বিশেষ শ্রেণী নয় আমার সিনেমা সবার জন্য: ডাঃ ইলা

তানজিল আহমেদ জনি: ঢালিউডের অন্যতম আলোচিত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়ার সৃজনশীল পরিচালক হিসেবে সিনেপাড়ায় সকলের কাছে পরিচিত মুখ ডাঃ ইলা। ইতমধ্যে তার নির্মিতব্য ‘কাঁচালঙ্কা’ সিনেমার মাধ্যমে গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়েছেন তিনি। সম্প্রতি নিজের সিনেমা ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রাণের বাংলার সঙ্গে এক প্রাণোবন্ত আড্ডায় মেতে উঠেছিলেন তিনি।

প্রাণের বাংলা: ঢালিউডে একইসঙ্গে দুইটি সিনেমা নির্মাণের মাধ্যমে অভিষিক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?

ডাঃ ইলা: আসলে আমার লক্ষ্য ছিলো একইসঙ্গে ‘কাঁচালঙ্কা’, ‘ঝড়’ ও ‘আক্ষেপ’ এই তিনটি সিনেমা নিয়ে সিনেমার বাজারে প্রবেশ করবো। এরমধ্যে ‘কাঁচালঙ্কা’, ও ‘ঝড়’ সিনেমার চূড়ান্ত পর্যায়ের অল্প কিছু অংশের দৃশ্যধারণের কাজ বাকী আছে। পাশাপাশি ‘আক্ষেপ’ সিনেমার প্রি-প্রো-ডাক্সনের কাজ চলছে।

যদিও আমার স্বপ্ন ছিলো আমার নির্মিত প্রথম সিনেমা হবে ‘ভোগ’। ঘটনাক্রমে তা হয়ে উঠেনি। তবে একই সময়ে তিন ঘরানার সিনেমা নিয়ে দর্শকের কাছে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষার দুই সিনেমাশিল্পের ইতিহাসে একজন নির্মাতা হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়তে চাই। আর বাকীটা সময়ই বলে দেবে।

প্রাণের বাংলা: তাহলে ‘ভোগ’ সিনেমাটি কবে নাগাদ পাবো?

ডাঃ ইলা: ‘কাঁচালঙ্কা’ ও ‘ঝড়’ সিনেমা দু’টো ছাড়াও বেশ কিছু ফিকশন, ননফিকশন ও মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে ‘ভোগ’ সিনেমাটি নির্মাণের জন্য এখনকার সময়টা মোটেও উপযুক্ত নয়। একইসঙ্গে আমার স্বপ্নের যেই জায়গা থেকে ‘ভোগ’ সিনেমাটি নির্মাণ করতে চাই। আমি এখনও পর্যন্ত সেই জায়গাটা স্পর্শ করার জন্যে প্রস্তুত নই। তাই কেউ যদি আমাকে ‘ভোগ’ সিনেমাটি নির্মাণের জন্য সম্ভাব্য বাজেটের তিনগুন বাজেটও দেয় তাও আমি ‘ভোগ’ সিনেমাটি এক্ষুনি নির্মাণ করবো না।  সময়ই নির্ধারণ করবে কখন আমি এই সিনেমাটি নির্মাণ করবো।

প্রাণের বাংলা: ঢালিউডের অন্যতম একটি প্রভাবশালী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আপনি কর্মরত বলেই কি ক্ষমতার দাপটে একটির পরে আরেকটি সিনেমা মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন?

ডাঃ ইলা: বিষয়টি মোটেও এমন নয়। আমি যেই সময় সিনেমা নিয়ে মার্কেটে প্রবেশের চিন্তা করছি তা মোটেও আমার জন্য অনুকুল সময় নয়। অন্যদিকে আমার এই তিনটি সিনেমার একটিতেও জাজ মাল্টিমিডিয়ার কোন ধরনের বিনোয়োগ নেই। এমনকি আমার সিনেমাগুলোর নির্মাণ ও বিতরণের ক্ষেত্রে জাজ মাল্টিমিডিয়ার কাছ থেকে কোন ধরণের সহযোগিতা পাবো কি, পাবো না সেই ধরণের কোন নিশ্চয়তাও নেই। মূলত একজন সাধারণ নির্মাতা হিসেবে আমার একটাই লক্ষ্য যেকোন ভাবেই হোক আমার সিনেমাগুলোকে সকল শ্রেণির দর্শকের কাছে পৌছাতে হবে।

প্রাণের বাংলা: সিনেমার ডিস্ট্রিবিউশনের জন্য কি আপনার বতর্মান প্রতিষ্ঠানকেই এককভাবে প্রাধান্য দিবেন?

ডাঃ ইলা: আমি যেহেতু জাজ মাল্টিমিডিয়ায় কাজ করি, সেহেতু আমি সিনেমা ‍মুক্তির সময় ডিস্ট্রিবিউশনের জন্য সবার আগে আমার নিজের ঘরকেই (জাজ মাল্টিমিডিয়া) প্রাধান্য দিবো। যদি কোন কারণে আমার সিনেমাগুলোর ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্ব জাজ মাল্টিমিডিয়া না নেয়, সেক্ষেত্রে সেই সিনেমাগুলোর ডিস্ট্রিবিউশন সিনেমার প্রযোজকরা তাদের মত করে করবেন।

প্রাণের বাংলা: সিনেপাড়ায় অত্যন্ত প্রভাবশালী সৃজনশীল পরিচালক হিসেবে সুপরিচিত থাকার পরেও কেন আপনার সিনেমাগুলোতে নতুন মুখের প্রাধাণ্যই সবচেয়ে বেশি?

ডাঃ ইলা: আমি সকল শ্রেণির দর্শকদের দেখাতে চেয়েছি আমাদের সিনেমা শিল্পে নতুনরা খুবই মেধাবী এবং তাদেরকে সুযোগ দিলে তারাও ভালো কিছু উপহার দিতে পারে। শুধু বিগ বাজেটের সিনেমা করলেই হয় না, সিনেমার গল্পের গাথুনি থেকে শুরু করে সিনেমার গল্প, দৃশ্যধারণ, গান, কোরিওগ্রাফি সঠিকভাবে করা গেলে অল্প বাজেটের সিনেমাও অত্যন্ত নান্দনিকভাবে পর্দায় উপস্থাপন করা যায়।

তাছাড়া আমি একটু ডমিনেট করতে পছন্দ করি। আমার সিনেমার গল্পের প্রতিটি চরিত্রকে আমি সঠিকভাবে পর্দায় চরিত্রায়ন করতে চেয়েছি। অনেক সময় খুব বেশি পরিচিত মুখ নিলে একজন নতুন পরিচালকের ক্ষেত্রে তার পুরো প্রজেক্টটা শুরু থেকে শেষ অবধি নিজের নিয়ন্ত্রনে রাখাটা অনেকক্ষেত্রে একটু কষ্টকর হয়ে যায়। এখানে আমি কাউকে আঘাত করার জন্য কিংবা কাউকে ছোট করার জন্য মোটেও এমনটি বলছি না। এটা আমার একান্ত ভাবনা। সবার নিজস্ব একটা ভাবনা থাকে। আমি চেয়েছি আগে আমি একটি পর্যায়ে যাই, তারপরে না হয় এক ঝাক তারকা নিয়ে তারকাবহুল সিনেমা নির্মাণ করা যাবে।

প্রাণের বাংলা: সিনেপাড়ায় বিগত কয়েক সপ্তাহ যাবৎ গুঞ্জন রয়েছে প্রযোজক ও নায়িকার দ্বন্দে আপনার ‘কাঁচালঙ্কা’ সিনেমার নির্মাণ নাকি স্থগিত রয়েছে, আদৌ কি তাই?

ডাঃ ইলা: ‘কাঁচালঙ্কা’ সিনেমার নির্মাণ বতর্মানে স্থগিত রয়েছে এটা সত্য। ‘কাঁচালঙ্কা’ সিনেমার দুইজন প্রযোজকের মধ্যে নায়িকা নিজেও একজন প্রযোজক।এই সিনেমার  প্রযোজকদ্বয়ের মধ্যে কোন ব্যক্তিগত দ্বন্দ হয়েছে কিনা সেই ব্যাপারে আমি এখনও কিছু জানি না। তবে যদি এমন ধরনের অনাকাক্ষিত কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সেক্ষেত্রে হয়তো আমাকে নতুন কোন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কারণ আমার কাছে আমার ব্যক্তিগত ইমেজ সবার আগে, পরে সবকিছু। আমার ব্যক্তিগত ইমেজের জায়গায় একটু ছাড় দিলেই আজ আমার সিনেমা নির্মাণের ঝুড়িতে কমপক্ষে এক ডজন সিনেমা থাকতো।

প্রাণের বাংলা: সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে একজন নারী নির্মাতা হিসেবে প্রতিবন্ধকতার জায়গাটা কেমন ছিলো?

ডাঃ ইলা: একজন নারী নির্মাতা হিসেবে কাজ শুরুর পর থেকেই প্রতিটি মূর্হুতে আমাকে বিভিন্ন ধরণের বাধাঁর সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে আমার প্রতিটি কাজে আমার পরিবার আমার পাশে থেকে আমাকে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু পরিবার ও আমার কর্মস্থল জাজ মাল্টিমিডিয়ার বাইরের চিত্রটা ছিলো ঠিক বিপরীত। আমি এমন কিছু সম্মানিত মানুষদের কাছে আমার একটি সিনেমার ফুটেজ দেখানোর পরে এমন কিছু মন্তব্য পেয়েছি, যা একজন সত্যিকারে সৃজনশীল মানুষের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়।তবে আমি তাদের সহ তাদের মত আরো যারা আছেন তাদের সকলের প্রতি সম্মান রেখে আর বেশি কিছু বলতে চাইনা। তবে এইটুকু বলবো কেউ যদি এই সিনেমাশিল্পে ভালো কাজ করতে চায়, সবার উচিত সিনেমাশিল্পের উন্নয়নের স্বার্থে তাকে সহযোগিতা করা। তিনি ছেলে নাকি মেয়ে, তার বয়স কত সেটা দিয়ে তার কাজকে মুল্যায়নের  চেষ্টা না করাটাই শ্রেয়।

প্রাণের বাংলা: আপনি যৌথ প্রযোজনায় না গিয়ে দেশীয় প্রযোজনায় সিনেমা নির্মাণকে কেন বেশি প্রাধান্য দিলেন?

ডাঃ ইলা: যৌথ প্রযোজনায় কাজ করার জন্য যে ধরনের শক্তিশালি একটি টিম দরকার কাজের শুরুতে আমর সেই টিম তৈরি হয়নি। তাই টিম গুছানোর জন্য দেশীয় প্রযোজনায় সিনেমা নির্মাণকেই প্রথমে প্রাধান্য দিয়েছি। কাজ করতে গিয়ে প্রচুর অ-পেশাদার ছেলেমেয়ে পেয়েছি। যারা আসলে পর্দার পেছনে কাজের কথা বলে পরিচালকের সুনজরে থেকে পর্দায় কাজ করতেই বেশি আগ্রহী। তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার একটু প্রফেশনাল। অন্যদিকে বিএফডিসির কলাকুশলীরা সেই দিক থেকে পুরোদস্তর প্রফেশনাল। ইতোমধ্যে আমার দু’টো সিনেমার কাজ প্রায় শেষের দিকে চলে আসছে। টানা দুটো সিনেমার কাজ করতে গিয়ে ইতোমধ্যে আমার বেশ কয়েকটি টিম তৈরি হয়ে গিয়েছে। এখন দু’টি যৌথ প্রযোজনার প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমার পরবর্তী প্রজেক্টগুলো মধ্যে যৌথ প্রযোজনায় সিনেমা থাকার সম্ভাবনা আছে।

প্রাণের বাংলা: আপনি কোন শ্রেণীর দর্শকদের জন্য সিনেমাগুলো নির্মাণ করছেন?

ডাঃ ইলা: আমার প্রতিটি সিনেমাই বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমা। আমি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সকল শ্রেণীর জন্য  সিনেমাগুলো নির্মাণ করেছি। আমার প্রতিটি সিনেমার গল্পে বেশ কয়েকটি প্রজন্মের গল্প রয়েছে। যেমনটি আমাদের ঢাকাই সিনেমার সোনালী যুগের সিনেমার গল্পগুলোতে দেখা যেতো। সেক্ষেত্রে বলতে চাই, কোন বিশেষ শ্রেণী নয় বরং সবার জন্যই আমার সিনেমা।

প্রাণের বাংলা: ঢালিউডে কবে নাগাদ পরিচালক হিসেবে অভিষিক্ত হচ্ছেন?

ডাঃ ইলা: সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সম্ভবত একটি সিনেমা এই বছরেই মুক্তি পাবে। আমি একটু গুছিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি বলেই বাকী সিনেমাগুলো ২০১৯ সালে সুবিধাজনক সময়ে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।