মন্ট্রিয়লে জ্যাজ ফেষ্টিভ্যালে…

সুলতানা শিরীন সাজি

( অটোয়া থেকে): এবার মন্ট্রিয়লে জ্যাজ ফেষ্টিভ্যাল হলো জুন ২৮ থেকে জুলাই ৭ পর্য্ন্ত। আমরা প্রতিবছর একটা দিনের জন্য হলেও যাওয়ার চেষ্টা করি জ্যাজ ফেষ্টিভ্যালে । পার্ক এভিনিউ এর রাস্তা ধরে সেই Place des Arts মেট্রো স্টেশনের কাছাকাছি কোথাও গাড়ি পার্ক করে হাটঁতে হয়।পথের বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা বন্ধ করে বানানো বিশাল মঞ্চে চলে গান।
মিনু,মিঠুভাইকে উঠিয়ে রওনা দিতেই দুপুর গড়ালো। পথে একবার কফি ব্রেক এক Tim Hortons এ। দুই ঘন্টার পথ গল্পতেই কেটে যায়। কখনো নিজেদের জীবন এর গল্প,কখনো ছেলেমেয়েদের গল্প। কখনো দেশে ফেলে আসা প্রিয়জনদের গল্প। কখনো গান শোনা,গলা মিলানো।

Hudson Bay এর কাছে এক বিল্ডিং এর আন্ডার গ্রাউন্ড পার্কিং এ গাড়ি রেখে ঘোরা শুরু হয় আমাদের। রাশীকের বাবা আর আমার প্রোগ্রামিং পড়ার Delta College এর নাম পালটে CDI কলেজ হয়েছে। মন্ট্রিয়ল এ গেলে আমার গলার স্বর নাকি পালটে যায়।রাশীকের বাবা বলে। কথা সত্যি। আমি এত খুশি থাকি। আসলে দেশ ছাড়ার পর কানাডায় এসে এই শহরে ৭টা বছর কেটেছে। এই শহরে রাশীকের জন্ম,বেড়ে ওঠা। আমাদের পড়ালেখা। কিছু বন্ধু পাওয়া। সুন্দর সুন্দর স্মৃতির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাই এখানে এলে।

শেষ দিন এ গেলাম আমরা। ভেবেছিলাম ,মানুষ বুঝিবা কম হবে।কিন্তু অজস্র মানুষ। জ্যাজ ফেষ্টিভ্যাল এর মিউজিক,গান এর সঙ্গে দর্শনীয় দিক হলো নানা রকম মানুষ।এত মানুষ অথচ কোন ধাক্কা ধাক্কি নেই।সব চলছে সুন্দর নিয়মে।ইচ্ছাকৃত তো নাইই,অনিচ্ছাকৃত কেউ কাউকে ধাক্কা দিয়ে হেঁটে যায়না। এটা দেখার মত একটা ব্যাপার। শেখার মত ব্যাপার।

কয়েকদিন এর ভীষন গরমের পর গতকাল বেশ সুন্দর আবহাওয়া ছিল।
আমরা প্রথমেই Heineken beer এর স্পন্সর করা স্টেজ এর সামনে দাঁড়িয়ে এক ফ্রেঞ্চ শিল্পীর গান শুনলাম। শুধু ফ্রেঞ্চ না ইংরেজী গান ও গাইলো। এরপর গেলাম RIO TINTO মঞ্চের সামনে। ভেবেছিলাম সিড়িতে বসার জায়গা পাবো। গিজগিজ মানুষ। ওখানে Portland, Oregon থেকে আসা শিল্পী M Ward এবং তার দল এর গান এবং অদ্ভুত গীটার শুনলাম।

কিছু পরিবেশ থাকে , সেখানে গেলে মনেহয় আসলে আমরা জীবনের কত তুচ্ছ তুচ্ছ জিনিস নিয়ে মন খারাপ করি। এটা নাই, ওটা নাই বলে দুঃখে ভাসি। আসলে জীবনের এই যে স্বচ্ছ নির্মল আনন্দগুলো। গানের সঙ্গে সঙ্গে নাচছিল সবাই। ভাসছিল সবাই। এই আনন্দ বাতাসের মত। চাইলেই সেই আনন্দ ছুঁতে পারা যায় যেনো!

সন্ধ্যা নামার অনেক পর,schwartz smoked meat খেতে রওনা দিলাম সেন্ট লরেন্ট এ। ওখানেও লাইন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো আমাদের সামনেই দাঁড়িয়েছিল দুজন,যারা M Ward এর সাথে Band আর গীটার বাজিয়েছিলো। যে ছেলেটা সার্ভ করছিল, ও মজা করে বললো,তোমরা বন্ধু হয়ে যাও। এক টেবিলেই বসতে হবে। আমরা চারজন আর উনারা দুইজন। নাম জানলাম ,একজন Scot(Band master) আর Mike(guitarist).
ওরা অটোয়াতেও Bluefest এ বাজাবে বললো। খাবার নিয়ে গল্প হলো।
আমরা অটোয়াতে ফিরে যাবো এই রাতেই তাই তাড়া ছিলো।

তৌফিক ভাই আর বাবুভাই এর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল,কিন্তু রাত বারোটা বাজাতে আর হলোনা। জাকের ভাই আর হুমায়ুন ভাই আর মুন্নীর সঙ্গে দেখা হলো অল্পক্ষনের জন্য। দেশ থেকে মেহমান এসেছিল,তাদের নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন তারা।

কিচ্ছু আনন্দঘন সময় ছুঁয়ে আবার ফেরা শুরু। মন্ট্রিয়ল এ যতবার আসি,ফেরার পথ মনটা কেমন যেনো করে। মামুনভাই বলেন, মন্ট্রিয়লের রাস্তাতে গাছগুলোর পাতা এবং ফুলেও ঘ্রাণ ছাড়াও একধরনের টান আছে। আর একএকটা পথ এ কত স্মৃতি!

আসলেই এই জীবনটাতে আমি শুধু মায়াই দেখি! এই মায়ার টানেই ফিরে ফিরে আসি। যেখানেই যাই , চোখ ভরে শুধু দেখি। আর বন্ধুরা মিলে যতবার মন্ট্রিয়লে আসি, প্রতিবার নিয়ে যাই আনন্দ। এই আনন্দই বিলাতে ইচ্ছা করে সবাইকে।
সবাই যেনো ভালো থাকি।

ছবি: লেখক