এই দিন সেই দিন মিলেমিশে একাকার!

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কাজীপুরের শৈশবের গল্প বলতে আমার কি যে ভাললাগে! দাদীমা আমার প্রিয়তমা ।অসম্ভব অন্য রকম মানুষ ছিলেন ।নিশ্চুপ নীরব একরোখা কঠিনও বটে।তেত্রিশ বছর বয়সী বিধবা, স্বামীর ভিটায় একমাত্র খোকাকে সম্বল করে বেঁচে থাকা সহজ

আমার সঙ্গে জুওয়াইরিয়া

মানুষের কাজ নয়।সাহায্যকারী অনেকে থাকলেও সব সময় সবার সাহায্য নেবেন না বলে তার নিজস্ব ছইয়াল ছিল।সে ছইয়াল নির্বাচনও তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন ।ছইয়াল পুরুষ হলেও অনেকটা প্রতিবন্ধী।তখন এতো কিছু বুঝিনি,এখন সব কিছুর ব্যাখ্যা আমার কাছে পরিস্কার ।সারাবছরই সেই টাবুদাদা এই কাজ সেই কাজ করেই যেতেন ।তার চা খাওয়ার দৃশ্য ভোলা কঠিন।তার নাস্তা ছিলো এক বাটি ছাতু, এক মগ চা আর একমুঠো আঁখের গুড়।টাবু দাদা মগের চা ছাতুর বাটিতে ঢেলে গুড়

মেখে ভর্তা মত বানিয়ে খেতেন।এটা দেখার জন্য আমারা আড়ালে বসে থাকতাম।উনি খাওয়া শুরু করলে আমরা দল বেঁধে হাসতাম ।উনিও প্রশ্রয়ের সুরে হেসে বলতেন খাবে তোমরা? আমরা আরো হাসতাম ।দাদীমার কোন হাসি পেতো না।বাড়তি হাসি-কান্না তাঁর ছিলো না।বিধবাদের এতো আবেগে দিন চলে? শক্ত হতে হয়,শক্ত,জিয়ন্তে মরা! সে যাই হোক ।দাদী অন্ত প্রাণ আমি একবার বয়সে সামান্য কিছু বড় ফুপুর সঙ্গে গেলাম অদূরেই জগৎগঞ্জ হাটে।হাট ভর্তি গ্রামের, পাড়ার আত্মীয়-পরিজন।অতএব ভয়ের কিছু নাই।দুইচার আনা পয়সা হাতে।হাতে না, গ্রামের মানুষের অনুকরণে ঘটিপ্যান্টের কোঁচড়ে। ফুপু আর আমি,আর কেউ না।হাটে গিয়ে কটকটি বুন্দিয়া খেয়েটেয়ে শেষে একটু লাঠি বিস্কুট কিনেছি দাদীমার জন্য।চা দিয়ে দাদীমা তা চুবিয়ে খান।ফিরতে ফিরতে একসময় বিস্তৃর্ন পাটক্ষেতের সামনে এসে দাড়ালাম ।এই ধরনের পাটক্ষেতে আমার বিশাল ভয়,অজানা ভয়।আমার হাতে বিস্কুটের ঠোংগা ।পাটক্ষেতের ভেতর দিয়ে আধা মাইল অবিরাম যেতে হবে।এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে।গা ছমছম করা পরিবেশ ।কিছুদূর গিয়ে ফুপু বলে বিস্কুট দাও নাইলে যাবো না।আমি একটা বিস্কুট দেই।আবার কতদুর গিয়ে বলে বিস্কুট দাও নাইলে যাবো না।আবার দেই আর মনে মনে কাঁদি আর ভাবি এভাবে খেতে থাকলে পুরা পথে বিস্কুট শেষ ।ফুপু আবার বলে বিস্কুট দাও নাইলে যাবো না! এভাবে করে করে একটার অর্ধেক লাঠি বিস্কুট হাতের মুঠোয় গুড়ো গুড়ো অবস্থায় দাদীর হাতে যখন সম্বল মোর কম্বল খানি ভেবে দিলাম তখন সন্ধ্যা ঘুটঘুটে হয়ে গেছে।আমার লাঠি বিস্কুট এর গুড়াও যেন কালিকালি মাখা দুঃখ মেখে মাটির দলার মত আধাভাঙ্গা ত্রিভঙ্গমুরারী হয়ে গেছে।দাদীমা অবাক হয়েও তা হাতে নিলেন। কিন্তু কে কে যেন বিটকেল হাসি হাসতে লাগলো ।

জুওয়াইরিয়া

অপমানে কুঁকড়ে গেলাম।কিন্তু কেউই পাটক্ষেতের এই ব্ল্যাকমেলের উপাখ্যান জানলো না শুনলোও না বুঝলোও না।সেই গল্পের মতো অনেকটা ছায়া অবলম্বনে কি যেন ঘুরে ঘুরে এলো আমার কাছে। নাতনী জুওয়াইরিয়া ইসলাম, আমি তার নাম রেখেছিলাম পরী,যদিও সে নাম শুধু ফেসবুকেই হিট,ঘরে তাকে সে নামে কেউ ডাকে না।তো সেই পরীবিবি তার স্কুল থেকে আমাদের আবদারে কখনও কখনও আমাদের বাসায় আসে।স্কুলে সে কি কি যেন খায়,চকলেট, স্যান্ডুইচ ,জুস ,এগুলো আর কি।সেই গল্প শুনতে চাইলে আমি তাকে বললাম, ময়নাপাখী, আমি তোমার টিফিন খেতে চাই।সে বড় হিসেবী।বলে তুমি তো আমার স্কুলে যাওনা,তাইলে? তাইতো বলেই সে বলে আচ্ছা কোন অসুবিধা নাই,আমি আমার টিফিন বাসায় আনবো তোমার জন্য।যা বলা তাই সই।পরদিন সে ঠিক টিফিন নিয়ে এসেছে আমার জন্য।একটা প্যাকেট লুকিয়ে বলে দাপু,চোখ বন্ধ।আমার চোখ কপট বন্ধ,খুললে দেখি ছোট হাতের পাতা ভরা ভাঙ্গা  ভাঙ্গা স্যান্ডুইচের গুড়া আর আধাখাওয়া চকলেট ।বলি এমন কেন? সে বলে আমার জন্য সে চকলেট আর স্যান্ডুইচ এনেছিল,কিন্তু বান্ধবী কিছু খেয়ে নিয়েছে, আর আসার সময় চকলেটের লোভ সামলাতে না পেরে নিজে কিছু খেয়েছে ।আমি চমৎকৃত ।হোক আধখাওয়া ভাঙ্গাচুরা চকলেট স্যান্ডুইচ, তার যে কি মূল্য তা আমার চেয়ে আর কে বেশী জানে! জীবনের খানাখন্দে পড়ে কিছু লাঠিবিস্কুট খরচ হলেও দাদীর হাতে নিজের কোঁচড়ের পয়সায় কেনা এক মুঠ গুড়াগুড়া বিস্কুট দিতে পারার যে শান্তি তাও যেমন আমি জানলাম সেই বিস্কুট নিতে পারার স্বাদ ও আল্লাহ আমাকে জানালেন । জীবনের এ পিঠ ওপিঠ ঘুরেফিরে দেখার সাধ কয়জনের পূর্ণ হয়? পাওয়ার কি সুখ কাঙ্গাল জানে পাওয়া তো নয় পাওয়া!!!!

ছবি: লেখক