি যখন কোন পাশের বাড়ি থেকে কেউ আমাদের বাড়িতে আসতেন না।দোতলায় থাকতেন আরেকটি পরিবার। খালাম্মা ছিলেন অসাধারণ একজন মানুষ।অসম্ভব ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখতেন আমাদের সবাইকে। দোতলার বারান্দায় বসে থাকতেন খালাম্মা। একটু রাত করে বাড়ি ফিরলে অথবা বাসার সামনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দেখলেই বারান্দা থেকে ভেসে আসতো খালাম্মার শাসনের গলা।
বাড়িওয়ালা ফিরোজ ভাইদের বাড়ির জানালার ঝুলে থেকেই কতদিন সময় কেটেছে বড় আপাদের সঙ্গে। সেখানে ঝুলতে ঝুলতেই ভাগ পাওয়া যেতো তাদের আনা চটপটি আর ফুচকার। বাড়িতে দাদুর হাতের পায়েস খেতে আসতো মঈন ভাই। এরকম কিছু কিছু খাবার ছিলো যার কয়েকজন বাঁধা খদ্দের থাকতো। এদের মধ্যে ছিলো বন্ধু জাবেদ। এই পয়েস ভক্ষণের জন্য তাদের কেউ আমন্ত্রণ জানাতো না। নিজ উদ্যোগেই তারা এসে খেয়ে যেতো।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে যে ঝগড়া হতো না এমন নয়। কতদিন সামান্য কারণেই হয়তো বাড়ির বড়দের মনমালিন্যের কারণে আমাদেরও মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যেতো প্রতিবেশীদের সঙ্গে। কিছুদিন তাদের রাগারাগি সম্পর্কের আনন্দের মুখের ওপর ঝুলিয়ে দিতো কালো কাপড়। তারপর আবার ভালোবাসার সূর্যের আগমন। আবারো সেই তিন‘শ পয়ষট্টি দিনের সখ্য। আমরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতাম শান্তি ফিরে আসায়।
আমরা তখন বেঁচে থাকতাম ভালোবাসা লেনদেন করে। কথা বলতাম মনের ভাষায়।
সেই পাশের বাড়ি উধাও হয়ে গেছে এই শহর থেকে। তার বদলে পাশের ফ্লাটে বসবাস করে কয়েকঘর অচেনা মানুষ। যাদের সঙ্গে লিফটে দাঁতচাপা হাসি বিনিময় ছাড়া আর কোনো বিনিময় নেই। শহরের সেই পাশের বাড়ি আমরা হারিয়ে ফেলেছি কবে।

ছবি: লেখক