কতটা পথ পেরোলে বলো প্যারিস যাওয়া যায় (পর্ব ২ )

শ্যামলী আচার্য

সত্যি কথা বলতে কি, অংশুমান যেমন প্যারিস-ভ্রমণের স্বনিযুক্ত প্ল্যানার-কাম-ম্যানেজার, ঠিক তেমনই আরো একজন উদ্দীপকের ভূমিকা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি গৌতমবাবু। আমার সাম্প্রতিক কর্মস্থলে তিনি আমার উর্ধবতন। চমৎকার মানুষ। গত বছর ঠিক এই সময়েই তিনি লণ্ডন-প্যারিস-রোম-ফ্লোরেন্সসহ আরো কতশত জায়গা বেরিয়ে এসে বিস্তারিত গল্প বলেছিলেন আমায়। পুরো ট্যুর তাঁর নিজের প্ল্যান করা। কোথায় থাকলেন, কোথা থেকে ট্রেন, প্লেন ইত্যাদির টিকিট কাটলেন, কীভাবে কোথায় ঘুরে বেড়ালেন, তার বেশ ঝলমলে একটা ছবি শুনিয়েছিলেন একদিন। ওঁর বলার গুণেই হোক, বা আমার সুপ্ত ইচ্ছেবশতই হোক, বহু খুঁটিনাটি তথ্য মনে থেকে যায়। এইবারে তাই ভিসা হাতে পেয়েই ওঁর বহু টিপস নোট করে ফেলি চটপট।
বিদেশ বিভুঁই বলে কথা।
লাগেজে জামাকাপড় যথাসম্ভব কম ভরে ঠুসে নেওয়া হল শুকনো খাবার। বিদেশে খাওয়া আর যানবাহনের খরচের হিসেব কষে তদ্দিনে আমরা হা-ক্লান্ত।
শ্রীজাত পাঠিয়ে দেয় তিনটি অসাধারণ গাইড-বই। একটি প্যারিস, অন্যটি রোম। দুজনের ব্যাগে দুটি বই ঢুকে পড়ে। দূর্বার মেসেজ, সাবধানে যেও। মঁমার্ত যেতে ভুলো না। তিস্তু চেঁচিয়ে বলে, পাস্তা খাস কিন্তু।
সবার সব শুভেচ্ছা ব্যাগে ভরে নিয়ে রেডি-স্টেডি-অন ইয়োর মার্ক বলে শনিবারের বিকেলবেলায় দে দৌড়।
বিপুলবাবুর জামাই-আদরের চোটে দমদম এয়ারপোর্টকে এক-এক সময় গাঙ্গুলীবাগান বাস-স্ট্যাণ্ড মনে হচ্ছিল। ভদ্রলোক আর একটু হলেই পাইলটকে ডেকে ‘দাদা, দেখবেন, লেডিজ-বাচ্চা আছে, একটু সাবধানে চালাবেন। ঝাঁকুনি যেন না লাগে’ বলেই ডানদিক-বাঁদিক চেয়ে দু’চারজন এয়ারহোস্টেসকে ডেকে, ‘এই যে ভাই, সাবধানে কিন্তু নাবিয়ে দেবেন’ – অনেকটা এইরকম ব্যাপার শুরু করে ফেলেছিলেন আর কি! উপাসনা যথারীতি লাউঞ্জে বসে বাড়ি থেকে বানিয়ে আনা কেক ওনাকেও খাইয়ে তখনকার মতো মুখবন্ধ করিয়ে নিলো। সে আমাদের ভ্রমণেরও মুখবন্ধ বৈকি!
রাত আটটা চল্লিশ থেকে বারোটা। দুবাই পৌঁছনোর কথা ওই মাঝরাতেই। ভোর চারটেতে প্যারিসের জন্য আবার যাত্রা শুরু। কাঁকনের কাছে আগেই শুনেছি, এই দীর্ঘ যাত্রাপথ সিনেমা দেখেই দিব্য কেটে যায়। আমার হাতব্যাগে বই মজুত থাকে। ভাগ্যিস! কারণ প্রথম চোটে দমদম টু দুবাই আমার সিট-সংলগ্ন টিভিটি বিগড়ে থাকায় আমি গল্পের বইতেই মহানন্দে মনোনিবেশ করে ফেলি। কন্যা মনের আনন্দে ‘হ্যারি পটার’, তার পিতা নিদ্রার চেষ্টায়, আমার পাশে বসা এক অচেনা যাত্রী “টয়লেট—এক প্রেম কথা”য় মগ্ন রইলেন। আমার হাতে স্বপ্নময়দা’র ‘অষ্ট চরণ ষোল হাঁটু’। গল্প-সংকলন। প্রিয় বই। প্রিয় লেখক। তার চেয়েও বড় কথা, নিজের জখম হাঁটু আর ক্রমশ অকেজো হয়ে পড়া চরণযুগলের কথা ভাবতে ভাবতেই বোধহয় বইয়ের তাক থেকে অবচেতনে এটি তুলে নেওয়া!
দিব্যি পৌঁছে গেলাম দুবাই। নো ঝাঁকুনি। নো টেনশন। 
মাঝরাতের দুবাই। আলো-অর্থ-জৌলুসে মোড়া দুবাই। এক্সপ্রেস স্পা, ডিও, জুয়েলারি, ব্যাগ, ফ্যাশান, লিপস্টিক, ম্যাক, বৈভব, প্রাচুর্য, দিনার, দিরহাম— সব শব্দের সমাহার। সোনার বিস্কুট থেকে সোনার হারিকেন, সোনার আলবোলা থেকে সোনার ইজিচেয়ার দেখতে দেখতে কখনো কনভেয়ার বেল্ট চড়ি, কখনো এক টার্মিনাল থেকে আর এক টার্মিনাল যেতে এয়ারপোর্টের নিজস্ব মেট্রো…… চমকে যাওয়াও কঠিন। কোনও কোনও সময় স্নায়ুকোষ আর উত্তেজিত হয় না। একের পর এক উদ্দীপনায় সে ঝিমোচ্ছে।
এয়ারপোর্টেই আমিনার সংগে দেখা। কে আমিনা? তার কথা এখানে নয়। যদি লিখতে পারি, পরের কোনও গল্পে নিশ্চয়ই সে আসবে চরিত্র হয়ে।
পরের ফ্লাইট ভোর চারটেয়। এবার টিভি চলছে। ঝটপট ‘ইংলিশ-ভিংলিশ’ আর ‘মম’। আধো ঘুম-আধো জাগরণে রবিবারের সকাল। প্যারিসের ওরলি এয়ারপোর্টে নেমেই এক রাম-চিমটি।
স্বপ্ন না সত্যি?(চলবে)

ছবি: গুগল