দায়িত্ব আমাদের ঘর থেকেই নিতে হবে…

রুখসানা আক্তার

(লন্ডন থেকে): মাঝে মাঝে প্রচন্ড এলোমেলো লাগে ।চারপাশের পৃথিবীটা অতি দ্রুত কেমন বদলে যাচ্ছে । টিনএজ বয়সের  ছেলে মেয়েরা কত উচ্ছল থাকবে, হৈচৈ করবে, সুন্দর স্বপ্ন দেখবে ,বই পড়বে , সিনেমা দেখবে ,গান শুনবে, ভালবাসবে পৃথিবীটাকে । ভালবাসবে মানুষকে ।কিন্তু তা না করে বেহেশতে যাওয়ার লোভে এরকম কচু কাটার মতো মানুষ মারছে।

আমার নিজের টিনএজ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকি । ধীরে ধীরে তার পরিবর্তন গুলো দেখছি। সেদিন উইকেন্ড এ আমাকে এসে গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলো সে তার ফ্রেন্ড এর সঙ্গে চার পাঁচ ঘন্টার জন্য ওয়েস্টফিল্ড যেতে পারবে কি না । জিজ্ঞাস করলাম কোন বন্ধু । উনার বান্ধবীর নাম বললেন । ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম যদি না করি সে আপসেট হবে । বললাম কাছে এসে বস । তারপর সরাসরি তাকে মানা না করে একটু ব্যাখ্যা দিয়ে বললাম কেন পারমিশন দিচ্ছি না । তারপর বললাম বন্ধুদের বাসায় নিয়ে আসো । আমি বাইরে মাগডোনালে নিয়ে যাব তোমাদের । ছেলে খুব একটা খুশি হয় নি । কতক্ষন পর এসে বললো , আমি এক মিনিটের একটা কথা বললাম আর তুমি টেন মিনিটের এক্সপ্লেনাশন দিলে । বুঝলাম সে একটু রাগ করেছে । মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে কেন তাকে দশ মিনিটের ব্যাখ্যা দিয়েছি আরো দশ মিনিট তারও আরেকটা যুক্তি পূর্ণ ব্যাখা দিলাম । মনে হলো কিছুটা নরম হয়েছে । একটু পরে এসে আলতো করে বলল ,”সরি আম্মু “। আমি বললাম , কেন বাবা ? ছেলে বললো ,”আমি তোমার উপর একটু রাগ করে ছিলাম “। আমি হেসে আরেকটু আদর দিয়ে বললাম , “লাভ ইউ বাবা ” । মাথা ঠান্ডা রেখে সব খেয়াল রেখে হ্যান্ডেল করতে হচ্ছে ।এখন তার বন্ধুবান্ধব হচ্ছে । মাঝে মাঝে ওদের সঙ্গে সাইকেলিং , সিনেমা এবং খেলাধুলা করে ।

আমি ছাড়া অনেকটা সময় সে নিজের মতো বন্ধুদের সঙ্গে কাটায় । যা অত্যন্ত জরুরি ,তার সেলফ কনফিডেন্স ডেভেলপ করতে । তার পর ও ছেলের অলক্ষ্যে চোখ এবং কান খোলা রাখি । ঘরে তার ডিসিপ্লিন করা আছে কখন স্কুলের পড়াশুনা , কখন টিভি দেখবে বা বন্ধুদের সঙ্গে অনলাইনে গেম খেলবে। আবার কি গেম খেলছে তাও একটু খেয়াল রাখতে হয় । রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বই পড়ে । টিভি তে টপ গিয়ার , বেয়ার গ্রিল আর আর টিনএজ দের প্রোগ্রাম দেখে । এখন দেখি ছেলে হেড ফোন লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে গান শুনে । আবার হুজুর আসেন সপ্তাহে একদিন । বলে দিয়েছি নামাজের নিয়ম কানুন আর কোরআন পড়া শিক্ষা দিতে । বাকিটা আমি করবো ।মেয়ে কে ও এভাবেই বড় করেছি । এখন সে মাকে ছাড়া খুব কনফিডেন্টলি নিজের বর্তমান এবং ভবিষতের প্ল্যান করছে । সেইভাবে চলছে । অনেকে বলে আপনার বাচ্চা দু’টো বেশ ভালো । আপনার চিন্তা নেই । ওদের বলি কতটুকু কঠিন সময় আমি পাড় করেছি এবং কিভাবে হ্যান্ডল করেছি। জীবনের সব চেয়ে বড় পরাজয় হলো বাচ্চা জন্ম দিয়ে তার সুস্থ লালন পালন এবং তত্ত্বাবধান না করে পরিবার এবং সমাজের জন্য একটা বোঝা তৈরি করা।

শুধু ভালো স্কুল , উন্নত জীবন যাপন কিছুই কাজে লাগবে না যদি না ছেলে মেয়ের মননের গতিবিধি এবং চারপাশের পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে পারেন্টিং করা হয় । এটা বুঝতে পারছি সামনে আমাদের আরো কঠিন সময় এগিয়ে আসছে । প্রচন্ড হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি । কিন্তু নিজেকে আবার তৈরি করছি সব ঝেড়ে । কি করতে পারবো জানি না । কিন্তু এটা জানি চাইলে কিছু না কিছু করতে পারবো । তাই আশপাশের মানুষ বন্ধু বান্ধব , কাজের জায়গা সবার সঙ্গে কথা বলছি । অভিজ্ঞতার আদানপ্রদান সহ পরস্পর কে মতামত দিচ্ছি কিভাবে বাচ্চাদের সুস্থ দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে একটা ব্যালেন্স পরিবেশ দেয়া যায় । বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণ হয়তো কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয় । পৃথিবীতে ভালোমানুষ সংখ্যাই বেশি । তাই বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্ম , তাদের ভবিষৎ এবং আগামী পৃথিবী যেন নিরাপদ এবং শঙ্কাহীন আর ভালোবাসাময় হয় ।চেষ্টা করে যাবো যে যেখানে যে অবস্থায় আছি ।সে চেষ্টা নিজের ঘর দিয়েই শুরু করি না কেন আমরা !!!

শুধু তত্ত্ব দিয়ে কাজ হবে না বাস্তব সচেতনতা , কাজ এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে । শুধু “সরকার সব করে দেবে সমাধান “এই বলে নিজের যে দায়দায়িত্ব টুকু আছে সেটা এড়িয়ে যাওয়া কাপুরুষতা স্বার্থপরতা । এই জঙ্গী গুলো আমাদের সন্তান ,আমাদের প্রতিবেশী ,বন্ধু বান্ধব এবং  আমাদের মধ্যে থেকেই সৃষ্টি । তাই আমাদের দায়িত্ব ও অনেক বেশি ।আমরা ধর্ম ,বর্ণ লিঙ্গ ভেদাভেদ ভুলে একত্রিত এবং একাত্মতায় আবদ্ধ থাকলে এর মূল উৎপাটন হবেই । আর তাই সরাসরি এই ব্যাধির মোকাবিলায় হাতে হাত রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে । আমাদের সাহস আছে , শক্তি আছে । আমরা পারবো । এ আমাদের দেশ আমাদের পৃথিবী !!

ছবি: সজল