পেছনে তখন…

সাদিকুর রহমান পরাগ

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

 বাসায় ফিরতেই মা বললেন, তার টিভিটা কাজ করছে না। গিয়ে দেখি টিভিটা হ্যাং হয়ে আছে। এখনকার টিভির রিমোটে অনেক অপশন থাকে। অনেক সময় ঠিক বুঝে উঠা যায় না, কোন বাটনটা কিসের জন্য। এই রিমোট টিপতে গিয়ে কোন কারণে টিভিটা হ্যাং হয়ে আছে।
আগে টিভি সেটে এত অপশন ছিল না। পাড়া-মহল্লায় তখন হাতে-গোনা কয়েকটি টেলিভিশন সেট ছিল। এখন তো মানুষের ঘরে ঘরে টেলিভিশন। শুধু ঘরে ঘরে না অনেক বাড়িতে রয়েছে একাধিক টেলিভিশন। শুধু কী টেলিভিশন প্রযুক্তির কল্যাণে এখন অসংখ্য টিভি চ্যানেল। রিমোট টিপলেই কত দেশের কত রকম অনুষ্ঠান।
আমাদের শৈশবে টিভিতে শুধুমাত্র বিটিভি-র অনুষ্ঠান দেখা যেত। সেই অনুষ্ঠান ছিলো সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুরু রাত ১২টা পর্যন্ত। বিশেষ অনুষ্ঠানের সময় যে বাসায় টিভি থাকতো সেই বাসায় মানুষের ভীড় জমে যেতো। খেলার সময় সেটি বেশি হতো। আমরা তখন ক্রিসেন্ট রোডে থাকি। আমাদের পাড়ায় এসপি সাহেবের বাড়িতে টিভি ছিল। একবার মোহাম্মদ আলী আর ইনোকির বক্সিং দেখার জন্য সেই বাসায় গিয়ে হাজির। সেই বাড়ির কত্রী আমাদের দেখে ডেকে ভিতরে নিয়ে বসালেন। অন্যান্য মানুষেরা বাইরে দাঁড়িয়ে টিভি দেখছিল। সবার সামনে দিয়ে আমরা ভিতরে গিয়ে বসলাম….ক্যামন একটা ভিআইপি ভিআইপি ফিলিংস।
কিছুদিন পর আমাদের বাসায় টিভি এলো। বড় মামার বন্ধু বিদেশ যাবার সময় তার নতুন ফিলিপস টিভি সেট বিক্রি করবে। কম দামে প্রায় নতুন টিভি – এই কথা বলে মামা-ই বাবাকে রাজি করিয়ে ফেলেন টিভিটি কিনতে। যাই হোক টিভি তো এলো, আমার ভাবও গেল বেড়ে। বাসায় টিভি আসার সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রায় এলো পরিবর্তন। টিভি দেখার জন্য নিয়ম-নীতিও চালু হলো। যখন তখন দেখা যাবে না। আগে পড়া শেষ করতে হবে, তারপর টিভি। টিভি দেখতে হলে রাত ৯ টার মধ্যে পড়া শেষ করতে হবে। নতুন একটা রুটিনে আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম। 
তখন টিভি সেট বলতে ছিল ফিলিপস, সানিও, সিটিজেন, ইত্যাদি কোম্পানির টিভি সেট। আর টিভি-এর সাইজ ছিল ঢাউস আকারের। সামনে স্ক্রিন, ডান পাশে বড় বড় বাটন আর পিছন দিকটা ইয়া পেট মোটা। টিভির ভিতরে পিকচার টিউব আর বাল্ব। তখনকার টিভির ভিতরে অনেক বাল্ব থাকতো। যখন টিভি চলতো তখন বাল্বগুলো গরম হয়ে যেত। ক্যামন একটা পোড়া পোড়া গন্ধ হতো। অনেক সময় টিভিতে ছবি আসতো না। তখন টিভি সেটে জোরে জোরে থাপ্পড় মেরে ছবি আনতে হতো। তার উপর কিছু দিন পরপর বাল্ব নষ্ট হয়ে যায়। ফ্লাইওভার নষ্ট হয়ে যায়। ব্যাস দৌড়াও টিভি নিয়ে মেকানিকের কাছে। এভাবেই টিভিকে ঘিরে একটা নতুন জীবন ব্যবস্থা। তখন টিভি রাখার স্ট্যান্ড ছিল না। বেশির ভাগ বাসাতেই টেবিলের উপর রাখা হতো। অনেকের বাসায় চার পায়ার কাঠের বাক্স ছিল টিভি রাখার জন্য। আমার ফুপুর বাসায়ও তেমনি একটি বাক্স ছিল। সামনে কাঠের দরজা, তাও আবার তালা মারা থাকতো। যখন কাঠের দরজা খুলে টিভি সেটটি চালু করা হতো, মনে হতো যেন সিনেমা হলের পর্দা সরে গেলে।
এক সময় শখের টিভি-টার পিকচার টিউব নষ্ট হয়ে গেল। পিকচার টিউব ঠিক করা আর নতুন টিভি কেনা প্রায় সমান খরচ। ফলে টিভি আর ঠিক করা হয় না। আব্বাও আর নতুন টিভি কেনার আগ্রহ দেখান না। ফলে কিছু সময়ের জন্য টিভি-হীন হয়ে রইলাম আমরা। এদিকে তখন শুরু হয়েছ ‘সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান‘ নামে একটা সাড়া জাগানো টিভি সিরিয়াল। সপ্তাহে একদিন দেখানো হতো। ছবিতে স্টিভ অস্টিন নামে এক নভোচারীকে বায়োনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বাঁচিয়ে তোলা হয়, লাগানো হয় যান্ত্রিক হাত-পা আর চোখ। গাড়ির আগে দৌড়াতে পারে, পাহাড়ের উপর থেকে লাফ দিয়ে নামতে পারে, এক চোখ দিয়ে দূরবীনের মতো বহুদূর পর্যন্ত দেখতে পারে, বড় বড় পাথরের চাই, এমনকি আস্ত একটা গাছ উপড়ে ফেলতে পারে। এই রকম এক সুপার হিরো-কে নামিয়ে দেয়া হয় দুষ্টের দমনে। এই সিরিয়াল শুরু হলে দেশজুড়ে সে কী তোলপাড়। সবাই মনে মনে একজন বায়োনিক ম্যান হয়ে গেল। বাসায় টিভি নেই, কোথায় দেখি। আমাদের বাসার পাশেই একটা দোতলা বাসায় শিখা আপারা থাকতো। শিখা আপার সঙ্গে আমার বোনদের সখ্য। আর তার ছোট ভাই বাবু আমাদের সমবয়সী। ফলে সহজেই ওই বাসাতেই সিক্স মিলিয়ন ডলারম্যান দেখার ব্যবস্থা হয়ে গেল।
আমি আর আমার ছোটভাই হাজির হয়ে যেতাম নির্দিষ্ট রাতটিতে। ওরাও খুব আন্তরিক ছিল। মোটেও বিরক্ত হতো না। কিন্তু গোল বাধলো অন্য জায়গায়। শিখা আপারা থাকতো দোতলায়। আর বাড়ির মালিক থাকতো একতলায়। এমনিতেই বাড়িটি রাস্তা থেকে ৩/৪ ফুট উপরে। বাউন্ডারি দেয়ালটিও অনেক উঁচু। বাড়িওয়ালা নীচের কলাপসিবল গেট ও বাইরের মেইনগেটে তালা লাগিয়ে দেয়। কলাপসিবল গেটের চাবি বাবুদের কাছে থাকলেও মেইন গেটের চাবি ছিল না। মেইনগেট খোলার জন্য বাড়িওয়ালার শরণাপন্ন হতে হতো। বাড়িওয়ালার স্ত্রী একজন জাঁহাবাজ টাইপের মহিলা। এসে বললেন, গেট খুলে দেওয়া যাবে না। ভালো বিপদে পড়লাম, কী করা যায়। ওই বাসার বাড়ির পাশে একটা বিদ্যুতের খাম্বা রয়েছে। আমরা দুইভাই দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে, বিদ্যুতের খাম্বা বেয়ে নীচে নেমে আসি। যদিও খুব কষ্টকর ছিল, কিন্তু সিক্স মিলিয়ন ডলারম্যান দেখে ততক্ষণে আমরা নিজেদের সুপার হিরো ভাবতে শুরু করেছি। এটা কোন ব্যাপারই না ভাব নিয়ে আমরা নিয়মিত ওই বাসায় সিরিয়ালটি দেখতে যাই। 
শিখা আপার আম্মা বাড়িওয়ালিকে আরো কয়েকবার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু ভদ্রমহিলা কিছুতেই গেট খুলে দিবেন না। ছোট দুটি বাচ্চাকে বিদ্যুতের খাম্বা বেয়ে নামতে দেখেও ভদ্রমহিলার মন কিছুতেই গললো না। এ-ঘটনা বাসার কাউকে বলি নাই। বললে তো আর দেখতে যেতে দিবে না। এক সময় শিখা আপার আম্মার কাছ থেকে আমার মাও জেনে গেল ঘটনাটি। যথারীতি বাবার কানেও গেল।
একদিন বিদ্যুতের খাম্বা বেয়ে নামতে গিয়ে দেখি বাবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। সরেজমিনে বিষয়টি দেখতে এসেছেন তিনি। হাতে-নাতে ধরা পড়ে গেলাম। আমরা দুই ভাই-তো ভয়ে ভয়ে বাসায় গেলাম। কপালে না জানি কী আছে। কিন্তু বাসায় যাবার পর অবাক করে দিয়ে বাবা কোন বকাঝকা করলেন না। তিনি শুধু এভাবে বিদ্যুতের খাম্বা বেয়ে নামতে নিষেধ করলেন, কারণ এতে যে কোন সময় দুঘর্টনা ঘটতে পারে। আমরাও মাথা নেড়ে আর হবে না বলে সায় দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান আর দেখতে যাওয়া হবে না ভেবে মনটা একটু খারাপও হলো।
পরের দিন বিকেলে খেলার মাঠ থেকে বাসায় ফিরে পড়তে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ সময় বাবা ফিরলেন কোর্ট থেকে। সঙ্গে বড় মামা। বাসার সবাইকে অবাক করে দিয়ে দুজনে মিলে স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে একটা ২০ ইঞ্চি টিভি কিনে নিয়ে এলেন। আমাদের তো বিশ্বাস-ই হচ্ছিলো না। বাসায় যেন ঈদের খুশির বন্যা।
এখন যখন পিছন ফিরে দেখি, তখন ভাবি একটা টিভি সেটও মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

ছবি: গুগল