ঝিনুক নীরবে সহো…

‘‘তার কোনো দুঃখ নেই, সে তো সব সুখেরও অতীত
তার চক্ষে আলো জ্বলে, সে আলোর বর্ণ নেই কোনো
তার বুকে এত ঘুম, ছুঁয়ে দেখি, সে তো নয় মৃত
যন্ত্রণার আভা দিয়ে তার মুখ আগুনে সাজানো’’ ।
সুনীল গঙ্গ্যোপাধ্যায় কবিতায় লিখেছিলেন এমন সব লাইন কবির অন্তরাত্নাকে প্রকাশিত করতে… তার কোনো দুঃখ নেই/ সে সুখেরও অতীত। কবিকে কোনোকিছুই স্পর্শ করে না। আবার হয়তো সম্পর্কের তীব্র দহন তাকে এমনই পোড়ায় যে ফুরিয়ে যাবার ঠিকানাটাও জানা হয়ে ওঠে না কবির। কবি আবুল হাসান লিখেছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত লাইন, ‘‘ঝিনুক নীরবে সহো’’। ঝিনুক কাকে বললেন কবি? নিজেকেই তো? ভালোবাসাহীন তস্কর এক সময়। কত সহজেই সব সয়ে যেতে বললেন কবি নিজেকেই। নিজের মনভূমির সেই অসহায় এলাকার তপ্ত হাওয়া যেন উড়ে এসে চিরকালের ঘর তৈরী করলো লাইন দুটির মধ্যে। ভালোবাসা পেয়েছিলেন আবুল হাসান? অসুস্থ শরীরটাকে শেষ তরণীর মতো উত্তাল জলরাশিতে ভাসিয়ে দিয়ে কোন প্রেম খুঁজেছিলেন হাসান? তেমন ভালোবাসা কি খুঁজেছিলেন জন কীটসও? অসুস্থ হয়ে দেশ ছেড়ে ইতালীতে চলে যাবার সময়ও ভেবেছিলেন ফ্যানি ব্রাউনের কথা। আবুল হাসান তো শেষ বই ‘পৃথক পালঙ্ক’ তে লিখেছিলেন সেই অমোঘ লাইন ‘‘যতদূর থাকো ফের দেখা হবে’’।
অল্প বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছিলেন তিন কবি-জন কীটস, জ্যাঁ আর্তুর র্যাঁবো আর আবুল হাসান। তরুণবেলায় গোলাপের নিচে নিহত এই কবি কিশোদের মর্মমূলে গেঁথে থাকা সেই যাতনার কাহিনি নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন ‘ঝিনুক নীরবে সহো’।

আবুল হাসান

আবুল হাসান তখন খুবই অসুস্থ। তাঁর শেষ জীবনের ভালোবাসা কবি সুরাইয়া খানম তখন ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে হাসানের দেখাশোনা করছেন।সুরাইয়া খানম ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক এবং কবি।অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন আবুল হাসানের সেই প্রেমিকা। কেউ বলতেন, বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালি রূপসী ছিলেন সুরাইয়া। সেই সময়ে ঢাকা শহরের সাহিত্যিক মহলে আলোচিত মানুষ ছিলেন। তার শরীরী সৌন্দর্য আর কবিতার ঝাঁঝ সুরাইয়া খানমকে আলোচিত করেছিলো খুব দ্রুত।ভালোবেসেছিলেন সুরাইয়া আবুল হাসানকে। তাঁর ভাষায়, ‘আমি যাকে ভালোবাসি, দেহ ও মন দিয়ে ভালোবাসি’ আর কবি আবুল হাসান চৈতন্যগ্রাসী প্রেমে আচ্ছাদিত হয়েছিলেন সুরাইয়া খানমের জন্য। সেই প্রেম কী দিয়েছিলো আবুল হাসানকে? ২৯ বছর বয়সে মৃত্যু তাঁকে ছিনিয়ে নেয়ার আগে ভালোবাসার কাছে কী খুঁজেছিলেন হাসান, নৈঃশব্দ, একাকীত্ব? লিখেছিলেন তিনি কথাটা কবি বন্ধু নির্মলেন্দু গুণকে এক চিঠিতে…‘ঐ শ্রীমতিও এখন আর আমাকে একাকীত্ব দিতে পারে না।’ সুরাইয়া কি জানতেন আবুল হাসানের এই উপলব্ধির কথা? হয়তো জানতেন না, তবে বুঝতে পারতেন।
আসলে এই একাকীত্ব একজন কবির নিয়তি। আবুল হাসানের কবিতাটির পরের লাইনগুলো এরকম,
ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভেতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও।
ভেতরে ওই বিষের বালি-ই আসলে কবির আত্নাকে দীর্ণ করে। ক্লান্ত করে। আর তাই হয়তো ভালোবাসা খুঁজতে গিয়ে হাহাকারে সমর্পিত হন কবি। আবুল হাসান আর সুরাইয়া খানমের ভোলোবাসা গড়ে ওঠার পেছনে ভূমিকা পালন করেছিলেন নির্মলেন্দু গুণ। তাঁর ভাষায়, ‘সুরাইয়া খানম আর আবুল হাসানের মধ্যে বন্ধুত্বকে প্রেমের সম্পর্কে উন্নীত করার পেছনে আমার একটি খুবই কার্যকর ভূমিকা ছিলো। হাসান বার্লিন থেকে চিকিৎসা করিয়ে ফিরে আসার পর হাসানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব কি-না, তা সহৃদয়চিত্তে ভেবে দেখার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি-র সবুজ গালিচায় তিনজন মুখোমুখি বসে, হাসানের পক্ষ থেকে আমিই সুরাইয়াকে অনুরোধ করেছিলাম। সুরাইয়া প্রথমদিকে হাসানের সঙ্গে নিজেকে আবেগী সম্পর্কে জড়াতে রাজি হয়নি। পরে ফ্যানি ব্রাউন ও কীটস-এর সম্পর্কের কথা বিবেচনায় নিয়ে সুরাইয়া হাসানের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে রাজি হয়।’

সুরাইয়া খানম

কিন্তু দুজনের মাঝে এই প্রেমের স্রোতস্বিনী বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলো দুই বন্ধুকে। নির্মলেন্দু গুণের লেখায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ‘আমি লক্ষ্য করি কিছুদিনের মধ্যেই সুরাইয়া হাসানকে তার প্রেমের একান্ত শিকারে পরিণত করে আমার কাছ থেকে ক্রমশ আপন গোপন গুহার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যেন আমি ওদের প্রেমের পথে কাঁটা।’
আবুল হাসানের অবস্থা তখন একেবারেই ভালো না। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কবির হৃদপিণ্ডের ভাল্ব দুটোর অবস্থা ক্রমশ আরো খারাপ হচ্ছে। শীত পড়াতে শ্বাসকষ্টের সঙ্গে কাশিও যুক্ত হয়েছে। সুরাইয়া খানম গুণকে তখন হাসপাতালে যেতে নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আপনি ওর কাছে বেশী আসবেন না। আপনি আসলে ও একটু ইমোশনাল হয়ে যায়।তাতে ওর ক্ষতি হয়।’ একদিকে বন্ধুর চির বিচ্ছেদের আয়োজন চলছে অন্যদিকে চলছে বন্ধুত্বের ভাঙ্গন। কীটস মৃত্যুর আগে আর লিখতে পারছিলেন না। সেই বেদনার জীবনটাকে ‘বাড়তি জীবন’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন কবি। বলেছিলেন তাঁর নিজের কবর ফলকে লিখে দিতে একটি লাইন, ‘‘এখানে এমন একজন শুয়ে আছে যার নাম লেখা হয়েছে জলের অক্ষরে’’।মৃত্যুর আগে আবুল হাসানের শেষ কবিতার বই ‘পৃথক পালঙ্ক’ প্রকাশিত হয়েছিলো। হাসান রোগশয্যায় শুয়ে সারাক্ষণ বইটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতেন। তিনি কোনো মন্তব্য ছাড়াই বইটা উৎসর্গ করেছিলেন সুরাইয়া খানমকে। সেটাও কী ছিলো কবির নিজের এপিটাফ?
হয়তো তাই।আবুল হাসানের এপিটাফে নাম থাকতেই পারে সুরাইয়ার। সেই তীব্র ভালোবাসা শেষে এসে যন্ত্রণার ডাকনামে পরিণত হয়েছিলো। জীবনের একেবারে শেষ দৃশ্যে আবুল হাসান বন্ধু গুণের একটি চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন। সেখানে কবি লিখেছিলেন, ‘কবির চিঠির মধ্যে যে দুঃখবোধ এবং নৈঃসঙ্গবোধ থাকে, তার সবরকম চিৎকার হঠাৎ আমাকে একা-সম্পূর্ণ একা করে দিয়ে গেলো কিছুক্ষণের জন্য। এই একাকীত্বের দরকার ছিলো আমারও। আমি অনেকদিন এরকম সুন্দরভাবে একা হতে পারিনি…হতে পারে এই একাকীত্ব কেবল তুমিই আমাকে একবার অনেকদিন ধরে দিয়েছিলে।’ একদিকে বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ অন্যদিকে প্রেমের আহ্বান। আবুল হাসান যে কষ্ট আর যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে সময়ের শেষ ভগ্নাংশকেও পুড়িয়ে দিয়েছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।আর সেই বিষের বালিতে জন্ম হয়েছিলো কবিতার। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর মাত্র আঠাশ বছর বয়সে এই যন্ত্রণাকাতর কবি পৃথিবীকে বিদায় জানান। ছড়িয়ে রেখে যান বাংলা কবিতায় কয়েকটি মুক্তা।

পল ভেরলেন

জ্যাঁ আরতুর র‌্যাঁবো

মনের নিঃসঙ্গতাকে সামাজিক সম্পর্কের ঘাটতি, প্রতিপালন এবং একাকী অনুভুতির অবদান হিসাবে বর্ননা করা হয়েছে মনোবিজ্ঞান শাস্ত্রে। সেখানে বলা হয়েছে, নিঃসঙ্গতা একটি ক্ষতিপূরণমূলক দীর্ঘস্থায়ী মর্মপীড়া।
১৮২১ সালে মাত্র ২৫ বছর ৪ মাস বয়সে রোমে মারা যান কিটস।যক্ষা ঘর বেঁধেছিলো কবির তরুণ শরীরে। তাকে সমাহিত করা হয়েছিল প্রিয়তমা ফ্যানি ব্রাউনের একগুচ্ছ চুল আর না খোলা চিঠিসহ। ফ্যানির আঙুলে আমৃত্যু ঘর বেঁধেছিলো কবি জন কিটসের দেওয়া বাগদানের আংটি। মৃত্যুকে মানুষের চিরস্থায়ী নিঃসঙ্গতা ভেবেই হয়তো কীটস ফ্যানিকে লিখেছিলেন, ‘এমন প্রায়ই মনে হয়, আমরা দুজন যদি হতাম প্রজাপতি আর বাঁচতাম গ্রীষ্মের তিনটে দিন। তোমার সঙ্গে অমন তিন দিন যে আনন্দে ভরে তুলতে পারতাম, তা হতো সাদামাটা পঞ্চাশটি বছরের চেয়েও ঢের বেশি।’
সৌন্দর্যের কবি জন কীটস ভালোবাসতেন ভায়োলেট ফুল, ভালোবাসতেন শেক্সপিয়ার আর ফ্যানি ব্রাউনকে। তাঁর কাছে প্রেমের অন্য নাম হয়ে এসেছিলেন এই নারী। ফ্যানি ব্রাউন অবশ্য সুরাইয়া খানমের মতো বিদূষী নারী ছিলেন না।কিন্তু কবির জন্য তিনি ছিলেন মূর্তিমতী প্রেরণা। বলা হয়ে থাকে, ফ্যানি ব্রাউনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরেই বদলে গিয়েছিলো কীটসের কবিতার আত্না। ফ্যানিকে লেখা কবির চিঠি সর্বকালের সেরা প্রেমপত্রগুলোর তালিকায় স্থান পেয়েছে। কিন্তু তাদের সেই ভালোবাসার সম্পর্ক ভালো থাকতে পারেনি বেশিদিন।
এমনি আরেক কবি জ্যাঁ আর্তুর র্যাঁবো। লিখেছিলেন সেই কাব্যগ্রন্থ ‘নরকে এক ঋতু’। ৩৭ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছিলেন এই ফরাসী কবি।এক অদ্ভুত অনাচারের সম্পর্ক তৈরী হয়েছিলো তার কবিবন্ধু ভেরলেনের সঙ্গে। এই সম্পর্ক র্যাঁবোর কবিতার জগতকে এলোমেলো করেছিলো। এলোমেলো হয়েছিলো ভেরলনের পারিবারিক জীবনও।

ফ্যানি ব্রাউন

তখনই র্যাঁবো উচ্চারণ করেছিলেন সেই সাহসী লাইন ‘‘আমি নারীদের ভালোবাসি না। ভালোবাসাকে নতুন করে আবিস্কার করা উচিত’

জন কীটস

’। তারপর? প্যারিসে চলতে থাকলো এই দুই কবির আত্নপীড়নের জীবন। তখন প্যারী শহরের ছোট্ট এক হোটেল কামরায় সারারাত পড়তেন র্যাঁবো। এই সময় খণ্ডে নিজের কবিতার শব্দ বিন্যাসে অসাধারণ অসংলগ্নতার উন্মেষ ঘটান র্যাঁবো। ‘মাতিনি দি ভয়েসে’ কবিতায় তিনি নিজেকেই আখ্যায়িত করেন আততায়ী বলে। এই আততায়ী নিজেকেই হত্যা করে। সেই নৈঃসঙ্গ আর যন্ত্রণার জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়া এক কবির যাত্রাপথ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু তারপর দুই কবির সম্পর্কেরও অবনতি ঘটলো। তখন র্যাঁবো লণ্ডন শহরে। আফিমের নেশা আর নানা অনাচারে জীবন বিদীর্ণ।জীবনের রোমাঞ্চ খুঁজতে গিয়ে যেন নিজেরেই আয়ু ক্ষয় করে ফেলার প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন র্যাঁবো।মনের ভেতরে অস্থিরতা আর যন্ত্রণার বিষ তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলো অসাধারণ সব কবিতা। তখন দূরে সরে গেছেন ভেরলেনও। ঠিক তখনই এই অস্থির কবির মনভূমিতে অচেনা নৌকার মতো এসে ভিড়লো এক বৃটিশ নারী। সেই ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে ঈর্ষান্বিত ভেরলেন চিরতরে পরিত্যাগ করলেন র্যাঁবোকে। তখন এপ্রিল মাস, ১৮৭৩ সাল, র্যাঁবো লিখতে শুরু করেছেন ‘আ সিজন ইন হেল’, ‘নরকে এক ঋতু’ বইয়ের কবিতাগুলো।
র্যাঁবোর এই প্রেম আর যন্ত্রণা ঘ্রাণ ফিরে পাওয়া যায় আবুল হাসানের কবিতার লাইনে। নগর আর নগরের অন্তঃসারশূণ্য জীবন এদেরকে ক্রমাগত ক্লান্তই করেছিলো হয়তো।মুখোশ পরিহিত মানুষ তাদের যন্ত্রণা্ দিয়েছিলো। তাই আবুল হাসান নারীর ভেতরে খুঁজেছিলেন একাকীত্ব। র্যাঁবো খুঁজেছিলেন জীবনের অর্থহীনতা। আর কীটস বাঁচতে চেয়েছিলেন তিনটে দিন। পৃথিবীর এই ম্লান কবিকিশোররা তাদের যাতনার আগ্নিতে একা হয়ে তৈরী করে গেছেন মুক্তার মতো কবিতা। কিন্তু তাদের বুকের ভেতরে বিষের বালি কেবলই তাদের শ্বাসরোধ করেছিলো।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ প্রাণের বাংলা